এইচএসসি পরীক্ষার্থী : সোনালি ভবিষ্যতের যাত্রী

ড. মো. আনোয়ার হোসেন

মতামত

সারা দেশে বৃহস্পতিবার একযোগে শুরু হয়েছে ২০২৬ সালের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা। দেশের ১১টি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে এবার মোট ১২

2026-07-04T04:45:11+00:00
2026-07-04T04:45:11+00:00
 
  শনিবার, ৪ জুলাই ২০২৬,
২০ আষাঢ় ১৪৩৩
শনিবার, ৪ জুলাই ২০২৬
মতামত
এইচএসসি পরীক্ষার্থী : সোনালি ভবিষ্যতের যাত্রী
ড. মো. আনোয়ার হোসেন
প্রকাশ: শনিবার, ৪ জুলাই, ২০২৬, ৪:৪৫ এএম 
গ্রাফিক : সময়ের আলো
সারা দেশে বৃহস্পতিবার একযোগে শুরু হয়েছে ২০২৬ সালের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা। দেশের ১১টি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে এবার মোট ১২ লাখ ৭০ হাজার ৫৮৩ জন পরীক্ষার্থী এই জীবনের অন্যতম বড় অগ্নিপরীক্ষায় অংশ নিচ্ছেন। দীর্ঘ পথচলার ক্লান্তি ভুলে জীবনের এই নতুন ও অনন্য সোপানে পদার্পণ করায় তোমাদের জানাই আন্তরিক শুভেচ্ছা ও উষ্ণ অভিনন্দন।

এটি কেবল একটি সাধারণ পরীক্ষার শুরু নয়, বরং এটি তোমাদের আগামী দিনের গৌরবময় সোনালি ভবিষ্যতের মজবুত ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের মাহেন্দ্রক্ষণ। শৈশব আর কৈশোরের চঞ্চলতা পেরিয়ে তোমরা আজ যে চৌকাঠে দাঁড়িয়েছ, তা তোমাদের পরবর্তী জীবনের দিকনির্দেশক হিসেবে কাজ করবে। কবি আল মাহমুদের ভাষায় বলতে গেলে, তোমাদের মনে আজ সেই প্রত্যয় থাকা উচিত- ‘পরাজিত নয় কেউ, জয়ী হবে এইবার আমাদেরই প্রাণ।’

জীবনের এই দীর্ঘ প্রাতিষ্ঠানিক প্রাঙ্গণে তোমরা যা কিছু শিখেছ, এই পরীক্ষাটি মূলত তারই গভীর যোগ্যতা নিরূপণের একটি জাতীয় মানদণ্ড। প্রতিটি উত্তরপত্রে তোমরা যে মেধার স্বাক্ষর রাখবে, তা প্রমাণ করবে তোমাদের অধ্যবসায়ের গভীরতা। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছিলেন, ‘আপনাকে এই জয়াভিযানে সার্থক করাই মনুষ্যত্ব’। আর তোমাদের এই সার্থকতা প্রকাশের প্রথম বড় ক্ষেত্র হলো এই পরীক্ষা।

উচ্চশিক্ষার এক বিশাল ও উন্মুক্ত প্রবেশদ্বার হিসেবে এই উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম। এখান থেকে সফলভাবে উত্তীর্ণ হয়েই তোমরা পা রাখবে দেশের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ কিংবা প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের আঙিনায়। এটি মূলত তোমাদের জ্ঞানার্জনের পরিধিকে এক নতুন বৈশ্বিক মাত্রায় রূপান্তরের অনন্য চাবিকাঠি।

আজকের এই পরীক্ষাটি প্রকৃতপক্ষে তোমাদের বহু লালিত স্বপ্নপূরণের অন্তহীন যাত্রার এক বাস্তবসম্মত প্রারম্ভিক বিন্দু। বছরের পর বছর ধরে বাবা-মা, শিক্ষক এবং তোমরা নিজেরা যে স্বপ্নের জাল বুনেছ, তা আজ বাস্তবে রূপ নেওয়ার পথে প্রথম পদক্ষেপ। স্বপ্নকে ছুঁয়ে দেখার এই লড়াইয়ে তোমরা প্রত্যেকেই এক একজন অসমসাহসী অভিযাত্রী।

এই পরীক্ষার টেবিলে বসে তোমরা তোমাদের সুপ্ত মেধা বিকাশের এক অভূতপূর্ব সুযোগ পাচ্ছ। এতদিন ধরে আহরিত তাত্ত্বিক জ্ঞানকে সৃজনশীলভাবে খাতায় ফুটিয়ে তোলার মাধ্যমেই মেধার আসল বিচ্ছুরণ ঘটে। এটি নিজেকে চেনার এবং নিজের সুপ্ত মেধার সর্বোচ্চ প্রকাশ ঘটানোর এক নিয়মতান্ত্রিক উৎসব।

পরীক্ষার এই দীর্ঘ দিনগুলো মূলত তোমাদের ধৈর্য ও সহনশীলতার এক কঠিন পরীক্ষা হিসেবে কাজ করে। রুটিন মেনে একের পর এক পরীক্ষা দিয়ে যাওয়া এবং মানসিক চাপ সামলানো সাধারণ কথা নয়। বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন বলেছিলেন, ‘সবচেয়ে বড় প্রতিভার পরিচয় হলো সীমাহীন ধৈর্যশীলতা।’ এই ধৈর্যই তোমাদের লক্ষ্যে পৌঁছাবে।

এই মুহূর্তে তোমাদের সবচেয়ে বড় অস্ত্র হলো মনের গভীর থেকে আসা অটুট আত্মবিশ্বাস। কোনোরূপ দ্বিধাদ্বন্দ্ব বা ভয়কে মনে স্থান না দিয়ে নিজের প্রস্তুতির ওপর পূর্ণ আস্থা রাখাই বিজয়ের মূল মন্ত্র। মনে রেখো, নেপোলিয়নের সেই বিখ্যাত উক্তি- ‘অসম্ভব শব্দটি কেবল বোকাদের অভিধানেই পাওয়া যায়।’

আজকের এই পরীক্ষার আঙিনা তোমাদের জীবনের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য নির্ধারণে সবচেয়ে বড় প্রভাবকের ভূমিকা পালন করবে। তোমরা ভবিষ্যতে কোন পথে হাঁটবে, কোন পেশায় সমাজ ও দেশের সেবা করবে, তার গতিপথ এখনই সুনির্দিষ্ট হবে। তাই এই সময়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নিজের অনুকূলে নিয়ে আসতে হবে।

উচ্চ মাধ্যমিকের গণ্ডি পেরিয়ে তোমরা প্রবেশ করতে যাচ্ছ এক সম্পূর্ণ নতুন দিগন্তে, যেখানে ডানা মেলার অপেক্ষায় রয়েছে হাজারো সম্ভাবনা। স্কুল-কলেজের চেনা গণ্ডি ছাড়িয়ে এক বৃহত্তর বিশ্বের নাগরিক হওয়ার আহ্বান লুকিয়ে আছে এই পরীক্ষার ফলাফলের মাঝে। এই নতুন দিগন্ত তোমাদের হাতছানি দিয়ে ডাকছে।

মনে রেখো, জীবনের কোনো বড় অর্জনই কঠোর পরিশ্রম ছাড়া সম্ভব নয়। তোমরা বিগত মাসগুলোতে যে বিনিদ্র রজনি পার করেছ, যে ক্লান্তিহীন পরিশ্রম করেছ, তা কখনো বৃথা যেতে পারে না। ‘পরিশ্রম সৌভাগ্যের প্রসূতি’- এই চিরন্তন সত্যটি তোমাদের পরীক্ষার প্রতিটি দিনেই প্রমাণিত হতে যাচ্ছে।

পরীক্ষার এই নিয়মতান্ত্রিক পরিবেশ ও পড়াশোনার চাপ তোমাদের চরিত্র গঠনে ও মানসিক দৃঢ়তা বাড়াতে দারুণভাবে সাহায্য করে। প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও মাথা ঠান্ডা রেখে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা তোমরা এই বয়সেই অর্জন করছ। একটি সুগঠিত চরিত্রই একজন মানুষকে সমাজের দরবারে প্রকৃত আদর্শ হিসেবে উপস্থাপন করে।

এই পরীক্ষার প্রতিটি মুহূর্ত তোমাদের জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা-সময়ানুবর্তিতা ও নিয়মানুবর্তিতা শেখায়। ৩ ঘণ্টার প্রতিটি মিনিটকে কীভাবে সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার করতে হয়, সেই কৌশল তোমাদের জানা আছে। সকাল ১০টা বাজার অন্তত ৩০ মিনিট আগে কেন্দ্রে প্রবেশ করে সময়ের সঠিক মূল্য দেওয়া তোমাদের জীবনের বড় সম্পদে পরিণত হবে।

তোমরাই তো আগামী দিনের স্মার্ট বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব, যাদের কাঁধে চড়ে দেশ এগিয়ে যাবে বিশ্বমঞ্চে। আজকের এই মেধার লড়াইয়ে যারা বিজয়ী হবে, তোমরাই আগামী দিনে দেশের বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, রাজনীতি ও অর্থনীতিকে নেতৃত্ব দেবে। তোমাদের এই নেতৃত্ব তৈরি হচ্ছে আজকের এই পরীক্ষার হলের কঠিন অনুশীলনের মধ্য দিয়ে।

পরীক্ষার খাতায় উপস্থাপনের ধরন এবং তোমাদের সাবলীল ভাষা মূলত তোমাদের সুন্দর ব্যক্তিত্ব প্রকাশের এক অন্যতম মাধ্যম। মার্জিত হাতের লেখা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা এবং নির্ভুল উত্তর তোমাদের রুচিশীল মানসিকতার পরিচয় বহন করে। তাই পরীক্ষার হলে শান্ত থেকে নিজের ব্যক্তিত্বের সেরা রূপটি ফুটিয়ে তোলো। 

যেকোনো ধরনের সীমাবদ্ধতার জয় করাই মানুষের প্রকৃত বীরত্ব। হয়তো অনেকেরই প্রস্তুতিতে কিছু খামতি ছিল, কিংবা পারিপার্শ্বিক নানা সমস্যা ছিল; কিন্তু সব বাধাকে মাড়িয়ে আজ তোমরা পরীক্ষার আসনে বসেছ। কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের মতো বুক চিতিয়ে বলো- ‘শাবাশ বাংলাদেশ, এ পৃথিবী অবাক তাকিয়ে রয়।’

একটি ভালো ফলাফল তোমাদের সমাজে এক অনন্য সামাজিক মর্যাদা এনে দেবে এবং একই সঙ্গে জীবনের নানামুখী দক্ষতা অর্জনে সাহায্য করবে। আধুনিক বিশ্বের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় এই দক্ষতা তোমাদের একধাপ এগিয়ে রাখবে। এটি কেবল নিজের জন্য নয়, বরং তোমাদের পরিবারের সম্মান বৃদ্ধিরও এক পরম সুযোগ।

পরীক্ষার এই শেষ সময়ে তোমাদের প্রয়োজন একটি দৃঢ় সংকল্প, যা কোনো অবস্থাতেই তোমাদের লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হতে দেবে না। শত ক্লান্তি বা মানসিক চাপের মুখেও যারা নিজেদের সংকল্পে অটল থাকে, দিনশেষে জয়ের মালা তারাই পরিধান করে। এই সংকল্পই তোমাদেরকে বিজয়ের শেষ প্রান্ত পর্যন্ত টেনে নিয়ে যাবে।

উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষাকে বলা চলে জীবনের সফলতার সিঁড়ির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মধ্যবর্তী ধাপ। এই ধাপটি যত মজবুত হবে, তোমাদের ওপরের দিকে ওঠার পথ ততটাই মসৃণ ও সহজ হবে। প্রতিটি বিষয়ের পরীক্ষাকে এক একটি সিঁড়ি মনে করে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে পা ফেলতে হবে।

দেশ গড়ার মহান কারিগর হিসেবে তোমাদের ভূমিকা অনস্বীকার্য। তোমাদের এই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ও মেধা কেবল তোমাদের ব্যক্তিগত উন্নতির জন্য নয়, বরং তা কাজে লাগবে দেশের সামগ্রিক উন্নয়নে। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষায় বলতে হয়- ‘আপনারে মস্ত করিয়া জানো, তবেই দেশের মঙ্গল হইবে।’ 

জাতীয় পর্যায়ে তোমাদের এই মেধার মূল্যায়ন করা হবে অত্যন্ত স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ প্রক্রিয়ায়। তোমাদের মেধা ও যোগ্যতার সঠিক স্বীকৃতি তোমাদেরকে ভবিষ্যতে আরও বড় বড় কাজের অনুপ্রেরণা জোগাবে। তাই কোনো ধরনের অসদুপায় বা অনিয়মের আশ্রয় না নিয়ে নিজের মেধার ওপর ভরসা রাখাই শ্রেয়।

তোমাদের হাত ধরেই রচিত হবে বাংলাদেশের এক সোনালি আগামী ও সম্ভাবনাময় এক নতুন ইতিহাস। তোমাদের সাফল্যে হাসবে দেশ, ধন্য হবে তোমাদের পিতা-মাতার ত্যাগ।

২০২৬ সালের এইচএসসি ও সমমানের সব পরীক্ষার্থীর জন্য রইল শুভেচ্ছা ও নদীমাতৃক এই বাংলার হৃৎ নিংড়ানো শুভকামনা। তোমরা সফল হও, বিজয়ী হও।

লেখক : প্রাবন্ধিক (মতামত লেখকের নিজস্ব)

সময়ের আলো/প্রিন্ট/কেএইচও 


  বিষয়:   এইচএসসি  পরীক্ষার্থী  সোনালি ভবিষ্যত  যাত্রী 


Loading...
Loading...
মতামত- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: