রাজধানীসহ সারা দেশে দিন দিন ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। এডিস মশার বংশবিস্তার প্রতিরোধ করার মতো দেশে গুণগত মানসম্মত মশার ওষুধ নেই। ওষুধ যাও আছে তা ডেঙ্গু মশা নিধনে কোনো কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না। ইতিমধ্যে অনেক মানুষ ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত হয়েছে। প্রায় প্রতিদিনই কাউকে না কাউকে ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালের দ্বারস্থ হতে হচ্ছে।
আক্রান্তদের মধ্যে কেউ কেউ মারাও গেছে। রাজধানীতে মশার উৎপাত সইতে হয় সারা বছরই। তবে বর্ষা মৌসুমে মশার যন্ত্রণা আরও বেড়ে যায়। মশা নিধন কার্যক্রমে ঢাকার উভয় সিটি করপোরেশনের কার্যক্রম নিয়ে জনমনে রয়েছে অসন্তোষ। রাজধানীর বাইরে ডেঙ্গু রোগীর চিকিৎসা নিয়ে অতীতে অনেক অভাব-অভিযোগ পাওয়া গেছে। এবার চিকিৎসা পাওয়া নিয়ে সংশয় রয়েছে।
ডেঙ্গু জ্বরের বেশ কিছু লক্ষণ রয়েছে। ডেঙ্গুতে আক্রান্ত মানুষের হঠাৎ উচ্চ জ¦র (১০৪ ফারেনহাইট বা তার বেশি) হতে পারে। শরীর ও মাথায় ব্যথা হয় তীব্র। চোখের পেছনে জ¦ালাপোড়া ও ব্যথা হয়। শরীর দুর্বল হয়ে পড়ে। ক্লান্তি অনুভূত হয়। তা ছাড়াও ত্বকে লালচে ফুসকুড়ি বা র্যাশ দেখা দেয়। বমি বমি ভাব হতে পারে। আক্রান্ত ব্যক্তির জয়েন্টে ও পেটে ব্যথা
থাকতে পারে। অনেক সময় নাক বা মলদ্বারে হালকা রক্তপাত হতে পারে। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বলেন, ডেঙ্গু জ¦রে আক্রান্ত হলে প্যারাসিটামল ট্যাবলেট ছাড়া অন্য কোনো ওষুধ খাওয়া ঠিক নয়। ডেঙ্গু থেকে বাঁচার জন্য মশারির মধ্যে ঘুমানোর অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।
ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় সৃষ্টি হয়েছে নানা ধরনের সংকট। প্রান্তিক অনেক মানুষ ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত হলেও অনেক সময় সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা পায় না। তারা টাকা-পয়সার অভাবে বেসরকারি হাসপাতালেও যেতে পারে না। জানা গেছে, ডেঙ্গু রোগের প্রকোপ বাড়ার কারণে হাসপাতালে রক্তের চাহিদা বেড়েছে কয়েকগুণ।
বর্ষা মৌসুম সবে শুরু হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আগামী দিনগুলোতে ডেঙ্গু আরও বিস্তৃত হবে। এখনই ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ না করলে এটা আরও খারাপ পরিস্থিতি তৈরি করবে। মশা নিধনে কার্যকর ওষুধ এ মুহূর্তে ছিটাতে না পারলে ডেঙ্গু প্রতিরোধ করা দুষ্কর। ওষুধ কার্যকর না হলে মশা মরবে না। ডেঙ্গু মোকাবিলায় ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন অবহেলা ও উদাসীনতার অভিযোগ রয়েছে।
হামের টিকার ঘাটতিতে দেশে স্বাস্থ্যবিপর্যয় দেখা দিয়েছে। পরে সরকার টিকার ব্যবস্থা করলেও হাম পরিস্থিতি এখনও নিয়ন্ত্রণে আসেনি। ডেঙ্গু প্রতিরোধে উদাসীনতা থাকলে হামের মতো আরেকটি স্বাস্থ্য বিপর্যয় দেখতে হতে পারে দেশের মানুষকে।
রাজধানীতে ইতিমধ্যে ডেঙ্গু তার ভয়ংকর রূপ দেখাতে শুরু করেছে। এর সঙ্গে যদি বৃষ্টি যোগ হয়, দেশে বন্যা হয়, তা হলে ডেঙ্গু দেশব্যাপী মহামারি আকার ধারণ করতে পারে। ইতিমধ্যে ডেঙ্গু সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ছে। ডেঙ্গুরোগী নতুন করে আর যাতে না বাড়তে পারে সেদিকে কর্তৃপক্ষকে নজরদারি বাড়াতে হবে। এডিস মশার প্রজনন নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, তা না হলে ডেঙ্গু প্রতিরোধ করা সরকারের পক্ষে সম্ভব হবে না।
সংশ্লিষ্ট সব কর্তৃপক্ষকে সমন্বিতভাবে ডেঙ্গু মোকাবিলায় অংশ নিতে হবে। পাশাপাশি বেসরকারি সংস্থাগুলোকেও এই কাজে যুক্ত করতে হবে। গড়ে তুলতে হবে ব্যাপক জনসচেতনতা। দেশব্যাপী যদি এডিস মশা নিয়ন্ত্রণ করা না যায় তা হলে আগামী শীতকাল পর্যন্ত ডেঙ্গু জ্বরের রোগীর সংখ্যাও বাড়তে থাকবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
দেশের সিটি করপোরেশন ও পৌরসভাগুলোকে সময় সময় ড্রেন, নালা, নর্দমা, জলাশয়, মজা পুকুর থেকে কচুরিপানাসহ অন্যান্য ময়লা পরিষ্কার করার উদ্যোগ নিতে হবে। নাগরিকদের স্ব স্ব বাসাবাড়ির ফুলের টব, ফুলদানি, রেফ্রিজারেটর, এয়ার কন্ডিশনার, বাথরুমের কমোড পরিষ্কার করতে হবে। ডাবের খোল, গাড়ির পরিত্যক্ত টায়ার-টিউবে জমে থাকা পানি নিয়মিত পরিষ্কার রাখা জরুরি। ঘনঘন মশার ওষুধ ও ব্লিচিং পাউডার ছিটাতে হবে। কোনোভাবেই অবহেলা করা যাবে না। অবহেলা করা হলে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়বে ছাড়া কমবে না।
ডেঙ্গু মশার আক্রমণ থেকে নিজেকে রক্ষা করতে এমন পোশাক পরা ভালো যাতে ত্বকের বড় একটা অংশ ঢাকা পড়ে। এডিস মশা সাধারণত সকালে ও সন্ধ্যায় সক্রিয় থাকে। এ সময় সতর্ক থাকা জরুরি। গুরুতর ডেঙ্গু জ্বর জীবনের জন্য হুমকিস্বরূপ এবং সাধারণত হাসপাতালে চিকিৎসার প্রয়োজন দেখা দেয়। আমরা যদি সুরক্ষিত থাকতে চাই, তবে আমাদের মশা থেকে নিরাপদ থাকতে হবে। আর প্রাপ্তবয়স্ক বা ডায়াবেটিস রোগীদের জটিলতা সম্পর্কে আরও সতর্ক ও সাবধান থাকতে হবে। সচেতনতার মাধ্যমে এই রোগের বিস্তার রোধ করা যেতে পারে।
রাজধানীতে বিশেষ করে পুরোনো ঢাকাতে ডেঙ্গু ছড়ানোর ঝুঁকি খুবই বেশি। রাজধানীতে ডেঙ্গু রোগের পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুযোগ আছে। ব্যবস্থাপনা মোটামুটি ভালো। তবে ঢাকার বাইরে বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় এ রোগের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির যথেষ্ট সংকট রয়েছে। শুধু যন্ত্রপাতি নয়, পর্যাপ্ত চিকিৎসক-নার্সেরও সংকট রয়েছে অনেক জায়গায়।
দেশের সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। কাজেই চিকিৎসক-নার্স সংকট দূর করা জরুরি। এ রোগের চিকিৎসার ব্যয়ভার গরিব ও দরিদ্র মধ্যবিত্ত পরিবারের পক্ষে অসহনীয়। বিষয়টি সরকারকে বিবেচনা করতে হবে।
ডেঙ্গুতে আক্রান্ত রোগী সময়মতো চিকিৎসাসেবা পেলে সুস্থ হয়ে উঠতে পারে। চিকিৎসকরা বলেছেন, ডেঙ্গু হলেই আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। তবে আক্রান্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসকের পরামর্শ মতো পরবর্তী চিকিৎসাসেবা চালিয়ে যেতে হবে। ডেঙ্গু জ্বরের সময় শরীরে ভীষণ ব্যথা হয় বলে অনেকে বিভিন্ন রকমের ব্যথনাশক ওষুধ খেয়ে থাকেন। এমন পরিস্থিতিতে ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া কোনো ব্যথার ওষুধ খাওয়া ঠিক নয়।
লেখক : গণমাধ্যমকর্মী
মতামত লেখকের নিজস্ব
সময়ের আলো/এসএকে