বুড়িগঙ্গা নদীর তীর ঘেঁষে গড়ে ওঠা ঢাকা, মুঘল আমলে যার পরিচিতি ছিল ‘৫২ বাজার ৫৩ গলির’ শহর, সেই শহরেই আজ দুই কোটিরও বেশি মানুষের বসবাস। এটি বিশ্বের দ্রুত বর্ধনশীল মেগাসিটিগুলোর একটি। কিন্তু এই রূপান্তরের পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের অপরিকল্পিত নগরায়ণ, দুর্বল নগর শাসন এবং পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ব্যর্থতার ইতিহাস।
ঢাকার ইতিহাস অন্তত চারশ বছরের পুরোনো। ইতিহাসে ঢাকা পাঁচবার রাজধানীর মর্যাদা লাভ করেছে। ১৬১০ সালে মুঘল সুবাদার ইসলাম খানের হাত ধরে ঢাকা বাংলার প্রাদেশিক রাজধানীর মর্যাদা লাভ করে। সে সময় লালবাগ, চকবাজার, মিটফোর্ড ও সদরঘাটকে কেন্দ্র করে নগরজীবনের বিকাশ ঘটে। অভিজাতদের জন্য ছিল এক বা দোতলা দালানকোঠা, আর সাধারণ মানুষের বসতি ছিল কম উচ্চতার কাঁচা ঘর। সেই সময়ের বাজার ও সরু গলিকেন্দ্রিক নগর কাঠামো থেকেই ‘৫২ বাজার ৫৩ গলি’ নামটির প্রচলন।
তবে নগর বিস্তারের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক পরিকল্পনা তখনও গড়ে ওঠেনি। ব্রিটিশ শাসনামলে, বিশেষ করে ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গের পর পূর্ববঙ্গ ও আসামের রাজধানী হিসেবে ঢাকার গুরুত্ব বাড়ে। ১৯১৭ সালে নগর পরিকল্পনাবিদ স্যার প্যাট্রিক গ্যাডেস প্রথমবারের মতো ঢাকাকে একটি পরিকল্পিত নগর হিসেবে কল্পনা করেন। তার পরিকল্পনা বাস্তবায়িত না হলেও ঢাকার পরিকল্পিত উন্নয়নের ধারণার সূচনা সেখান থেকেই।
চার দশকে ঢাকার পরিসর ছিল সীমিত। দক্ষিণে সদরঘাট থেকে উত্তরে পুরানা পল্টন, নয়াপল্টন, শান্তিনগর, মগবাজার ও তেজগাঁও; পশ্চিমে রায়েরবাজার এবং পূর্বে গেন্ডারিয়া, গোপীবাগ, মালিবাগ ও শান্তিনগর পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল নগরাঞ্চল।
শহরের আয়তন ছিল প্রায় ১২০ বর্গকিলোমিটার এবং জনসংখ্যা ছিল দুই থেকে আড়াই লাখের মধ্যে। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর ঢাকার চরিত্র দ্রুত বদলে যেতে শুরু করে। পূর্ববাংলার রাজধানী হওয়ায় বিপুলসংখ্যক মানুষের আগমন ঘটে। অভিবাসী মুসলমানদের আবাসনের জন্য মোহাম্মদপুর ও মিরপুরের মতো পরিকল্পিত আবাসিক এলাকা গড়ে তোলা হয়।
কিন্তু জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে তাল মিলিয়ে নগর ব্যবস্থাপনা এগোয়নি। দেশ বিভাগের পাঁচ বছর পর ঢাকার অপরিকল্পিত ইমারত ও ভবন নির্মাণ নিয়ন্ত্রণ করার আশু প্রয়োজনে সরকার ১৯৫২ সালে দ্য বিল্ডিং কনস্ট্রাকশন অ্যাক্ট, ১৯৫২ (ইস্ট বেঙ্গল অ্যাক্ট অব ১৯৫৩) শীর্ষক একটি আইন প্রণয়ন করে যা ছিল ভবন নির্মাণবিষয়ক নির্দেশনামূলক বিধিমালা। যা খুব বেশি কার্যকর না হওয়াও ১৯৫৩ সালে দ্য টাউন ইমপ্রুভমেন্ট অ্যাক্ট, ১৯৫৩ শীর্ষক গুরুত্বপূর্ণ আইন প্রণয়ন করে। উল্লেখ্য, টাউন ইমপ্রুভমেন্ট অ্যাক্ট ১৯৫৩-এর আওতায় ১৯৫৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ঢাকা ইমপ্রুভমেন্ট ট্রাস্ট বা ডিআইটি যা পরবর্তীতে ১৯৮৭ সালে রাজউক (রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ) নামে আত্মপ্রকাশ করে।
ডিআইটির যাত্রালগ্নে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ ছিল ঢাকার প্রথম মাস্টারপ্ল্যান (১৯৫৯-৬০) প্রণয়ন। যা ব্রিটিশ নগর পরিকল্পনাকারী দল মিনোপ্রিও, স্পেন্সলি এবং ম্যাকফারলেন প্রস্তুত করেন। এই পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০ বছরের জন্য ঢাকার উন্নয়ন কাঠামো নির্ধারণ করা হয় এবং ঢাকাকে প্রায় ২২০ বর্গমাইল এলাকাজুড়ে প্রসারিত করা হয়। ১৯৫৯ সালের মাস্টারপ্ল্যান ছিল ঢাকার প্রথম পূর্ণাঙ্গ নগর পরিকল্পনা। বনানী, গুলশান, তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল, মিরপুর ও মোহাম্মদপুরের মতো এলাকাগুলো সেই পরিকল্পনারই ফল।
কিন্তু স্বাধীনতার পর ঢাকার জনসংখ্যা যে হারে বৃদ্ধি পায়, ১৯৫৯ সালের মাস্টার প্ল্যান খুব দ্রুতই অপ্রতুল হয়ে পড়ে। পরবর্তীকালে ১৯৮১ সালের ঢাকা মেট্রোপলিটন এরিয়া ইন্টিগ্রেটেড আরবান ডেভেলপমেন্ট প্ল্যান এবং ১৯৯৫ সালের ঢাকা মেট্রোপলিটন ডেভেলপমেন্ট প্ল্যান (ডিএমডিপি) প্রণয়ন করা হয়। তিন স্তরবিশিষ্ট এই পরিকল্পনায় ছিল স্ট্রাকচার প্ল্যান, আরবান এরিয়া প্ল্যান এবং ডিটেইলড এরিয়া প্ল্যান (ডিএপি)। পরিকল্পনাগুলো কাগজে-কলমে যথেষ্ট আশাব্যঞ্জক হলেও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বারবার একই সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়েছে- প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়ের অভাব, প্রশাসনিক দুর্বলতা এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছার ঘাটতি।
স্বাধীনতার সময় ঢাকার জনসংখ্যা ছিল প্রায় ৯ লাখ। বর্তমানে মহানগর এলাকায় জনসংখ্যা প্রায় ১ কোটি ২৫ লাখ এবং বৃহত্তর মেগাসিটি এলাকায় প্রায় ২ কোটি ২০ লাখ। কিন্তু শহরের অবকাঠামো ও সেবাব্যবস্থা সেই অনুপাতে সম্প্রসারিত হয়নি।
ফলে অপরিকল্পিত আবাসন, তীব্র যানজট, বায়ু ও শব্দদূষণ, জলাবদ্ধতা, খাল ও জলাধার দখল, উন্মুক্ত স্থান হারিয়ে যাওয়া এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সংকট আজ ঢাকার নিত্যদিনের বাস্তবতা। একসময় যে ‘পূর্বের ভেনিস’ শহরকে বলা হতো, আজ সেটিই বিশ্বের অন্যতম কম বাসযোগ্য শহরের তালিকায় স্থান করে নিয়েছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, ঢাকার উন্নয়নে বর্তমানে অর্ধশতাধিক প্রতিষ্ঠান কাজ করছে। রাজউক, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন, ওয়াসা, বিআরটিএ, সড়ক ও জনপথ অধিদফতর, এলজিইডিসহ অসংখ্য সংস্থা ঢাকার নগরকে কেন্দ্র করে কাজ করলেও কার্যকর সমন্বয়ের অভাব প্রকট। ফলে একটি প্রতিষ্ঠানের পরিকল্পনা প্রায়ই অন্য প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে পড়ে।
ঢাকার ভবিষ্যৎ নিয়ে এখনই নতুনভাবে ভাবার সময় এসেছে। কেবল উঁচু ভবন, নতুন সড়ক কিংবা ফ্লাইওভার নির্মাণ একটি শহরকে বাসযোগ্য করে তোলে না। প্রয়োজন সমন্বিত নগর শাসনব্যবস্থা, কঠোর ভূমি ব্যবস্থাপনা, জলাধার ও খাল সংরক্ষণ, গণপরিবহনভিত্তিক উন্নয়ন, সাশ্রয়ী আবাসন, আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর নগর পরিকল্পনার কার্যকর বাস্তবায়ন। একই সঙ্গে রাজধানীকেন্দ্রিক উন্নয়নের পরিবর্তে দেশের অন্যান্য শহরে শিল্প, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সম্প্রসারণের মাধ্যমে ঢাকার ওপর জনসংখ্যার চাপ কমানোও সময়ের দাবি।
ঢাকার ইতিহাস আমাদের শেখায়- পরিকল্পনা ছাড়া নগর বড় হতে পারে, কিন্তু বাসযোগ্য হতে পারে না। ‘৫২ বাজার ৫৩ গলির’ শহর থেকে মেগাসিটিতে উত্তরণের এই দীর্ঘ যাত্রায় আমরা উন্নয়নের অনেক গল্প শুনেছি, কিন্তু সুশাসন ও পরিকল্পনার গল্প এখনও অসম্পূর্ণ। সেই অসমাপ্ত অধ্যায় পূরণ করতে না পারলে ভবিষ্যতের ঢাকা আরও বড় হবে, কিন্তু বাসযোগ্য হবে না।
লেখক : প্রভাষক, মোহাম্মদপুর মহিলা কলেজ, ঢাকা
মতামত লেখকের নিজস্ব
সময়ের আলো/এসএকে