যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া কতটা শক্তিশালী ইসরাইল

এম এ হোসাইন

মতামত

অতি সম্প্রতি ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এমন একটি কথা বলেছেন, যা অনেকের কাছেই বিস্ময়কর লেগেছে। তিনি বলেছেন, ইসরাইলকে ধীরে ধীরে

2026-07-06T03:36:20+00:00
2026-07-06T03:36:20+00:00
 
  সোমবার, ৬ জুলাই ২০২৬,
২২ আষাঢ় ১৪৩৩
সোমবার, ৬ জুলাই ২০২৬
মতামত
যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া কতটা শক্তিশালী ইসরাইল
এম এ হোসাইন
প্রকাশ: সোমবার, ৬ জুলাই, ২০২৬, ৩:৩৬ এএম 
গ্রাফিক : সময়ের আলো
অতি সম্প্রতি ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এমন একটি কথা বলেছেন, যা অনেকের কাছেই বিস্ময়কর লেগেছে। তিনি বলেছেন, ইসরাইলকে ধীরে ধীরে মার্কিন সামরিক সহায়তার ওপর নির্ভরতা কমাতে হবে এবং অস্ত্র উৎপাদনে আত্মনির্ভরশীল হতে হবে। কথাটি শুনতে বেশ জাতীয়তাবাদী মনে হতে পারে। যেকোনো দেশই নিজের নিরাপত্তার জন্য অন্যের ওপর নির্ভর করতে চায় না। আত্মনির্ভরতা সবসময়ই একটি আকর্ষণীয় ধারণা। 

কিন্তু রাষ্ট্রনীতিতে আকাক্সক্ষা আর বাস্তবতা এক জিনিস নয়। বাস্তবতা হলো, আধুনিক ইসরাইলের সামরিক ও কূটনৈতিক শক্তির পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা এতটাই গভীর যে ওয়াশিংটনের সমর্থন ছাড়া আজকের ইসরাইলকে কল্পনা করাই কঠিন। এটি কোনো রাজনৈতিক স্লোগান নয়; এটি একটি কৌশলগত পরম সত্য।

ইসরাইল দীর্ঘদিন ধরে নিজেদের এমন একটি রাষ্ট্র হিসেবে তুলে ধরেছে, যারা চারদিকের শত্রুদের মোকাবিলা করে নিজেদের মেধা, প্রযুক্তি ও সামরিক দক্ষতার মাধ্যমে টিকে আছে। এই বর্ণনায় অনেক সত্যও আছে। বিশ্বের অন্যতম দক্ষ গোয়েন্দা সংস্থা, উন্নত প্রতিরক্ষা শিল্প এবং অত্যন্ত কার্যকর সামরিক বাহিনী রয়েছে তাদের। কিন্তু সামরিক সক্ষমতা আর কৌশলগত স্বাধীনতা এক জিনিস নয়। ইসরাইলের শক্তির ওপর থেকে যদি আমেরিকার ছায়া সরে যায়, তা হলে দেশটির সামরিক ও কূটনৈতিক অবস্থানের অনেক সীমাবদ্ধতা সামনে চলে আসবে। পরিসংখ্যানই এর প্রমাণ দেয়।

সত্তর দশক থেকে যুক্তরাষ্ট্র ইসরাইলকে ১৫০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি সহায়তা দিয়েছে। বর্তমানে প্রতি বছর প্রায় ৩.৮ বিলিয়ন ডলার সামরিক সহায়তা দেওয়া হয়। ২০২৩ সালের অক্টোবরের হামলার পর এই সহায়তা আরও বেড়েছে। তবে অর্থই এখানে মূল বিষয় নয়। মূল বিষয় হলো- প্রযুক্তি, সরবরাহ ব্যবস্থা এবং কৌশলগত অংশীদারিত্ব। ইসরাইলের সবচেয়ে আধুনিক যুদ্ধবিমান এফ-৩৫ সম্পূর্ণভাবে মার্কিন প্রযুক্তি, যন্ত্রাংশ এবং রক্ষণাবেক্ষণের ওপর নির্ভরশীল। অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, যুক্তরাষ্ট্র যদি খুচরা যন্ত্রাংশ সরবরাহ বন্ধ করে দেয়, তা হলে কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই এসব যুদ্ধবিমানের কার্যক্রম সীমিত হয়ে পড়তে পারে।

যুদ্ধ কেবল অস্ত্রের মাধ্যমে জেতা যায় না; যুদ্ধ জেতা যায় অস্ত্র ব্যবস্থাকে দীর্ঘ সময় সচল রাখার মাধ্যমে। আর এখানেই ইসরাইলের নির্ভরতার বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সত্যি বলতে, আমেরিকার সহায়তা ছাড়া ইসরাইল একেবারে অসহায় হয়ে যাবে- এ কথাও পুরোপুরি ঠিক নয়। দেশটির নিজস্ব অস্ত্রশিল্প রয়েছে, উল্লেখযোগ্য অস্ত্রভান্ডার রয়েছে এবং অনেকের ধারণা অনুযায়ী তাদের পারমাণবিক প্রতিরোধ ক্ষমতাও আছে। তারা নিজেদের ভূখণ্ড রক্ষা করতে পারবে, ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করতে পারবে এবং সীমিত পরিসরে সামরিক অভিযানও চালাতে পারবে।

কিন্তু তারা কি একই সঙ্গে গাজা, লেবানন, সিরিয়া এবং ইরানের বিরুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ চালাতে পারবে? সম্ভবত পারবে না। সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্যের ঘটনাপ্রবাহ এই বাস্তবতাই তুলে ধরেছে। ২০২৩ সালের পর যুক্তরাষ্ট্র ইসরাইলকে বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদ ও সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ করেছে। পূর্ব ভূমধ্যসাগরে মার্কিন যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন করে সম্ভাব্য আঞ্চলিক যুদ্ধের ঝুঁকিও কমিয়েছে। গোয়েন্দা সহযোগিতাও ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ ইসরাইলের সামরিক শক্তি একা কাজ করেনি; এটি কাজ করেছে মার্কিন নিরাপত্তাবলয়ের মধ্যে দিয়ে।

আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে- কূটনৈতিক সুরক্ষা। জাতিসংঘে যুক্তরাষ্ট্র বহুবার ভেটো দিয়ে ইসরাইলকে এমন সব প্রস্তাব থেকে রক্ষা করেছে, যা দেশটিকে আন্তর্জাতিকভাবে বিচ্ছিন্ন বা নিষেধাজ্ঞার মুখে ফেলতে পারত। কয়েক দশক ধরে ওয়াশিংটন এমন একটি আন্তর্জাতিক পরিবেশ তৈরি করেছে, যেখানে ইসরাইল অন্য অনেক দেশের তুলনায় অনেক কম কূটনৈতিক মূল্য দিয়ে সামরিক অভিযান চালাতে পেরেছে।

একবার কল্পনা করুন, যদি এই কূটনৈতিক সুরক্ষা হঠাৎ করে হারিয়ে যায়। তা হলে আন্তর্জাতিক তদন্ত বাড়বে, অর্থনৈতিক চাপ বাড়বে, অস্ত্র নিষেধাজ্ঞার দাবি জোরালো হবে এবং ইউরোপের অনেক দেশ আরও কঠোর অবস্থান নিতে পারে। হয়তোবা ইসরাইল নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে না। কিন্তু তাদের কৌশলগত স্বাধীনতা অনেক সংকুচিত হয়ে যাবে।

সাবেক ইসরাইলি জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা চার্লস ফ্রেইলিচ একবার বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র কেবল ইসরাইলের মিত্র নয়; এটি ইসরাইলের প্রতিরোধ ব্যবস্থারই একটি অংশ। কথাটি গভীরভাবে ভাবার মতো। ইরান কেবল ইসরাইলকে মোকাবিলা করে না; ইরানকে হিসাব করতে হয় ইসরাইল এবং যুক্তরাষ্ট্রকে একসঙ্গে। হিজবুল্লাহও শুধু ইসরাইলি সেনাবাহিনীর শক্তি বিবেচনা করে না; তারা হিসাব করে যেকোনো সংঘাত আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিলে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি জড়িয়ে পড়তে পারে। অর্থাৎ, আমেরিকাকে বাদ দিলে পুরো মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগত সমীকরণই বদলে যায়।

এখানে আরেকটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন উঠে আসে- ইসরাইল কি অতিরিক্তভাবে আমেরিকার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে? উত্তরটি সম্ভবত হ্যাঁ। অনেক সমালোচকের মতে, যুক্তরাষ্ট্র শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক ও সামরিক সহায়তা দেবে- এই বিশ্বাস ইসরাইলকে অনেক সময় আরও বেপরোয়া ও ঝুঁকিপূর্ণ নীতি গ্রহণে উৎসাহিত করেছে। ইতিহাসে এমন উদাহরণ কম নয়। দক্ষিণ ভিয়েতনাম একসময় বিশ্বাস করত, আমেরিকার সমর্থন চিরস্থায়ী। আফগানিস্তানের সরকারও একই ধারণা পোষণ করেছিল। 

ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে, যখন কোনো রাষ্ট্র কোনো বৃহৎ শক্তির সমর্থনের ওপর অতিরিক্ত নির্ভর করে, তখন তারা প্রায়ই নিজেদের স্বাধীন সক্ষমতাকে অতিমূল্যায়ন করে। ইসরাইলের ক্ষেত্রেও এই বিষয়টি ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। কারণ আমেরিকার রাজনীতিও বদলাচ্ছে। নতুন প্রজন্মের অনেক মার্কিন নাগরিক আর আগের মতো নিঃশর্তভাবে ইসরাইলকে সমর্থন করেন না। অস্ত্র সরবরাহ বন্ধের দাবি এখন আর কেবল প্রান্তিক রাজনৈতিক গোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি মূলধারার আলোচনার অংশ হয়ে উঠছে। এ কারণেই নেতানিয়াহুর বক্তব্যকে শুধু রাজনৈতিক নাটক বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। এর ভেতরে ইসরাইলের ভবিষ্যৎ নিয়ে এক ধরনের উদ্বেগও আছে।

সবশেষে প্রশ্নটি হলো- ইসরাইল কি আমেরিকা ছাড়া টিকে থাকতে পারবে? উত্তর হলো, হ্যাঁ। তারা কি নিজেদের রক্ষা করতে পারবে? সম্ভবত পারবে। কিন্তু তারা কি দীর্ঘমেয়াদি বহুমুখী যুদ্ধ চালাতে পারবে, আঞ্চলিক সামরিক আধিপত্য বজায় রাখতে পারবে এবং একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক সুরক্ষা উপভোগ করতে পারবে? সে ক্ষেত্রে উত্তরটি নিঃসন্দেহে না।

সুতরাং প্রশ্ন ইসরাইলের অস্তিত্ব নিয়ে নয়। আসল প্রশ্ন হলো- গত অর্ধশতকে আমরা যে শক্তিশালী, আত্মবিশ্বাসী এবং আক্রমণাত্মক ইসরাইলকে দেখেছি, আমেরিকার সমর্থন ছাড়া সেই একই ইসরাইল কি টিকে থাকবে? প্রমাণ বলছে, উত্তরটি নেতিবাচক। কারণ ইসরাইল শুধু আমেরিকার সমর্থন পায় না; আধুনিক ইসরাইলের কৌশলগত অবস্থান অনেকাংশেই আমেরিকার শক্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। আর ইতিহাসের একটি কঠিন শিক্ষা হলো- যে রাষ্ট্র দীর্ঘদিন অন্যের ছায়ায় দাঁড়িয়ে থাকে, সেই ছায়া সরে গেলে তার প্রকৃত সক্ষমতা নতুন করে পরীক্ষা দিতে হয়।

লেখক : ভূরাজনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক
মতামত লেখকের নিজস্ব

সময়ের আলো/এসএকে


  বিষয়:   যুক্তরাষ্ট্র  শক্তিশালী  ইসরাইল  সময়ের আলো 


Loading...
Loading...
মতামত- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: