একটি পানীয়ের স্বাদ কেমন হবে, তা জানার আগেই আমরা তার সম্পর্কে একটি ধারণা তৈরি করে ফেলি। সেই ধারণার সবচেয়ে বড় উৎস হলো এর রং। দোকানের তাকজুড়ে সাজানো অসংখ্য পানীয়ের মধ্যে কোনটি আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করবে, কোনটি হাতে তুলে নেব এবং কোনটি কেনার সিদ্ধান্ত নেব- এসব ক্ষেত্রে রঙের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিপণন বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছেন, মানুষ প্রথমে চোখ দিয়ে কেনে, পরে মুখ দিয়ে স্বাদ গ্রহণ করে। ফলে খাদ্য ও পানীয় শিল্পে রং শুধু নান্দনিকতার বিষয় নয়; এটি একটি শক্তিশালী মনস্তাত্ত্বিক ও অর্থনৈতিক উপাদান।
বিশ্বব্যাপী খাদ্য ও পানীয় শিল্পের ইতিহাসে উজ্জ্বল, স্থিতিশীল এবং আকর্ষণীয় রং নিশ্চিত করতে কৃত্রিম রঙের ব্যবহার দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত। বিশেষ করে সফট ডিঙ্ক, এনার্জি ডিঙ্ক, স্পোর্টস ড্রিঙ্ক, ফল-স্বাদযুক্ত পানীয় এবং শিশুদের পানীয়ে কৃত্রিম রং ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়েছে। লাল, হলুদ, নীল কিংবা কমলা রঙের উজ্জ্বলতা নিশ্চিত করতে শিল্প-কারখানাগুলো নানা ধরনের সিনথেটিক ডাই ব্যবহার করে এসেছে। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশক থেকে পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তিত হতে শুরু করে। স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধি, খাদ্যের উপাদান সম্পর্কে ভোক্তাদের আগ্রহ এবং বিভিন্ন গবেষণায় কৃত্রিম খাদ্য রঙের সম্ভাব্য স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে আলোচনা বিশ্বব্যাপী নতুন একটি প্রবণতার জন্ম দিয়েছে- প্রকৃতি থেকে প্রাপ্ত রঙের দিকে প্রত্যাবর্তন।
বর্তমানে ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা এবং এশিয়ার উন্নত বাজারগুলোতে ‘ক্লিন লেবেল’ বা পরিচ্ছন্ন উপাদানসমৃদ্ধ পণ্যের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। ভোক্তারা এখন শুধু জানতে চান না পণ্যটি কতটা সুস্বাদু; তারা জানতে চান এটি কী দিয়ে তৈরি, কোথা থেকে এসেছে এবং এর উপাদানগুলো কতটা প্রাকৃতিক। ফলস্বরূপ, ‘নো আর্টিফিশিয়াল কালারস’, ‘ন্যাচারালি কালারড’ কিংবা ‘কালারড উইথ ফ্রুটস অ্যান্ড ভেজিটেবলস’ ধরনের দাবিগুলো আন্তর্জাতিক বাজারে শক্তিশালী বিপণন বার্তায় পরিণত হয়েছে।
বাংলাদেশেও এই পরিবর্তনের প্রভাব ক্রমশ দৃশ্যমান হচ্ছে। দেশের শহুরে মধ্যবিত্ত শ্রেণি, তরুণ প্রজন্ম এবং স্বাস্থ্য সচেতন ভোক্তাদের মধ্যে খাদ্য ও পানীয়ের উপাদান সম্পর্কে আগ্রহ আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের উপস্থিতি এবং বৈশ্বিক তথ্যপ্রবাহের কারণে ভোক্তারা এখন খাদ্যের পুষ্টিগুণের পাশাপাশি এর উপাদানের উৎস সম্পর্কেও সচেতন। ফলে কৃত্রিম রঙের পরিবর্তে উদ্ভিদভিত্তিক রং ব্যবহার বাংলাদেশি পানীয় শিল্পের জন্য শুধু একটি প্রযুক্তিগত বিকল্প নয়, বরং একটি কৌশলগত ব্যবসায়িক সুযোগ।
উদ্ভিদভিত্তিক রং বলতে সাধারণত ফল, সবজি, শৈবাল, ফুল, মূল, কন্দ এবং অন্যান্য উদ্ভিদ উৎস থেকে প্রাপ্ত প্রাকৃতিক রঞ্জককে বোঝায়। গাজর, বিট, কালো গাজর, বেগুনি মিষ্টি আলু, ব্লুবেরি, ব্ল্যাককারেন্ট, হলুদ, স্পিরুলিনা এবং বিভিন্ন ধরনের উদ্ভিদজাত উপাদান থেকে আজ অসংখ্য রং তৈরি করা সম্ভব। প্রযুক্তিগত অগ্রগতির কারণে বর্তমানে প্রাকৃতিক উৎস থেকেই লাল, গোলাপি, বেগুনি, হলুদ, কমলা, সবুজ এমনকি উজ্জ্বল নীল রংও তৈরি করা যাচ্ছে।
একসময় প্রাকৃতিক নীল রং পানীয় শিল্পের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। প্রকৃতিতে নীল রঞ্জকের উৎস সীমিত হওয়ায় খাদ্য ও পানীয় শিল্পকে দীর্ঘদিন কৃত্রিম নীল রঙের ওপর নির্ভর করতে হয়েছে। কিন্তু স্পিরুলিনা নামের অণুজীব থেকে প্রাপ্ত প্রাকৃতিক নীল রং সেই চিত্র বদলে দিয়েছে। বর্তমানে উন্নত প্রযুক্তির মাধ্যমে স্পিরুলিনা থেকে প্রাপ্ত রংকে বিভিন্ন ধরনের পানীয়ে ব্যবহার করা সম্ভব হচ্ছে। এর ফলে প্রাকৃতিক উৎস থেকে নীল, সবুজ ও বেগুনি রঙের নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
একইভাবে অ্যান্থোসায়ানিনসমৃদ্ধ কালো গাজর, বেগুনি মিষ্টি আলু, ব্লুবেরি এবং ব্ল্যাককারেন্ট থেকে গোলাপি, লাল ও বেগুনি রঙের বিস্তৃত পরিসর পাওয়া যায়। গাজর ও শৈবাল থেকে প্রাপ্ত ক্যারোটিনয়েড এবং হলুদ থেকে প্রাপ্ত কারকিউমিন উজ্জ্বল হলুদ ও কমলা রঙের চাহিদা পূরণ করছে। অর্থাৎ বর্তমানে এমন কোনো রং নেই, যার জন্য বাধ্যতামূলকভাবে কৃত্রিম রং ব্যবহার করতে হবে।
বাংলাদেশের জন্য এই পরিবর্তনের গুরুত্ব আরও বেশি। কারণ আমাদের দেশে কৃষি খাত এখনও অর্থনীতির অন্যতম ভিত্তি। প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ গাজর, বিট, হলুদ, মিষ্টি আলু, আম, পেঁপে, ড্রাগন ফল, কালোজাম, লাল শাক এবং অন্যান্য রংসমৃদ্ধ কৃষিপণ্য উৎপাদিত হয়। এসব কৃষিপণ্যের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ মৌসুমি অতিরিক্ত উৎপাদনের কারণে ন্যায্যমূল্য পায় না বা অপচয় হয়। যদি এসব কাঁচামাল থেকে খাদ্যমানসম্পন্ন প্রাকৃতিক রং উৎপাদনের প্রযুক্তি উন্নয়ন করা যায়, তা হলে কৃষকদের জন্য নতুন বাজার সৃষ্টি হবে এবং কৃষিপণ্যের মূল্য সংযোজন বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে।
বিশ্বব্যাপী প্রাকৃতিক খাদ্য রঙের বাজার ইতিমধ্যে কয়েক বিলিয়ন ডলারের শিল্পে পরিণত হয়েছে এবং আগামী দশকে এর প্রবৃদ্ধি আরও বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বাংলাদেশ এই বাজারে এখনও উল্লেখযোগ্যভাবে প্রবেশ করতে পারেনি। অথচ দেশের কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি, তুলনামূলক কম উৎপাদন ব্যয় এবং ক্রমবর্ধমান খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প এই খাতে বিনিয়োগের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করেছে। সঠিক গবেষণা, নীতিগত সহায়তা এবং শিল্প বিনিয়োগের মাধ্যমে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় প্রাকৃতিক খাদ্য উপাদান উৎপাদনের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠতে পারে।
তবে সুযোগের পাশাপাশি কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। প্রাকৃতিক রঙের স্থায়িত্ব কৃত্রিম রঙের মতো সবসময় সমান নয়। পানীয়ের অম্লতা, তাপমাত্রা, আলো, সংরক্ষণকাল এবং অন্যান্য উপাদানের সঙ্গে রাসায়নিক মিথস্ক্রিয়া প্রাকৃতিক রঙের স্থায়িত্বকে প্রভাবিত করতে পারে। ফলে এসব রং ব্যবহারের জন্য উন্নত ফর্মুলেশন প্রযুক্তি, মান নিয়ন্ত্রণ এবং গবেষণার প্রয়োজন হয়। বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং শিল্প খাতের মধ্যে আরও ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা ছাড়া এই খাতে কাক্সিক্ষত অগ্রগতি সম্ভব হবে না।
এখানে সরকারেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। কৃষি, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং শিল্পনীতির মধ্যে সমন্বয় ঘটিয়ে উদ্ভিদভিত্তিক রং উৎপাদন ও ব্যবহারে প্রণোদনা দেওয়া যেতে পারে। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্থানীয় কাঁচামাল থেকে খাদ্যমানসম্পন্ন প্রাকৃতিক রং উৎপাদনের প্রযুক্তি উদ্ভাবনে উৎসাহিত করতে হবে। কৃষক, গবেষক এবং শিল্প উদ্যোক্তাদের মধ্যে একটি কার্যকর সংযোগ তৈরি করা গেলে এই খাত নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করতে পারে।
সবচেয়ে বড় কথা, উদ্ভিদভিত্তিক রং শুধু একটি উপাদান নয়; এটি একটি গল্প। এমন একটি গল্প, যেখানে কৃষকের মাঠ, প্রকৃতির রং, স্বাস্থ্য সচেতন ভোক্তা এবং আধুনিক শিল্প এক সুতোয় গাঁথা। যখন কোনো পানীয়ের বোতলে লেখা থাকে যে এর রং এসেছে ফল বা সবজি থেকে, তখন সেটি শুধু একটি বিপণন বার্তা নয়; এটি ভোক্তার সঙ্গে আস্থার সম্পর্ক তৈরির একটি মাধ্যম।
বিশ্ব যখন ক্রমশ প্রাকৃতিক, টেকসই এবং স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্য ব্যবস্থার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, তখন বাংলাদেশের জন্যও সময় এসেছে সেই পরিবর্তনের অংশ হওয়ার। উদ্ভিদভিত্তিক রঙের ব্যবহার শুধু পানীয় শিল্পকে আরও আধুনিক ও প্রতিযোগিতামূলক করে তুলবে না; এটি কৃষি, গবেষণা, শিল্পায়ন এবং রফতানি সম্ভাবনার একটি নতুন দিগন্তও উন্মোচন করতে পারে। প্রকৃতির রংকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশের পানীয় শিল্প এক নতুন যুগে প্রবেশ করতে পারে- যে যুগ হবে আরও নিরাপদ, আরও টেকসই এবং আরও সমৃদ্ধ।
লেখক : খাদ্যবিজ্ঞানী, বার্মিংহাম, যুক্তরাজ্য
মতামত লেখকের নিজস্ব
সময়ের আলো/এসএকে