কেপভার্দে ছোট্ট একটি দেশ। দেশটি পশ্চিম আফ্রিকার মূল ভূখণ্ড থেকে প্রায় ৫৭০ কিলোমিটার পশ্চিমে আটলান্টিক মহাসাগরে অবস্থিত। এটি ছোট্ট একটি দ্বীপরাষ্ট্র। ১০টি প্রধান দ্বীপ নিয়ে এই দেশ গঠিত। এর রাজধানী হচ্ছে বৃহত্তম শহর প্রায়া। কেপভার্দের জনসংখ্যা প্রায় ৫ লাখ ৩০ হাজার। আয়তন ৪ হাজার ৩৩ বর্গকিলোমিটার। আমাদের দেশের ময়মনসিংহ জেলার চেয়ে ছোট্ট আয়তনের দেশ এটি। ময়মনসিংহ জেলার আয়তন ৪ হাজার ৩৬৩ বর্গকিলোমিটার।
আর্জেন্টিনার বিপক্ষে বিশ্বকাপ ফুটবল খেলার আগে এই দেশটিকে তেমন কেউ চিনত না। অথচ একটি খেলার মাধ্যমে বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের মন জয় করে নিল দেশটি। বিশ্বের বুকে জানান দিল তাদের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অবস্থান। সেই সঙ্গে এটাও জানান দিল তারা কতটা দেশপ্রেমিক জাতি। তাদের শিষ্টাচারও প্রশংসনীয়।
আর আমরা বিশ কোটি মানুষ বিভক্ত আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিল সমর্থক হিসেবেই। যদিও আমরা ছোট থেকেই ফুটবলের প্রতি ভালোবাসা নিয়ে বড় হয়েছি। পাড়া-মহল্লা, স্কুল-কলেজে ফুটবল খেলা হতে দেখেছি। ফুটবল খেলা নিয়ে অনেক গল্পও শুনেছি। আমাদের দেশের মানুষের ফুটবলপ্রেম অসাধারণ। সব মানুষ ফুটবলকে মনে-প্রাণে ভালোবাসে। অথচ বর্তমানে আমাদের ফুটবল খেলার কী করুণ দশা!
আগে জাতীয় পর্যায়ে আবাহনী ক্রীড়া চক্র, মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবসহ বিভিন্ন ক্লাবের সমন্বয়ে এবং জেলা পর্যায়ে উৎসবমুখর পরিবেশে বিশাল আয়োজনে ফুটবল খেলা অনুষ্ঠিত হতো। ফুটবল খেলাকে ঘিরে একটা আনন্দ-উৎসব বয়ে যেত। ফুটবল খেলার সেই স্বর্ণালি দিন কোথায় যেন হারিয়ে গেছে। দেশের ভেতরে জাতীয় পর্যায়ে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আমাদের ফুটবলে অর্জন শূন্য। আমরা পারছি না কেন?
একটা দেশ শুধু অর্থনৈতিক ও সম্পদ অর্জনের মধ্য দিয়েই এগিয়ে যায় না, সঙ্গে সঙ্গে তার সংস্কৃতি ও খেলাধুলায় পারদর্শী হতে হয়। সংস্কৃতি যেমন একটা জাতির দর্পণ, তেমনি খেলাধুলা বলিষ্ঠ ও কর্মঠ মানুষ তৈরি করে। এর চেয়েও বেশি অর্জন হয় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে খেলাধুলায় এগিয়ে গেলে দেশের ভাবমূর্তি বাড়ে, বহির্বিশ্বের কূটনীতি হয় সুদৃঢ়।
আমাদের দেশে ফুটবলের জনপ্রিয়তা থাকার পরও আন্তর্জাতিক মানে এগিয়ে যেতে পারছে না কেন? এর তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ প্রয়োজন। প্রয়োজন ফুটবল ফেডারেশনকে ঢেলে সাজানো। প্রয়োজন রাষ্ট্রের বিশেষ পৃষ্ঠপোষকতা। প্রয়োজন রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত নেতৃত্ব।
ছোট্ট আয়তনের ৫ লাখ ৩০ হাজার মানুষের দেশ কেপভার্দে পারলে আমরা পারি না কেন? একবারও কি দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা ভাবেন না আমাদের কীসের অভাব? আমরা শুধু দর্শক হয়ে বিশ্বকাপ খেলা দেখতে চাই না। আমরা বিশ্বকাপে খেলতে চাই।
বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে) বাংলাদেশের ফুটবল খেলার সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা। ১৯৭২ সালের ১৫ জুলাই প্রতিষ্ঠিত হয় সংস্থাটি। ১৯৭৪ সালে এএফসি এবং ১৯৭৬ সালে ফিফার সদস্যপদ লাভ করে। এর সদর দফতর ঢাকার মতিঝিলে অবস্থিত। নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাফুফে নতুন করে সাজানোর প্রয়োজন হলে তাও করা উচিত। অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দ, জনবল কাঠামো বাড়ানো এবং বিদেশি অভিজ্ঞ কোচ নিয়োগ দেওয়া সময়ের দাবি। দেশের ফুটবলকে পিছিয়ে রাখার সুযোগ নেই।
এবার বিশ্বকাপে ৪৮টি দেশ অংশগ্রহণ করেছে। যেখানে আগে ৩২টি দেশ খেলত। জাতিসংঘের অন্তর্ভুক্ত দেশ হচ্ছে ১৯৩টি। পৃথিবীতে মোট স্বাধীন রাষ্ট্রের সংখ্যা ২১০টি। পৃথিবীর প্রতি চারটি রাষ্ট্রের মধ্যে একটি রাষ্ট্র এবার বিশ্বকাপে খেলতে এসেছে। কেপভার্দের মতো বেশ কয়েকটি ছোট রাষ্ট্রও খেলতে এসেছে তাদের যোগ্যতায়। অথচ আমরা নাই। আমাদের সবই আছে তবু আমরা ফুটবলে এগিয়ে যেতে পারছি না।
পুরোনো ধ্যানধারণা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে আমাদের। আমাদের শক্তিশালী জনসম্পদ রয়েছে। তাদের কাজে লাগাতে হবে। বিশ কোটি জনসংখ্যার দেশে ১১ জন বিশ্বসেরা ফুটবলার বের করা অস্বাভাবিক হওয়ার কথা না। কারণ আমাদের দেশের ছেলেমেয়েরা হিমালয় জয় করছে। এ পর্যন্ত ৮ জন হিমালয়ের সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ মাউন্ট এভারেস্ট জয় করে এসেছে। আমাদের পক্ষে বিশ্বকাপ ফুটবলেও খেলা সম্ভব। এর জন্য শুধু নিরপেক্ষ পৃষ্ঠপোষকতা প্রয়োজন। প্রয়োজন আন্তরিক ও দক্ষ মানুষগুলোকে দায়িত্ব দেওয়া।
সহকারী অধ্যাপক, ভূগোল বিভাগ
মুক্তিযোদ্ধা কলেজ, গাজীপুর
মতামত লেখকের নিজস্ব
সময়ের আলো/আআ