চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও রাঙামাটিতে টানা বৃষ্টির মধ্যে তিন দিনে পাহাড়ধস ও দেয়ালচাপায় মারা গেছেন ২৫ জন। গত মঙ্গলবার চট্টগ্রামে ৪১২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে, যা ৪৩ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। ভারী বৃষ্টি পাহাড়ের বাসিন্দাদের জন্য বিপর্যয় বয়ে এনেছে।
তবে ভারী বৃষ্টি যে হবে সেই পূর্বাভাস আগেই দিয়েছিল আবহাওয়া অধিদফতর। বর্ষাকালে ভারী বৃষ্টি নতুন ঘটনা নয়। বর্ষা বরাবরই পাহাড়ের বাসিন্দাদের জীবনকে ঝুঁকিতে ফেলে। প্রশ্ন হচ্ছে, সেই ঝুঁকি মোকাবিলায় রাষ্ট্র ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রস্তুতি কতটা কার্যকর ছিল।
এক হিসাব অনুযায়ী, ১৯৭০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত দেশে পাহাড়ধসে প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ৭৩৬ জন। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে চট্টগ্রাম অঞ্চল। কারণ সেখানকার নরম বেলেমাটির পাহাড় ভারী বৃষ্টিতে সহজেই ধসে পড়ে। মানুষের কিছু কর্মকাণ্ডে প্রাকৃতিক এই ঝুঁকি আরও প্রাণঘাতী হয়ে ওঠে। অবৈধ পাহাড় কাটা, বন উজাড়, অপরিকল্পিত বসতি, দুর্বল পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা এবং পাহাড়ের পাদদেশে অনিয়ন্ত্রিত স্থাপনা নির্মাণ এই ঝুঁকিকে আরও বড় করে।
পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটির হিসাবে চট্টগ্রামে অন্তত ২৫টি ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ে এক লাখের বেশি মানুষ বসবাস করেন। এসব মানুষের বেশিরভাগই নিম্ন আয়ের। এসব মানুষ পাহাড়ে বসবাসের ঝুঁকি সম্পর্কে জানেন। নিরাপদ বিকল্পের অভাবে তারা সব জেনেবুঝেই বাধ্য হয়ে সেখানে বসবাস করেন। স্বার্থান্বেষী একটি গোষ্ঠী অবৈধভাবে পাহাড় কেটে ঘর তৈরি করে। প্রভাবশালী মহলের মদদে সেসব ঘর ভাড়া দেওয়া হয়। সেখানে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানি সংযোগও দেওয়া হয়। এভাবে পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণ বসতি একটি স্থায়ী রূপ
পায়। আর এ কারণে পাহাড়ধসকে কেবল প্রাকৃতিক দুর্যোগ বলা যায় না; এটি আবাসন, দারিদ্র্য ও ভূমি ব্যবস্থাপনারও সমস্যা। যতদিন এই বাস্তবতা বদলানো না যাবে, ততদিন কেবল উদ্ধার অভিযান বা মৌসুমি উচ্ছেদে টেকসই সমাধান
মিলবে না।
এ কথা সত্য যে, রেকর্ড বৃষ্টি হলে যেকোনো প্রশাসনের জন্য সেটা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। আবার এটিও সত্য যে পুনর্বাসনের পরও অনেক মানুষ জীবিকার প্রয়োজনে পাহাড়ে ফিরে যায়। তা সত্ত্বেও পাহাড়ধসে মৃত্যুর ঘটনায় সংশ্লিষ্ট প্রশাসন দায় এড়াতে পারে না।
আবহাওয়া অধিদফতর আগাম সতর্কতা পাওয়ার পর তাদের তৎপরতা জোরালো হওয়া উচিত। জেলা প্রশাসন, স্থানীয় সরকার, পরিবেশ অধিদফতর, পাহাড়ের মালিক প্রতিষ্ঠান, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় থাকা দরকার। অবৈধ পাহাড় কাটা, ঝুঁকিপূর্ণ বসতি নির্মাণ ও ভাড়া দেওয়ার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ধারাবাহিক আইনি ব্যবস্থা না নেওয়াও বড় ব্যর্থতা।
ভবিষ্যতে পাহাড়ধসে প্রাণহানি এড়াতে এখনই সতর্ক হতে হবে। আবহাওয়ার পূর্বাভাসের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রশাসনকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। ভারী বর্ষণের আগেই ঝুঁকিপূর্ণ স্থান থেকে বাসিন্দাদের সরিয়ে নিতে হবে।
আশ্রয়কেন্দ্রগুলোকে মানুষের জন্য ব্যবহারযোগ্য করে তুলতে হবে। ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়গুলোর হালনাগাদ মানচিত্র ও বাসিন্দাদের তথ্যভান্ডার তৈরি করে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ নিশ্চিত করা জরুরি। অবৈধ পাহাড় কাটা, ঝুঁকিপূর্ণ ঘর নির্মাণ, ভাড়া দেওয়া বন্ধ করতে হবে কঠোরভাবে। অবৈধ গ্যাস-পানি-বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়ার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে সমানভাবে আইন প্রয়োগ করতে হবে। নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর জন্য নিরাপদ পুনর্বাসন ও কর্মসংস্থানের সুযোগ নিশ্চিত না করলে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় ফিরে যাওয়ার প্রবণতা কমবে না।
প্রতি বর্ষায় পাহাড়ে একই শোকের পুনরাবৃত্তি কাম্য নয়। পাহাড়ধসে মানুষের মৃত্যু কোনো অনিবার্য নিয়তি নয়। প্রাকৃতিক ঝুঁকি পুরোপুরি ঠেকানো সম্ভব না হলেও তার ক্ষতি অনেকটাই কমানো সম্ভব। এ জন্য চাই গবেষণাভিত্তিক পরিকল্পনা, কঠোর আইন প্রয়োগ, কার্যকর পুনর্বাসন এবং আন্তঃপ্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়।
সময়ের আলো/আআ