যে উৎসবে বিভেদ ভুলে উল্লাসে মাতে বিশ্ব

মতামত

আজকের পৃথিবী নানা সংকটে জর্জরিত। ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, আফ্রিকার গৃহযুদ্ধ, সীমান্ত বিরোধ, বাণিজ্য যুদ্ধ, জাতিগত সংঘর্ষ- মানবসভ্যতা যেন ক্রমাগত

2026-07-13T04:25:36+00:00
2026-07-13T04:25:36+00:00
 
  সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬,
২৯ আষাঢ় ১৪৩৩
সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬
মতামত
যে উৎসবে বিভেদ ভুলে উল্লাসে মাতে বিশ্ব
প্রকাশ: সোমবার, ১৩ জুলাই, ২০২৬, ৪:২৫ এএম 
গ্রাফিক : সময়ের আলো
আজকের পৃথিবী নানা সংকটে জর্জরিত। ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, আফ্রিকার গৃহযুদ্ধ, সীমান্ত বিরোধ, বাণিজ্য যুদ্ধ, জাতিগত সংঘর্ষ- মানবসভ্যতা যেন ক্রমাগত বিভক্তির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এই বাস্তবতায় বিশ্বকাপ ফুটবল আমাদের একটি ভিন্ন শিক্ষা দেয়। শেখায় যে- প্রতিযোগিতা থাকতে পারে কিন্তু শত্রুতা নয়; মতপার্থক্য থাকতে পারে কিন্তু ঘৃণা নয়।

বিশ্বরাজনীতিও যদি এই সংস্কৃতি থেকে শিক্ষা নিতে পারত তা হলে অনেক সংঘাত হয়তো আলোচনার টেবিলেই সমাধান হতো। বিশ্বকাপ কেবল প্রতিযোগিতার শিক্ষা দেয় না; এটি মানবিক সহাবস্থানেরও শিক্ষা দেয়। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের লাখো সমর্থক একই শহরে, একই স্টেডিয়ামে, একই পরিবেশে অবস্থান করে চলছে বিশ্বকাপ ফুটবল। উন্মাদনা ছড়িয়েছে সারা বিশ্বে। সেই উন্মাদনা থেকে বাংলাদেশ পিছিয়ে নেই কোনো অংশে। ছেলেবুড়ো সবাই মিলে দেখছে বিশ্বকাপ ফুটবল খেলা। 

চার বছর পরপর অনুষ্ঠিত এই মহাযজ্ঞ শুধু একটি ক্রীড়া প্রতিযোগিতা নয়; এটি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় মানবিক মিলনমেলা, আবেগের উৎসব এবং বিশ্ব সম্প্রীতির এক অনন্য প্রতীক। বিশ্বকাপ শুরু হলে পৃথিবীর রাজনৈতিক মানচিত্র যেন কিছু সময়ের জন্য নতুন রূপ ধারণ করে। যুদ্ধরত দেশের মানুষও খেলার আলোচনা করে, রাজনৈতিক মতভেদে বিভক্ত পরিবারও একসঙ্গে বসে ম্যাচ দেখে, ভাষা ও সংস্কৃতির পার্থক্য ভুলে কোটি কোটি মানুষ একই উল্লাসে মেতে ওঠে। এমন দৃশ্য পৃথিবীর আর কোনো অনুষ্ঠানে খুব কমই দেখা যায়।

মানুষের মন নিবিষ্ট থাকে টিভির পর্দায় পায়ের জাদু আর ফুটবলের কারিকুরি দেখতে। বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এর সর্বজনীনতা। ধর্ম, বর্ণ, ভাষা, জাতিগত পরিচয় কিংবা রাজনৈতিক মতাদর্শ- কোনোটিই এখানে প্রধান নয়। একজন মুসলিম, খ্রিস্টান, হিন্দু, বৌদ্ধ বা ইহুদি একই স্টেডিয়ামে বসে একই দলের জন্য চিৎকার করতে পারে। একজন আফ্রিকান, ইউরোপীয়, এশীয় কিংবা লাতিন আমেরিকান একই আনন্দ উদযাপন করতে পারে। ফুটবল এমন একটি ভাষা, যার কোনো অনুবাদের প্রয়োজন হয় না।

আজকের পৃথিবী নানা সংকটে জর্জরিত। ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, আফ্রিকার গৃহযুদ্ধ, সীমান্ত বিরোধ, বাণিজ্য যুদ্ধ, জাতিগত সংঘর্ষ- মানবসভ্যতা যেন ক্রমাগত বিভক্তির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এই বাস্তবতায় বিশ্বকাপ ফুটবল আমাদের একটি ভিন্ন শিক্ষা দেয়। শেখায় যে- প্রতিযোগিতা থাকতে পারে কিন্তু শত্রুতা নয়; মতপার্থক্য থাকতে পারে কিন্তু ঘৃণা নয়। বিশ্বরাজনীতিও যদি এই সংস্কৃতি থেকে শিক্ষা নিতে পারত তা হলে অনেক সংঘাত হয়তো আলোচনার টেবিলেই সমাধান হতো। বিশ্বকাপ কেবল প্রতিযোগিতার শিক্ষা দেয় না; এটি মানবিক সহাবস্থানেরও শিক্ষা দেয়। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের লাখো সমর্থক একই শহরে, একই স্টেডিয়ামে, একই পরিবেশে অবস্থান করে। সারা বিশ্বের অভিভাবক হিসেবে জাতিসংঘ রাজনৈতিক কূটনীতির মাধ্যমে বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে।

বিশ্বকাপ ফুটবল আবেগ, সংস্কৃতি এবং মানুষের পারস্পরিক সম্পর্কের মাধ্যমে একই লক্ষ্য অর্জনের চেষ্টা করে। অনেক সময় ক্রীড়া কূটনীতি রাজনৈতিক কূটনীতির চেয়েও কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে। 

ইতিহাসে দেখা গেছে- ক্রীড়া প্রতিযোগিতা বহু দেশের মধ্যে সম্পর্ক উন্নয়নে ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছে। বিশ্ব কূটনীতি সাধারণত রাষ্ট্রপ্রধান, পররাষ্ট্রমন্ত্রী, দূতাবাস কিংবা আন্তর্জাতিক সম্মেলনের মাধ্যমে পরিচালিত হয়েছে। কিন্তু কখনো কখনো একটি ফুটবল ম্যাচ, একটি গোল কিংবা একটি ক্রীড়া প্রতিযোগিতাও এমন কাজ করে দেখিয়েছে, যা দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক আলোচনাও করতে পারেনি। অনেক ক্ষেত্রে ফুটবল রাজনৈতিক উত্তেজনা কমিয়েছে, বৈরী দেশগুলোর মধ্যে সংলাপের সুযোগ সৃষ্টি করেছে এবং পারস্পরিক আস্থার পরিবেশ গড়ে তুলেছে। ফুটবল কূটনীতির অন্যতম আলোচিত উদাহরণ তুরস্ক ও আর্মেনিয়ার সম্পর্ক।

২০০৮ সালে বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের একটি ফুটবল ম্যাচ উপলক্ষে আর্মেনিয়ার রাজধানী ইয়েরেভানে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট আবদুল্লাহ গুল সফর করেন। এটি ছিল দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের বৈরিতার পর একটি নয়া ডেভেলপমেন্ট। পরবর্তীকালে উভয় দেশের মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগ বৃদ্ধি পায় এবং সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের প্রচেষ্টা শুরু হয়। দীর্ঘ সাত দশকের রাজনৈতিক ও সামরিক উত্তেজনার মধ্যেও ফুটবল দুই কোরিয়ার মধ্যে যোগাযোগের সেতুবন্ধ হিসেবে কাজ করেছে।

বিশ্বকাপ ফুটবল খেলার সূত্র ধরে আর্জেন্টিনা ও বাংলাদেশের মধ্যে সম্পর্ক গভীরতর হচ্ছে। বাংলাদেশে আর্জেন্টিনার সমর্থক সবচেয়ে বেশি। আর্জেন্টিনার নিয়ে বাংলাদেশের ফুটবলপ্রেমীদের উচ্ছ্বাস ও উন্মাদনা নজর কেড়েছে আর্জেন্টিনার ফুটবলার এবং সে দেশের কূটনীতিকদের। আফ্রিকার দেশ আইভরি কোস্টে এ ফুটবল সরাসরি শান্তি প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রেখেছিল। ২০০৫ সালে বিশ্বকাপে যোগ্যতা অর্জনের পর জাতীয় দলের অধিনায়ক দিদিআর দ্রগবা জাতির উদ্দেশে আবেগঘন আহ্বান জানান। তার অনুরোধে বিদ্রোহী ও সরকারি পক্ষ আলোচনায় বসে। দেশটির গৃহযুদ্ধ প্রশমনে এই ঘটনা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। ফুটবল সেখানে শুধু খেলা ছিল না; ছিল জাতীয় পুনর্মিলনের প্রতীক। শান্তির প্রতীক। মানবিকতার প্রতীক।

চীন দীর্ঘদিন ধরে ফুটবলকে ‘সফট পাওয়ার’ হিসেবে ব্যবহার করার চেষ্টা করছে। আন্তর্জাতিক ক্লাব প্রতিযোগিতা, বিদেশি খেলোয়াড় আমন্ত্রণ এবং ক্রীড়া অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে দেশটি বৈশ্বিক যোগাযোগ বাড়ানোর কৌশল গ্রহণ করেছে। 

ফুটবলের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এর সর্বজনীনতা। যেসব দেশ ফুটবল বিশ্বকাপের চূড়ান্ত পর্যায়ে জায়গা করে নিতে পারছে না তারাও ফুটবল বিশ্বকাপ ও ফুটবলারদের সমীহ করছে, ভালোবাসছে। ফুটবল নিয়ে নতুন করে চিন্তাভাবনা করছে। রাজনৈতিক ভাষণ মানুষকে বিভক্ত করতে পারে, কিন্তু একটি গোল উদযাপন মানুষকে একত্রিত করে। 

রাষ্ট্রনায়কদের আলোচনায় যেখানে আনুষ্ঠানিকতা থাকে, ফুটবলে সেখানে থাকে আবেগ, উচ্ছ্বাস ও উন্মাদনা। এই আবেগ জনগণের মধ্যে ইতিবাচক মনোভাব তৈরি করে, যা পরবর্তীকালে রাজনৈতিক সম্পর্ক উন্নয়নের ক্ষেত্র প্রস্তুত করে নিঃসন্দেহে।

বিশ্ব ফুটবল সারা বিশ্বের মানুষকে এক মঞ্চে নিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছে। কখনো কখনো একটি ফুটবল ম্যাচ এমন দরজা খুলে দেয়, যা বহু বছরের কূটনৈতিক আলোচনা খুলতে পারেনি। ফুটবল যুদ্ধ থামাতে না পারলেও শত্রুতার দেয়ালে প্রথম ফাটল ধরাতে পারে। ফুটবল শান্তি ও সম্প্রীতির বার্তা পৌঁছে দিতে পারে বিশ্বব্যাপী। ফুটবল একজন মানুষকে, একটি দেশকে খুব সহজেই পরিচয় করিয়ে দিতে পারে বিশ্বের অন্যান্য দেশ ও মানুষের সঙ্গে। যেমন কুরাসাও, কেপভার্দে নামে দেশ আছে অনেকেই জানতেন না। 

বিশ্বকাপ ফুটবলের কল্যাণে এসব দেশ সারা বিশ্বের কাছে অতি সহজেই পরিচিত হয়ে উঠেছে। বিশ্বকাপ ফুটবল সারা বিশ্বের একটি সাংস্কৃতিক বিপ্লব ঘটিয়েছে। এই আসরের মাধ্যমে নিজ নিজ দেশের সভ্যতা ও সংস্কৃতি তুলে ধরে দেশগুলো। পৃথিবীর বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি, পোশাক, সংগীত এবং ঐতিহ্য নিয়ে বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ করে। ফলে এটি কেবল ফুটবলের আসর নয়, বরং মানবসভ্যতার সাংস্কৃতিক প্রদর্শনীও বটে। বিশ্বকাপের সময় আমরা দেখি- আফ্রিকার ঢাক, লাতিন আমেরিকার সাম্বা, ইউরোপের সংস্কৃতি, আরব বিশ্বের আতিথেয়তা সবকিছু একসঙ্গে মিশে যায়। পৃথিবীর আর কোনো অনুষ্ঠান এত বৈচিত্র্যময় সাংস্কৃতিক সহাবস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে না।

মনমাতানো এই ফুটবল আসর বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় দর্শন সম্ভবত ‘ফেয়ার প্লে’ বা ন্যায্য প্রতিযোগিতা। মাঠে সবাই সমান। বড় দেশ, ছোট দেশ, ধনী দেশ, গরিব দেশ- সবাই একই নিয়মে খেলে। শক্তিশালী দলও হারতে পারে, দুর্বল দলও জিততে পারে। এই নীতিই আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হতে পারে। বিশ্বকাপের রেফারিং থেকে নিরপেক্ষ তার শিক্ষা নেওয়া যায়।

বিশ্বকাপ আমাদের আরও একটি শিক্ষা দেয়- জাতীয় গৌরব এবং আন্তর্জাতিক বন্ধুত্ব একে অন্যের পরিপন্থী নয়। একজন মানুষ একই সঙ্গে নিজের দেশকে ভালোবাসতে পারে এবং অন্য দেশের সংস্কৃতিকে সম্মান করতে পারে। প্রকৃত দেশপ্রেম কখনো বিদ্বেষ শেখায় না; বরং আত্মমর্যাদা ও পারস্পরিক সম্মান শেখায়। যদি বিশ্বরাজনীতি ফুটবলের কাছ থেকে একটি শিক্ষা গ্রহণ করতে চায়, তবে সেটি হবে- প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকুক কিন্তু শত্রুতা নয়; প্রতিযোগিতা থাকুক কিন্তু ধ্বংস নয়; মতপার্থক্য থাকুক কিন্তু সহিংসতা নয়। মাঠে যেমন নিয়ম, সম্মান এবং পারস্পরিক স্বীকৃতির মাধ্যমে খেলা পরিচালিত হয়, তেমনি আন্তর্জাতিক সম্পর্কও যদি পরিচালিত হতো, তা হলে পৃথিবী আরও শান্তিপূর্ণ হতে পারত।

বিশ্বকাপ ফুটবলকে শুধু একটি ক্রীড়া প্রতিযোগিতা বলা নয়, এটি মানবসভ্যতার এক মহোৎসব, বিশ্ব সম্প্রীতির এক জীবন্ত উদাহরণ এবং শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের এক অনন্য পাঠশালা, নান্দনিক সংস্কৃতি প্রদর্শনের এক বিরাট মঞ্চ। বিশ্বকাপের প্রকৃত তাৎপর্য ট্রফি জয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর প্রকৃত মহত্ত্ব নিহিত রয়েছে পৃথিবীর মানুষকে একত্রিত করার ক্ষমতার মধ্যে।
 
বিশ্বকাপ ফুটবল হয়ে উঠুক আরও বেশি মানবিকতা ও সংস্কৃতির অপূর্ব মেলবন্ধনের অপার ক্ষেত্র। বিশ্বকাপ ফুটবল একদিকে শৃঙ্খলা শিক্ষা দেয় অন্যদিকে পরিশ্রম ও চেষ্টার মাধ্যমে বিশ্বজয়ের সম্ভাবনার নতুন দুয়ার খুলে দেয়। ব্যস্ততার বিশ্বে পরিবারকে সময় দিতে যখন আমরা সচেতন নই সেখানে বিশ্বকাপ ফুটবল পরিবার কিংবা পাড়ার সবাই মিলে খেলা উপভোগের মাধ্যমে পারিবারিক বন্ধনকে সুদৃঢ় করতে অভূতপূর্ব ভূমিকা রাখছে।

লেখক : কবি ও প্রাবন্ধিক
মতামত লেখকের নিজস্ব

সময়ের আলো/এসএকে


  বিষয়:   উৎসব  বিভেদ  উল্লাসে মাতে  বিশ্ব  সময়ের আলো 


Loading...
Loading...
মতামত- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: