বাংলাদেশ একটি বন্যাপ্রবণ অঞ্চল। প্রতি বছর ছোট-বড় অসংখ্য বন্যা দেখা যায়। যার ফলে জনগণের ওপর নেমে আসে দুর্ভোগ। বিশেষ করে শহরাঞ্চলে একটু বৃষ্টি হলেই সৃষ্টি হয় জলাবদ্ধতা। এর ফলে যেমন স্বাভাবিক জীবনযাপন ব্যাহত হয়, তেমনি অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতি হয় লক্ষ-কোটি টাকা। জনগণের এই দুর্ভোগ থেকে বাঁচার উপায় কি? বন্যা, অতিবৃষ্টির ফলেই সৃষ্ট প্রাকৃতিক দুর্যোগ। এর থেকে সরাসরি মুক্ত হওয়ার কোনো উপায় নেই। কিন্তু প্রয়োজনীয় ও গঠনমূলক পদক্ষেপ নিতে পারলে এর ক্ষতি থেকে রক্ষা পাওয়া এবং জনগণের দুর্ভোগ কমানো সম্ভব। কিন্তু জনগণের দুর্ভোগ কমানোর কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ চোখে পড়ে না। বরং বন্যা হলেই দেখা যায় রাজনৈতিক দলের নেতারা বা বিভিন্ন সামাজিক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ত্রাণ নিয়ে যায়। এরপর ভিডিও হয়, নিউজ হয়, অনলাইনে মাধ্যমে প্রচার হয়। তবে এটি কখনো সমাধান হতে পারে না। মানুষের প্রয়োজন দীর্ঘস্থায়ী সমাধান।
বলা হয়ে থাকে বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। কিন্তু বর্তমান দেশের নদীগুলোর দিকে তাকালে এর নির্মম বাস্তবতা চোখে পড়ে। দেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। যার জন্য অপরিকল্পিত নগরায়ণ, কলকারখানা, ফ্যাক্টরি তৈরি হচ্ছে। ফলে প্রতিনিয়ত নদী, খাল-বিল ভরাট হয়ে হচ্ছে। এ ছাড়া শহরের এসব কলকারখানা থেকে প্রতিনিয়ত বর্জ্য পদার্থ, ময়লা বিভিন্ন খাল বা নদীতে ফেলে দেওয়া হচ্ছে। ফলে নদী, খাল ভরাট হচ্ছে। হারিয়ে ফেলছে নিজস্বতা। আবার বনাঞ্চল ধ্বংস করা হচ্ছে। তথ্য অনুযায়ী একসময় ঢাকা শহরেই ৬৫ থেকে ৭৭টি ছোট-বড় খাল ছিল। স্বাধীনতার পরেও ৫৮টির বেশি খাল ছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় হলেও সত্য যে, বর্তমান ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের অধীনে ২৬টি খাল সচল করার চেষ্টা চলছে। ঠিক একইভাবে চট্টগ্রামের দিকে তাকালেও একই চিত্র চোখে পড়ে। একসময় চট্টগ্রাম শহরে ১১৮টি খাল ছিল। যার অধিকাংশরই এখন অস্তিত্ব হারিয়ে বিলীন হয়ে গেছে।
দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো দুর্যোগের দেশে দুর্বল পূর্বাভাস। প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষতি থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য দুর্যোগের পূর্বাভাস খুবই প্রয়োজনীয়। বিশ্বে জলবায়ু পরিবর্তন হচ্ছে। যার ফলে প্রাকৃতিক দুর্যোগ যেমন- ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, জলোচ্ছ্বাসসহ বিভিন্ন দুর্যোগের ঝুঁকি বেড়েই চলছে। অথচ আবহাওয়া অধিদফতরের কোনো পদক্ষেপ নেই। নেই নিজস্ব কোনো স্যাটেলাইট। নির্ভর করতে হচ্ছে জাপান, কোরিয়া, চীন ও ভারতের কাছে। এ ছাড়া নেই সুপার কম্পিউটারের মতো উন্নত প্রযুক্তির সুবিধা। নেই ডেটা বিশ্লেষণের দক্ষ জনবল। সেন্সরগুলোও অকার্যকর। এ ছাড়া দেশের আবহাওয়া অধিদফতরের পাঁচটি রাডারের মধ্যে সচল আছে মাত্র একটি। কক্সবাজার, খেপুপাড়া ও মৌলভীবাজারের রাডার দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ। সম্প্রতি ঢাকার রাডারও অচল হয়ে আছে। শুধু রংপুরের রাডাল সচল। এরপরেও নেই কোনো পদক্ষেপ। অথচ দুর্যোগের পূর্বাভাসের জন্য রাডারের খুবই প্রয়োজন। কেননা মেঘের অবস্থান, বৃষ্টিপাতের তীব্রতা, মেঘের চলাচল, বায়ুপ্রবাহের গতিবিধি পর্যবেক্ষণের জন্য রাডার খুবই প্রয়োজন।
অতিবৃষ্টির কারণে শহরাঞ্চলে যে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয় এর থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। প্রথমত সমন্বিত পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে। বিচ্ছিন্নভাবে প্রকল্প গ্রহণ না করে পুরো ড্রেনেজ নেটওয়ার্ক, খাল এবং নদীগুলোর একটি সমন্বিত মহাপরিকল্পনার আওতায় এনে বাস্তবায়ন করতে হবে। আধুনিক ড্রেনেজ ব্যবস্থার পাশাপাশি খাল, পুকুর ও জলাশয়গুলো পুনরুদ্ধার করতে হবে যাতে অতিরিক্ত বৃষ্টির পানি শোষণ বা ধরে রাখতে পারে। শহরাঞ্চলের খালগুলো বিভিন্ন বর্জ্য পদার্থ দিয়ে ভরাট। এগুলো পরিষ্কার করতে হবে। কংক্রিটের ড্রেনের পরিবর্তে এমন ব্যবস্থা করা দরকার যাতে পানি সরাসরি মাটিতে যেতে পারে। দ্বিতীয়ত ড্রেনের সক্ষমতা বৃদ্ধি ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা করা। শহরের ড্রেনেজ ব্যবস্থার ধারণক্ষমতা বৃষ্টির পরিমাণের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। এ ছাড়া কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থার উন্নয়ন করা জরুরি যাতে ময়লা জমে ড্রেন ও খাল বন্ধ না হয়ে যায়।
তৃতীয়ত অপরিকল্পিত নগরায়ণ বন্ধ করতে হবে। যা করতে হবে সবকিছুই পরিকল্পনার মধ্য দিয়ে করতে হবে। শহরের জলাশয় ও সবুজ এলাকা সংরক্ষণ করতে হবে। চতুর্থত পরিবেশ রক্ষার জন্য বনায়ন করতে হবে। আমাদের দেশে প্রতিনিয়ত বনায়ন ধ্বংস করা হচ্ছে। ধ্বংস থেকে বনায়ন রক্ষা করতে হবে।
এ ছাড়া বন্যা থেকে রক্ষার জন্য আগাম সতর্কসংকেত জানানোর ব্যবস্থা করতে হবে। যেকোনো দুর্যোগের পূর্বাভাস অত্যন্ত জরুরি।
যথাসময়ে জনগণকে আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। তা হলে অন্তত দেশের মানুষ কিছুটা হলেও ক্ষতি থেকে বাঁচতে পারবে। যেসব অঞ্চলে প্রতিনিয়ত বন্যা হয়, সে অঞ্চলগুলো চিহ্নিত করে বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। সম্প্রতি বন্যায় ৭ জেলায় ৫৯টি উপজেলা প্লাবিত। পানিবন্দি ২ লাখ ৬৭ হাজার ৯১৮টি পরিবার। সবশেষ তথ্যমতে, মন্ত্রণালয়ের হিসাবে বন্যা, পাহাড়ি ঢল ও পাহাড়ধসে মৃতের সংখ্যা ৫৬। কক্সবাজারেই ৩১ জনের মৃত্যু হয়েছে। চট্টগ্রামে ১৫ জন, বান্দরবানে ৬, রাঙামাটিতে ৩ ও মৌলভীবাজারে ১ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়। যদি যথাসময়ে জনগণকে সতর্ক করে আশ্রয়কেন্দ্রে বা নিরাপদ স্থানে নেওয়ার ব্যবস্থা করা হতো তা হলে ক্ষতির পরিমাণ অনেকটাই কম হতো। এ ছাড়া এবার দেখা গেছে মানুষের কবর বিলীন হয়ে লাশ ভেসে যাচ্ছে। এটি কোনোভাবেই মেনে নেওয়ার মতো বিষয় নয়। তারপরও মেনে নেওয়া লাগছে। এর থেকে উত্তরণের জন্য সরকারের যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। বিশেষ করে আবহাওয়া অধিদফতরের। আমাদের দেশে বন্যার দুর্ভোগ প্রতি বছরই দেখা দেয় তাই এর জন্য প্রয়োজন স্থায়ী সমাধান। ত্রাণ ও সাময়িক উদ্ধারকাজের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে একটি দীর্ঘস্থায়ী ও সুদূরপ্রসারী মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করা অপরিহার্য। কেননা বন্যা বা জলাবদ্ধতা কেবল একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, এটি আমাদের সামগ্রিক পরিকল্পনা ও দূরদর্শিতার অভাবেরই বহিঃপ্রকাশ। জলবায়ু পরিবর্তনের এই যুগে চরম ভাবাপন্ন আবহাওয়া বৈরী হওয়া স্বাভাবিক। তাই প্রতি বছর লক্ষ-কোটি টাকার ত্রাণ বিলিয়ে সাময়িক সান্ত্বনা খোঁজার চেয়ে সেই অর্থ স্থায়ী অবকাঠামো, নদী খনন ও পরিবেশ রক্ষায় বিনিয়োগ করা অনেক বেশি বুদ্ধিমানের কাজ। সরকারের নীতিনির্ধারক, নগর পরিকল্পনাবিদ এবং সাধারণ নাগরিক সবার সম্মিলিত ও দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগই পারে আমাদের এই জলমগ্নতার অভিশাপ থেকে মুক্তি দিতে।
লেখক : শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া
সময়ের আলো/জেডআই