হিন্দু তথা সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস অনুযায়ী জগন্নাথ হলেন জগতের নাথ বা জগতের ঈশ্বর। যিনি জগতের ঈশ্বর তার অনুগ্রহ ও কৃপা লাভ করলে মানুষের মুক্তিলাভ হবে এটা সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস। এই বিশ্বাস থেকেই তারা জগন্নাথ দেবের মূর্তি নিয়ে রথযাত্রার আয়োজন করে। রথটানা, হরিনাম সংকীর্তন, বিশ্বশান্তি কামনায় অগ্নিহোত্র যজ্ঞ, মহাপ্রসাদ বিতরণ, আলোচনা সভা, পদাবলি কীর্তন ও গিতা পাঠের মাধ্যমে বাংলাদেশে এই উৎসব উদযাপিত হয়।
রথযাত্রা উপলক্ষে বিভিন্ন স্থানে মেলার আয়োজন করা হয়। সনাতন ধর্মাবলম্বী তথা হিন্দু সম্প্রদায়ের অন্যতম একটি বিখ্যাত ধর্মীয় উৎসব হচ্ছে জগন্নাথ দেবের রথযাত্রা উৎসব। প্রতি বছর আষাঢ় মাসের শুক্লপক্ষের দ্বিতীয়া তিথিতে আয়োজিত হয় এ উৎসব। এ উৎসবের কেন্দ্রস্থল হচ্ছে উড়িষ্যা বা ওড়িশা রাজ্যের পুরীতে অবস্থিত জগন্নাথ দেবের প্রধান মন্দির। এ উৎসব ভারত, বাংলাদেশ ছাড়াও বিশ্বের অনেক দেশে উদযাপিত হয়ে আসছে।
রথযাত্রা হচ্ছে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের দেবতা জগন্নাথ, বলরাম ও শুভদ্রার তিনটি সুসজ্জিত মূর্তি রথে চেপে পুরীর জগন্নাথ দেবের মন্দির থেকে মাসির বাড়িতে গুণ্ডিচা যাত্রাকে বোঝায়। রথযাত্রার সময় পুরীর জগন্নাথ মন্দির থেকে প্রায় ৩ কিমি দূরে অবস্থিত গুণ্ডিচা মন্দিরে জগন্নাথ দেব, বলভদ্র ও সুভদ্রার গমন ও সেখানে সাত দিন অবস্থানই ‘গুণ্ডিচা যাত্রা’। গুণ্ডিচাকে জগন্নাথের মাসি এবং তার মন্দিরকে মাসির বাড়ি হিসেবে গণ্য করা হয়, যেখানে ভক্তরা নবমী পর্যন্ত দেবতার দর্শন পান। পুরীর জগন্নাথ দেবের রথযাত্রা উদ্বোধন করেন সেখানকার রাজা। রাজত্ব না থাকলেও বংশ পরম্পরায় পুরীর রাজপরিবার আজও আছে। রাজপরিবারের আছেন উপাধিপ্রাপ্ত রাজা।
পুরীর জগন্নাথ দেবের রথযাত্রা অনুসরণে বাংলায় রথযাত্রার সূচনা হয়। চৈতন্য মহাপ্রভু নীলাচল থেকে এই ধারাটি বাংলাদেশে নিয়ে আসেন। চৈতন্য ভক্ত বৈষ্ণবরা বাংলায় পুরীর আদলে রথযাত্রার প্রচলন করেন।
রথযাত্রার মাহাত্ম্য সম্পর্কে শাস্ত্রে আছে- ‘রথস্থ বামনং দৃষ্টা পুনর্জন্ম ন বিদ্যতে’। অর্থাৎ রথের ওপর অধিষ্ঠিত বামন জগন্নাথ দেবকে দর্শন করলে তার পুনর্জন্ম হয় না।
বাংলাদেশে সবচেয়ে প্রাচীন ও বৃহত্তম রথযাত্রা উৎসব হলো ঢাকার ধামরাইয়ের রথযাত্রা। বাংলাদেশে অনেক আগে থেকেই রথযাত্রা উৎসব উদযাপিত হয়ে আসছে। এ উপলক্ষে ঢাকা, ধামরাই, খুলনা, বরিশাল, গোপালগঞ্জ, সিলেট, কুমিল্লা, চট্টগ্রাম, গাজীপুর, নাটোরসহ সারা দেশে রথযাত্রা ও বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। ধামরাই অঞ্চলের যশোমাধবের রথযাত্রা বাংলাদেশে খুবই বিখ্যাত।
উল্লেখ্য, ধামরাইয়ের যশোমাধব মন্দিরে উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে সাটুরিয়া বালিয়াটির জমিদাররা ৬০ ফুট উঁচু যে রথ নির্মাণ করেছিলেন একাত্তরের যুদ্ধের সময় হানাদার বাহিনী তা পুড়িয়ে দেয়। ত্রিতলবিশিষ্ট রথটি টানতে ২৭ মণ ধনের দড়ি ব্যবহার করা হতো। রথযাত্রা উপলক্ষে সেখানে মাসব্যাপী মেলা হতো। এখানে প্রথমে ছিল বাঁশের রথ। সর্বশেষ ২০০৬ সালে ভারত সরকারের অনুদানের মাধ্যমে ৩৭ ফুট উঁচু ও ২০ ফুট প্রস্থ কারুকাজ করা রথ তৈরি করা হয়। লোহার খাঁচার ওপর সেগুন ও চাম্বল কাঠ খোদাই করে তৈরি করা হয় কারুকাজ করা রথ। এতে ১৫টি চাকা, কাঠের তৈরি দুটি ঘোড়া ও সারথি আছে।
নাটোরের নলডাঙ্গার মধ্যনগরে দেশের রথযাত্রা ১৫০ বছরের পুরোনো। এখানে দেশের একমাত্র ১২ চাকাবিশিষ্ট পিতলের তৈরি রথে রযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়। ১৩টি মূল গেট ও ১১২টি পিলারের সাহায্যে তৈরি দেশের সবচেয়ে বড় পিতলের তৈরি রথ এটি। ১৮০০ সাল থেকে পাহাড় আর সমুদ্রঘেরা শহর চট্টগ্রামে শুরু হয় রথযাত্রা উৎসব। চট্টগ্রামের নন্দন কাননে পাহাড়ঘেরা তুলসীদামে শ্রীশ্রী মদন মোহন নরসিংহ গোপাল জিউর মন্দিরে জগন্নাথ দেব, বলরাম ও সুভদ্রার নিত্য পূজা হয়। তুলসীদামে যে পুকুরপাড়ে রথ রেখে স্নান করা হতো সে পুকুরের নাম ছিল রথের পুকুর। বর্তমানে সে পুকুরে উঠেছে বহুতল ভবন।
সিলেটে আন্তর্জাতিক কৃষ্ণ ভাবনামৃত সংঘ ইসকন আয়োজিত রথযাত্রা উৎসবে হাজার হাজার মানুষ সমবেত হয় রিকাবিবাজার ঐতিহ্যবাহী রথযাত্রা প্রাঙ্গণে। এ ছাড়া গাজীপুরের মানিক্য সাধকের রথযাত্রা, কুমিল্লার মহারাজ বাহাদুরের রথযাত্রা, যশোরের বারইখানি, রংপুরের আদিতমারীর কামারপাড়ার রথযাত্রা উল্লেখযোগ্য। এ ছাড়া সারা দেশেই এ রথযাত্রার আয়োজন করে থাকে সনাতন ধর্মাবলম্বীরা।
লেখক : কবি ও প্রাবন্ধিক
সময়ের আলো/জেডআই