জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর পার হলো। শহিদদের প্রকৃত সংখ্যা নিয়ে এখনও বিভ্রান্তি কাটল না। সরকারি গেজেট, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিবেদন এবং রাজনৈতিক দলগুলোর হিসাবের মধ্যে বড় ধরনের অসামঞ্জস্য রয়েছে।
শহিদদের প্রকৃত সংখ্যা জানতে ও সঠিক তালিকা করতে আর কত অপেক্ষা করতে হবে সেই প্রশ্ন উঠেছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহিদদের তালিকায় এ পর্যন্ত সরকারি গেজেটে ৮৬৫ জনের নাম অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। তবে সরকার অনুমোদিত জুলাই শহিদ স্মৃতি ফাউন্ডেশনের ওয়েবসাইটে শহিদের সংখ্যা উল্লেখ করা হয়েছে ৮২০-এর বেশি।
জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের দফতরের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে ১৫ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত আন্দোলন-সংশ্লিষ্ট সহিংসতায় প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষের মৃত্যুর কথা বলা হয়েছে। জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সনদে বলা হয়েছে, নিহতের সংখ্যা ছিল ‘সহস্রাধিক’। জুলাইয়ে শহিদ অনেককে গণকবর দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করা হয়েছে অনেক মরদেহ। নদীতে মরদেহ ফেলে দেওয়ার অভিযোগও সামনে এসেছে।
জুলাই অভ্যুত্থানের সময় হাসপাতাল ও মর্গেও অনেক নথিই ছিল অসম্পূর্ণ। নিখোঁজ অনেক ব্যক্তির পরিচয় শনাক্ত করা যায়নি। এসব কারণে শহিদদের সংখ্যা নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে অভিযোগ উঠেছে, আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন না এমন কিছু ব্যক্তির নাম শহিদের তালিকায় স্থান পেয়েছে। আবার প্রকৃত শহিদদের কেউ কেউ বাদ পড়েছেন। এক অনুসন্ধানে অন্তত ৫২ জনের তালিকাভুক্তি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় বিষয়টি যাচাই করে দেখছে।
জুলাই শহিদদের তালিকা বিতর্কমুক্ত হওয়া দরকার। তালিকায় ভুল থাকলে প্রকৃত শহিদদের প্রতি অবিচার করা হবে। ‘ভুয়া শহিদ’ অন্তর্ভুক্ত করা হলে বা কোনো কারণে তালিকায় রয়ে গেলে শহিদদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নের মুখে পড়বে। শহিদদের সঠিক তালিকা করা কেবল পরিসংখ্যানের নির্ভুলতার জন্যই জরুরি নয়। সঠিক ইতিহাস রচনার প্রশ্নও এর সঙ্গে যুক্ত। কাজেই সঠিক তালিকা করতে নির্ভরযোগ্য, গবেষণাভিত্তিক ও বহুমাত্রিক যাচাইব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
জুলাই অভ্যুত্থানের মতো ব্যাপক ও বিস্তৃত ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তথ্য নির্ভুল আকারে সংগ্রহ করা সহজ নয়। অনেক হত্যাকাণ্ড ও নিখোঁজ ব্যক্তি সম্পর্কে নিশ্চিত হতে হয়তো আরও সময় লাগতে পারে। তবে প্রশাসনিক সমন্বয়ের ঘাটতির কারণে যদি তথ্যের অসংগতি ঘটে থাকে তাহলে সেটা জনগণের কাছে ভুল বার্তা যাবে।
এখন প্রয়োজন একটি সমন্বিত রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা, স্বাস্থ্য বিভাগ, স্থানীয় প্রশাসন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এবং ফরেনসিক বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি স্বাধীন যাচাই কাঠামো তৈরি করা গেলে শহিদের তালিকাকে বিতর্কমুক্ত করার কাজ গতি পেতে পারে। ডিএনএ শনাক্তকরণ, ডিজিটাল তথ্যভান্ডার, উন্মুক্ত আপত্তি ও সংশোধন প্রক্রিয়া এবং নিয়মিত অগ্রগতি প্রকাশের ব্যবস্থা থাকতে হবে। শহিদদের সংখ্যা নিয়ে বিতর্ক দীর্ঘায়িত হওয়া কাম্য নয়। সত্যকে প্রতিষ্ঠা করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
জুলাই অভ্যুত্থানকে কেন্দ্র করে হওয়া মামলার বিচারপ্রক্রিয়ার ধীরগতি উদ্বেগজনক। জুলাই-পরবর্তী সময়ে মামলা হয়েছে ১ হাজার ৮৫৫টি। তদন্ত শেষ হয়েছে ১৫৮টির। হত্যা মামলার চার্জশিট দেওয়া হয়েছে ৪৮টিতে। ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে দ্রুত ও সুষ্ঠু তদন্ত করা জরুরি। বিচারের গ্রহণযোগ্যতা যেন প্রশ্নবিদ্ধ না হয় সে বিষয়ে সজাগ থাকতে হবে।
সময়ের আলো/আআ