স্বাস্থ্য খাতের বাজেট দ্বিগুণ, সেবা মিলবে কতটা

ডা. সমীর কুমার সাহা

মতামত

স্বাস্থ্য খাতে এবার বরাদ্দ প্রায় দ্বিগুণ। দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দ জিডিপির ১ শতাংশের সীমা পেরিয়ে ১.১ শতাংশে

2026-07-18T04:34:18+00:00
2026-07-18T04:34:18+00:00
 
  শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬,
৩ শ্রাবণ ১৪৩৩
শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬
মতামত
স্বাস্থ্য খাতের বাজেট দ্বিগুণ, সেবা মিলবে কতটা
ডা. সমীর কুমার সাহা
প্রকাশ: শনিবার, ১৮ জুলাই, ২০২৬, ৪:৩৪ এএম 
গ্রাফিক : সময়ের আলো
স্বাস্থ্য খাতে এবার বরাদ্দ প্রায় দ্বিগুণ। দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দ জিডিপির ১ শতাংশের সীমা পেরিয়ে ১.১ শতাংশে পৌঁছেছে। সংখ্যার বিচারে এ এক অভূতপূর্ব অগ্রগতি। কিন্তু বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের ইতিহাস বলে, কেবল বরাদ্দ বাড়লেই সেবার মান বাড়ে না। প্রশ্ন তাই থেকেই যায়Ñ এই বরাদ্দ কি প্রকৃত অর্থে জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছাবে?

টেকসই উন্নয়ন ও সমৃদ্ধ দেশ বিনির্মাণের অন্যতম পূর্বশর্ত হলো একটি সুস্থ জাতি গঠন করা। বর্তমানে দেশজুড়ে হাসপাতালগুলো অতিরিক্ত রোগীর চাপের কারণে হিমশিম খাচ্ছে। অনেক মানুষ মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। একই সঙ্গে, বিদেশে চিকিৎসা নেওয়ার ক্রমবর্ধমান প্রবণতার কারণে দেশের মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা বাইরে চলে যাচ্ছে।

স্বাস্থ্য খাতে সরকারের নীতিগত অগ্রাধিকারগুলোর মধ্যে রয়েছে সর্বজনীন ও সমতাভিত্তিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা, চিকিৎসাকেন্দ্রিক ব্যবস্থা থেকে প্রতিরোধকেন্দ্রিক ব্যবস্থায় রূপান্তর, গ্রামীণ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়া, মা ও শিশু স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও টিকাদান কর্মসূচি জোরদার করা এবং স্বাস্থ্য প্রযুক্তি ও চিকিৎসা শিল্পের উন্নয়ন সাধন করা।

২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য স্বাস্থ্য খাতে ৬৯,৪০৯ কোটি টাকার বাজেট বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে, যা দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১.০১ শতাংশ। এর আগে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দ ছিল ৩৫,৪৭৭ কোটি টাকা, যা ছিল জিডিপির ০.৫৮ শতাংশ।

বর্তমানে বাংলাদেশে মোট মৃত্যুর ৭১ শতাংশই ঘটে বিভিন্ন অসংক্রামক রোগের কারণে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ‘হেলথ অ্যান্ড মরবিডিটি স্ট্যাটাস সার্ভে-২০২৫’ অনুসারে, দেশের শীর্ষ ১০টি রোগের মধ্যে উচ্চ রক্তচাপ প্রথম স্থানে রয়েছে। এটি হৃদরোগ, স্ট্রোক এবং কিডনি রোগের মতো মারাত্মক অসংক্রামক রোগের অন্যতম প্রধান কারণ।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২৫ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০২৪ সালে বাংলাদেশে ২,৮৩,৮০০ জন মানুষ হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে। এই মৃত্যুর ৫২ শতাংশেরই মূল কারণ ছিল উচ্চ রক্তচাপ। 

বিশেষ করে, তৃণমূল পর্যায়ের সব স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়মিত ও বিনামূল্যে রক্তচাপের ওষুধ সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারলে দেশের অসংক্রামক রোগের প্রাদুর্ভাব এবং অকাল মৃত্যুর হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব।

আমাদের স্বাস্থ্য খাতের চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলার জন্য বিকল্প চিকিৎসাব্যবস্থার প্রসার অত্যন্ত জরুরি। এই চিকিৎসা পদ্ধতিগুলো সাধারণত সহজলভ্য ও সাশ্রয়ী এবং এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও তুলনামূলকভাবে কম। বহু বছর ধরে বাংলাদেশের বিভিন্ন সামাজিক ও পেশাগত স্তরের মানুষ ইউনানি, আয়ুর্বেদিক এবং হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা গ্রহণ করে আসছে। আমাদের পূর্বপুরুষরাও বিকল্প চিকিৎসাব্যবস্থার মাধ্যমেই সেবা পেতেন। 

ওষুধের পাশাপাশি বিকল্প চিকিৎসার মধ্যে কাপিং থেরাপি (হিজামা), আকুপ্রেশার, আকুপাংচার, লিচ থেরাপি (জোক থেরাপি), যোগব্যায়াম, ধ্যান, রেজিমেন্টাল থেরাপি, ঔষধি খাবার এবং জীবনযাত্রার পরিবর্তনও অন্তর্ভুক্ত, যা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে স্থানীয়ভাবে ব্যবহৃত হয়।

এই চিকিৎসা পদ্ধতিগুলো বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কর্তৃকও স্বীকৃত। সংস্থার মতে, বিশ্বের প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ বিকল্প চিকিৎসা ব্যবস্থার মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবা পেয়ে থাকে।

বিকল্প স্বাস্থ্যসেবা পদ্ধতি সম্পূর্ণ বৈজ্ঞানিক এবং এটি মানবদেহের মৌলিক উপাদানগুলোর ওপর ভিত্তি করে রোগ নির্ণয় করে, যা আধুনিক বিজ্ঞানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। বাংলাদেশে বিকল্প চিকিৎসা ব্যবস্থার প্রয়োজনীয় গবেষণা ও প্রচারের অভাবে এটি নিয়ে সাধারণ মানুষের সচেতনতা ও জ্ঞান এখনও সীমিত। স্বাস্থ্য অধিদফতরের অল্টারনেটিভ মেডিকেল কেয়ার উইংয়ের অধীনে পরিচালিত এক জরিপে দেখা গেছে, বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা হাসপাতালে ২৬ শতাংশ রোগী এই পদ্ধতিগুলোর মাধ্যমে চিকিৎসাসেবা নিচ্ছে।

ভারত, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, কোরিয়া, চীন ও থাইল্যান্ডের মতো দেশে বিকল্প চিকিৎসার জন্য আলাদা মন্ত্রণালয়, অধিদফতর, বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা কাউন্সিল এবং বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের (বিএমডিসি) মতো রেগুলেটরি কাউন্সিল রয়েছে। সেসব দেশে উচ্চশিক্ষা, গবেষণা, সরকারি চাকরি এবং অল্টারনেটিভ মেডিকেল কেয়ার চিকিৎসকদের ক্যারিয়ার গড়ার সুযোগ থাকার কারণে বিকল্প চিকিৎসাব্যবস্থা ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করেছে।

তবে আমাদের দেশে এ ক্ষেত্রে বেশ কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এখানে অল্টারনেটিভ মেডিকেল কেয়ারে উচ্চশিক্ষার কোনো সুযোগ নেই। গবেষণা কার্যক্রমও অত্যন্ত সীমিত। তা ছাড়া, এই খাত থেকে পাস করা চিকিৎসকদের সরকারি চাকরিতে প্রবেশের সুযোগ খুবই কম। দীর্ঘ প্রায় ৩০ বছর ধরে দুটি সরকারি কলেজ ও হাসপাতাল এবং জেলা সদর হাসপাতালগুলোতে কর্মরত শিক্ষক ও চিকিৎসকরা প্রভাষক এবং মেডিকেল অফিসার হিসেবে চাকরিতে প্রবেশ করছেন। কিন্তু পদোন্নতির সুযোগ না থাকায় তারা একই পদে থেকেই অবসরে যান।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী দেশে প্রতি ২,৮৯৪ জন মানুষের জন্য মাত্র একজন নিবন্ধিত চিকিৎসক এবং প্রতি ১,৬৯৮ জন মানুষের জন্য সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে মাত্র একটি শয্যা (বেড) রয়েছে। বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের অবকাঠামো সরকারি খাতের চেয়ে বেসরকারি খাতে বেশি। বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা অত্যন্ত ব্যয়বহুল হওয়ায় তা সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরেই থেকে যায়। স্বাস্থ্য খাতে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে বাংলাদেশকে বিকল্প চিকিৎসা ব্যবস্থার ওপর আরও বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।

নীতিমালা প্রণয়ন, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা, ওষুধের গুণগত মান নিয়ন্ত্রণ এবং সরকারি হাসপাতালে বিকল্প স্বাস্থ্যসেবা চালুর মাধ্যমে বাংলাদেশ সরকার আয়ুর্বেদিক ও ইউনানি চিকিৎসার উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। সরকারের প্রধান দায়িত্বগুলোর মধ্যে রয়েছে আধুনিক ও যুগোপযোগী নীতিমালা তৈরি, মানসম্মত শিক্ষার সম্প্রসারণ, গবেষণায় সরকারি অর্থায়ন বৃদ্ধি এবং ঔষধি উদ্ভিদের সংরক্ষণ 

করা। সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় নিরাপদ ও সাশ্রয়ী স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে এই ঐতিহ্যবাহী খাতের অপার সম্ভাবনা রয়েছে।

লেখক : জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও সাবেক নির্বাহী পরিচালক, পাবলিক হেলথ ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ
মতামত লেখকের নিজস্ব

সময়ের আলো/এসএকে


  বিষয়:   স্বাস্থ্য খাত  বাজেট  দ্বিগুণ  সেবা মিলবে  সময়ের আলো 


Loading...
Loading...
মতামত- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: