গ্রাম সরকার ও গ্রামীণ উন্নয়ন মডেল

রফিকুল ইসলাম তালুকদার

মতামত

স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশে প্রশাসনিক কাঠামো ছিল মূলত ঔপনিবেশিক ও পাকিস্তান আমলের ধারাবাহিকতা ওপর থেকে নিচে নিয়ন্ত্রিত একটি ব্যবস্থা, যেখানে গ্রামীণ জনগণের

2026-07-18T04:43:57+00:00
2026-07-18T04:43:57+00:00
 
  শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬,
৩ শ্রাবণ ১৪৩৩
শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬
মতামত
গ্রাম সরকার ও গ্রামীণ উন্নয়ন মডেল
রফিকুল ইসলাম তালুকদার
প্রকাশ: শনিবার, ১৮ জুলাই, ২০২৬, ৪:৪৩ এএম 
গ্রাফিক : সময়ের আলো
স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশে প্রশাসনিক কাঠামো ছিল মূলত ঔপনিবেশিক ও পাকিস্তান আমলের ধারাবাহিকতা ওপর থেকে নিচে নিয়ন্ত্রিত একটি ব্যবস্থা, যেখানে গ্রামীণ জনগণের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণের সুযোগ সীমিত ছিল। সত্তর দশকের মাঝামাঝি সময়ে দেশ দুর্ভিক্ষ, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং অর্থনৈতিক সংকটের মুখোমুখি হয়। ১৯৮০ সালে তৎকালীন সরকার ‘গ্রাম সরকার’ নামে একটি নতুন স্থানীয় সরকার ইউনিট প্রবর্তনের সিদ্ধান্ত নেয়।

গ্রামীণ উন্নয়নে গ্রাম সরকারের ভূমিকা ও কৃষি খাতে প্রভাব
উচ্চ ফলনশীল জাতের বীজ বিতরণ, সার সরবরাহ ব্যবস্থাপনা এবং সেচ সুবিধা সম্প্রসারণে গ্রাম পর্যায়ের ইউনিটগুলোকে সংশ্লিষ্ট করা হয়। যদিও এই প্রচেষ্টার সরাসরি পরিমাণগত ফলাফল নিয়ে গবেষকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে, তবে এটি স্বীকৃত যে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির প্রশাসনিক প্রক্রিয়াকে স্থানীয়করণের একটি সচেতন প্রয়াস এখানে লক্ষণীয় ছিল।

শিক্ষা ও সাক্ষরতা
গ্রামীণ শিক্ষা বিস্তারে গ্রাম সরকারকে সংশ্লিষ্ট করার প্রয়াস নেওয়া হয়েছিল। প্রাপ্তবয়স্ক শিক্ষা কার্যক্রম এবং সাক্ষরতা অভিযানে স্থানীয় পর্যায়ে সমন্বয়ের দায়িত্ব অনেকাংশে গ্রাম সরকারের ওপর ন্যস্ত করা হয়। তবে সম্পদের সীমাবদ্ধতা এবং প্রশিক্ষিত জনবলের অভাবে এই উদ্যোগগুলোর ফলাফল সীমিত ছিল বলে বিভিন্ন পর্যালোচনায় উঠে এসেছে।

স্বাস্থ্য ও স্যানিটেশন
গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণেও গ্রাম সরকারকে যুক্ত করার চেষ্টা হয়েছিল, বিশেষত টিকাদান কর্মসূচি, পরিবার পরিকল্পনা সচেতনতা এবং স্যানিটারি ল্যাট্রিন ব্যবহারের প্রচারে। এই কার্যক্রমগুলো মূলত কেন্দ্রীয়ভাবে পরিচালিত স্বাস্থ্য অধিদফতরের কর্মসূচির সঙ্গে সমন্বয় করে বাস্তবায়িত হতো, এবং গ্রাম সরকারের ভূমিকা ছিল মূলত স্থানীয় জনগণকে সচেতন ও সম্পৃক্ত করা।

অবকাঠামো উন্নয়ন
গ্রামীণ রাস্তাঘাট নির্মাণ, ছোট সেতু-কালভার্ট নির্মাণ এবং সরকারি স্থাপনা রক্ষণাবেক্ষণে ‘কাজের বিনিময়ে খাদ্য’ কর্মসূচির সঙ্গে গ্রাম সরকারের সম্পৃক্ততা লক্ষ করা যায়। এই কর্মসূচিগুলোর মাধ্যমে একদিকে গ্রামীণ অবকাঠামোর উন্নতি হয়, অন্যদিকে মৌসুমি বেকারত্ব হ্রাসেও কিছুটা সহায়ক ভূমিকা পালন করে।

গ্রাম সরকার ব্যবস্থার সাফল্য
গ্রাম সরকার ব্যবস্থার ইতিবাচক দিকগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- বিকেন্দ্রীকরণের ধারণার প্রবর্তন : এই ব্যবস্থা বাংলাদেশে স্থানীয় সরকার কাঠামোয় বিকেন্দ্রীকরণের একটি নতুন মাত্রা যোগ করে, যা পরবর্তী সময়ে উপজেলা ব্যবস্থাসহ অন্যান্য স্থানীয় সরকার সংস্কারের পথ প্রশস্ত করে।

জনসম্পৃক্তি বৃদ্ধি : খাল কাটা কর্মসূচির মতো উদ্যোগে ব্যাপক জনঅংশগ্রহণ ঘটানো সম্ভব হয়েছিল, যা রাষ্ট্র ও নাগরিকের মধ্যে একটি প্রত্যক্ষ সংযোগ তৈরিতে ভূমিকা রাখে।

রাজনৈতিক বার্তা : 
গ্রামমুখী উন্নয়ন-দর্শনের মাধ্যমে কৃষিভিত্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে সরকারের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানোর একটি সচেতন প্রয়াস দেখা যায়, যা সামাজিক সংহতির ক্ষেত্রে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছিল বলে অনেকে মনে করেন।

সীমাবদ্ধতা ও সমালোচনা
তবে গ্রাম সরকারব্যবস্থাকে ঘিরে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সমালোচনাও রয়েছে, যা একটি বস্তুনিষ্ঠ মূল্যায়নের জন্য উল্লেখযোগ্য-
প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তির দুর্বলতা : সমালোচকদের মতে, গ্রাম সরকারব্যবস্থা প্রকৃত অর্থে নিচ থেকে ওপরের দিকে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া না হয়ে অনেকাংশে ওপর থেকে নিচের দিকে প্রশাসনিক নির্দেশনানির্ভর একটি কাঠামো ছিল। স্বচ্ছ ও নিয়মিত নির্বাচনের পরিবর্তে স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের প্রাধান্য এই ব্যবস্থার গণতান্ত্রিক বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে।

স্বল্পস্থায়িত্ব : ব্যবস্থাটি পূর্ণাঙ্গভাবে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নেওয়ার আগেই ১৯৮১ সালে জিয়াউর রহমানের মৃত্যু ঘটে। এর ফলে গ্রাম সরকারব্যবস্থা দীর্ঘমেয়াদি ধারাবাহিকতা পায়নি এবং পরবর্তী সরকারগুলো এই কাঠামো ভিন্নভাবে পুনর্গঠন বা বাতিল করে দেয়।

সম্পদ ও ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা : গ্রাম সরকারের নিজস্ব রাজস্ব আদায়ের ক্ষমতা এবং স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের এখতিয়ার সীমিত ছিল, ফলে এটি অনেকাংশে কেন্দ্রীয় প্রশাসনের কর্মসূচি বাস্তবায়নের একটি মাধ্যম হিসেবেই কাজ করেছে, প্রকৃত স্বায়ত্তশাসিত ইউনিট হিসেবে নয়।

রাজনীতিকরণের ঝুঁকি : সমালোচকরা এই আশঙ্কাও প্রকাশ করেছেন যে, গ্রাম সরকারব্যবস্থা ক্ষমতাসীন দলের রাজনৈতিক ভিত্তি সম্প্রসারণের একটি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল, যদিও এই বিষয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে ভিন্নমত রয়েছে।

ঐতিহাসিক মূল্যায়ন ও উত্তরাধিকার
গ্রাম সরকারব্যবস্থাকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে মূল্যায়ন করার সময় দুটি দৃষ্টিভঙ্গি প্রাধান্য পায়। একদল গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক মনে করেন, এটি ছিল একটি দূরদর্শী পদক্ষেপ, যা গ্রামীণ বাংলাদেশকে উন্নয়ন প্রক্রিয়ার কেন্দ্রে নিয়ে আসার একটি আন্তরিক প্রয়াস ছিল- বিশেষত তৎকালীন প্রেক্ষাপটে, যখন গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর কণ্ঠস্বর রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় প্রায় অনুপস্থিত ছিল।

অন্যদিকে আরেকটি বিশ্লেষণধারা এই ব্যবস্থাকে মূলত একটি সামরিক সরকারের বৈধতা অর্জনের কৌশল হিসেবে দেখে, যেখানে গণতান্ত্রিক প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের চেয়ে জনপ্রিয়তা অর্জন ও রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ সংহত করার দিকটি বেশি প্রাধান্য পেয়েছিল। এই দুই দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে ভারসাম্য রেখে বলা যায় গ্রাম সরকার ব্যবস্থার ধারণাগত মূল্য এবং তাৎক্ষণিক জনসম্পৃক্তিমূলক সাফল্য যেমন অস্বীকার করা যায় না, তেমনি এর প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা এবং গণতান্ত্রিক ভিত্তির অভাবও একটি বাস্তব সীমাবদ্ধতা হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। 

পরবর্তী সময়ে এরশাদ সরকারের আমলে উপজেলা পদ্ধতি প্রবর্তন এবং তার পরবর্তী বিভিন্ন সরকারের স্থানীয় সরকার সংস্কার প্রচেষ্টায় গ্রাম সরকারের ধারণা ভিন্ন রূপে ফিরে এসেছে, যা প্রমাণ করে যে স্থানীয় পর্যায়ে জন অংশগ্রহণমূলক শাসন প্রতিষ্ঠার প্রশ্নটি বাংলাদেশের রাষ্ট্র পরিচালনার একটি স্থায়ী চ্যালেঞ্জ হিসেবে থেকে গেছে। গ্রাম সরকারব্যবস্থা বাংলাদেশের গ্রামীণ উন্নয়ন-চিন্তায় একটি উল্লেখযোগ্য পরীক্ষা-নিরীক্ষা হিসেবে ইতিহাসে স্থান পেয়েছে। এটি গ্রামীণ জনগণকে জাতীয় উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় সরাসরি সম্পৃক্ত করার একটি প্রয়াস ছিল। তবে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা, স্বল্পস্থায়িত্ব এবং গণতান্ত্রিক ভিত্তির ঘাটতির কারণে এই ব্যবস্থা দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত পরিবর্তন আনতে পুরোপুরি সক্ষম হয়নি। 

তা সত্ত্বেও, স্থানীয় সরকার বিকেন্দ্রীকরণ এবং গ্রামমুখী উন্নয়ন-দর্শনের ক্ষেত্রে এই উদ্যোগের ঐতিহাসিক গুরুত্ব অস্বীকার করা যায় না। বাংলাদেশের স্থানীয় শাসনব্যবস্থার বিবর্তনের ধারায় গ্রাম সরকার একটি গুরুত্বপূর্ণ রেফারেন্স পয়েন্ট হিসেবে গবেষক ও নীতিনির্ধারকদের কাছে আজও আলোচিত হয়ে থাকে।

লেখক : সহকারী অধ্যাপক, সরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজ, ময়মনসিংহ
মতামত লেখকের নিজস্ব

সময়ের আলো/এসএকে


  বিষয়:   গ্রাম সরকার  গ্রামীণ উন্নয়ন  মডেল  সময়ের আলো 


Loading...
Loading...
মতামত- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: