আইনশৃঙ্খলা ও সুশাসনের এক গভীর সংকটে পরিণত হয়েছে চাঁদাবাজি। চাঁদার দাবিতে চট্টগ্রামে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে প্রকাশ্য হামলা চালানো হয়েছে। বিদেশি নম্বর থেকে হোয়াটসঅ্যাপে চাঁদা দাবি করা হচ্ছে। রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় সংঘবদ্ধ চাঁদাবাজির বিস্তার ঘটেছে। চাঁদাবাজিকে এখন আর বিচ্ছিন্ন অপরাধ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
চাঁদাবাজি কেবল ব্যক্তি ব্যবসায়ী বা প্রতিষ্ঠানকেই ক্ষতিগ্রস্ত করছে না, দেশের বিনিয়োগ পরিবেশকেও ব্যাহত করছে। যার প্রভাব পড়ছে কর্মসংস্থানের ওপর। চাঁদাবাজি সামগ্রিক অর্থনীতির এক বিষফোঁড়া।
চট্টগ্রামে গত ছয় মাসে অন্তত এক ডজন সশস্ত্র হামলার ঘটনা ঘটেছে এই চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করে। পুলিশের অভ্যন্তরীণ প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাজধানীর ৪৫ থানায় সক্রিয় চাঁদাবাজ আছে প্রায় ১ হাজার ২০০। প্রশ্ন হচ্ছে, চাঁদাবাজদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দিচ্ছেন কারা?
শীর্ষ সন্ত্রাসীদের অনেকেই দীর্ঘদিন ধরে অধরা। অভিযোগ আছে, এসব শীর্ষ সন্ত্রাসী তাদের অনুসারীদের মাধ্যমে অপরাধ পরিচালনা করছে। রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয়ের অভিযোগও রয়েছে। চাঁদাবাজির ঘটনায় গণমাধ্যমে যেসব প্রতিবেদন প্রকাশিত হয় সেখানে চাঁদাবাজ হিসেবে কখনো কখনো রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের নামও থাকে। পুলিশের প্রতিবেদনেও রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি অনেক সময় উঠে আসে।
প্রযুক্তি ব্যবহার করে বিদেশে বসে কিংবা বিদেশি নম্বরের আড়ালে চাঁদা দাবি করা হয়। এ ধরনের অপরাধ শনাক্ত করতে, তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করতে প্রচলিত তদন্ত পদ্ধতি কতটা সক্ষম সেই প্রশ্ন রয়েছে। চাঁদাবাজির শিকার ব্যবসায়ীদের বড় অংশই ভয়ে থানা-পুলিশ করেন না। সাহস করে কেউ অভিযোগ বা মামলা করলেও সহজে প্রতিকার পান না। দ্রুত ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ না নেওয়া হলে আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা দুর্বল হবে।
দেশে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরও যদি চাঁদাবাজির ব্যবস্থা বহাল থাকে তা হলে নাগরিকদের হতাশাই বাড়ে কেবল। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যে নিষ্ক্রিয় রয়েছে, তা বলা যাবে না। কিছু ঘটনায় অভিযুক্তদের গ্রেফতার করা হয়েছে। অভিযানও চলছে। রাজনৈতিক দলগুলো চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতার ঘোষণা দিয়েছে। এসব অভিযান বা ঘোষণা বাস্তবে কতটা কার্যকর সেটা সময়ই বলে দেবে।
যদি তালিকাভুক্ত শীর্ষ অপরাধীরা ধরাছোঁয়ার বাইরেই থাকে তা হলে পরিস্থিতির টেকসই উত্তরণ ঘটানো কঠিন হবে। মাঠে যারা চাঁদা সংগ্রহ করে কেবল তাদের ধরলেই হবে না। তাদের আশ্রয়-প্রশ্রয়দাতাদেরও চিহ্নিত করে আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে।
নেপথ্যের শক্তি যে বা যারাই হোন না কেন তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে। সমাজে এই বার্তাটা দিতে হবে যে, চাঁদাবাজি করে কেউ পার পাবে না। এমনকি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কারও বিরুদ্ধে যদি কোনো ধরনের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ ওঠে তবে সেটাও আমলে নেওয়া জরুরি। এ ধরনের অভিযোগ স্বাধীনভাবে তদন্ত করে সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। কোনো অপরাধের অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা ও দায়ীদের বিরুদ্ধে সমানভাবে ব্যবস্থা নেওয়াই রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
শীর্ষ সন্ত্রাসী ও অর্থদাতাদের শনাক্ত করে তাদের আর্থিক নেটওয়ার্ক ভাঙতে হবে। বিদেশি নম্বর, অনলাইন যোগাযোগ ও ডিজিটাল অর্থপ্রবাহ বিশ্লেষণে পুলিশ, গোয়েন্দা সংস্থা, বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন এবং আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিটের সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। ব্যবসায়ীদের জন্য নিরাপদ অভিযোগ গ্রহণের ব্যবস্থা থাকতে হবে। অভিযোগ করে তারা যেন নতুন করে হয়রানির মুখে না পড়েন, সেটা নিশ্চিত করতে হবে।
চাঁদাবাজি কেবল আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়। দেশের অর্থনীতি ও বিনিয়োগের স্বার্থও এর সঙ্গে জড়িত। আমরা এমন সমাজব্যবস্থা দেখতে চাই না, যেখানে ব্যবসা করার জন্য কাউকে চাঁদা দিতে হয়।
সময়ের আলো/এসএকে