‘ক্রীড়া, সংস্কৃতি, মুক্তিযুদ্ধ-চিত্রার কোলে নড়াইল সমৃদ্ধ’ এই স্লোগান শুধু নড়াইলবাসীর আবেগ নয়, বরং জেলার অস্তিত্বেরই প্রতীক। বিশ্ববরেণ্য চিত্রশিল্পী এস এম সুলতানের তুলিতে যে চিত্রা নদীর রূপ বারবার জীবন্ত হয়ে উঠেছে, সেই প্রমত্তা চিত্রা এখন অস্তিত্ব সংকটে। উজানে পানির প্রবাহ কমে যাওয়া, অবৈধ দখল এবং দূষণের কারণে নদীটি ধীরে ধীরে মৃতপ্রায় খালে পরিণত হচ্ছে।
এক সময় চিত্রা নদী ছিল নড়াইলের অর্থনীতির প্রাণ। প্রবীণদের স্মৃতিতে এখনো ভাসে সেই সময়ের কথা, যখন বড় বড় লঞ্চ, স্টিমার ও পালতোলা নৌকার চলাচলে মুখর থাকত নদীর দুই তীর। স্বচ্ছ পানি ও গভীরতা ছিল এ অঞ্চলের মানুষের গর্ব। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে উজানের পানির প্রবাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় নদীর সেই জৌলুস হারিয়ে গেছে। এখন নদীটি অনেকটাই স্থির ও প্রাণহীন।
নাব্য সংকটের সুযোগ নিয়ে নদীর দুই তীরে দখলদারদের আগ্রাসনও বেড়েছে। নদীর জায়গা দখল করে গড়ে তোলা হচ্ছে স্থায়ী পাকা স্থাপনা ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। জেলা প্রশাসনের রাজস্ব বিভাগ নদীর পাড়ে ১৩৯টি অবৈধ স্থাপনা চিহ্নিত করলেও রহস্যজনক কারণে উচ্ছেদ কার্যক্রম থেমে আছে।
নদী দখল নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে বিশিষ্ট সমাজকর্মী শরীফ মুনির হোসেন বলেন, চিত্রা নদী আমাদের ঐতিহ্য ও পরিচয়ের অংশ। আমরা চোখের সামনে একটি জীবন্ত নদীকে ধীরে ধীরে মরতে দেখছি। অথচ প্রশাসনের ভূমিকা কেবল কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ। দ্রুত কার্যকর উচ্ছেদ অভিযান না চালালে আগামী প্রজন্ম শুধু বইয়ের পাতায় চিত্রার নাম পড়বে।
দখলের পাশাপাশি বাড়ছে দূষণও। নড়াইল শহরের ড্রেনেজ ও পয়ঃনিষ্কাশনের বর্জ্য সরাসরি নদীতে ফেলা হচ্ছে। ফলে এক সময়ের স্বচ্ছ জলরাশি এখন দুর্গন্ধযুক্ত ও দূষিত হয়ে পড়েছে। এর প্রভাব পড়ছে নদীকেন্দ্রিক জীববৈচিত্র্যের ওপরও। স্থানীয় জেলেরা জানান, দূষিত পানির কারণে মাছের প্রজনন কমে গেছে এবং অনেক দেশীয় প্রজাতির মাছ প্রায় বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। নদীর ওপর নির্ভরশীল শত শত জেলে পরিবার এখন জীবিকা সংকটে পড়েছে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) নড়াইল জেলা শাখার সভাপতি মোহাম্মাদ শাহ আলম বলেন, সরকার নদীকে জীবন্ত সত্তা ঘোষণা করেছে। কিন্তু নড়াইলে তার বাস্তব প্রতিফলন নেই। প্রশাসন শুধু তালিকা তৈরি করেই দায়িত্ব শেষ করছে। দ্রুত খনন ও উচ্ছেদ না করা হলে চিত্রা একসময় মানচিত্র থেকেই হারিয়ে যাবে।
এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আব্দুল ছালাম অবৈধ দখলদারদের তালিকার সত্যতা স্বীকার করলেও দখলমুক্ত করা বা দূষণ রোধে কোনো নির্দিষ্ট পরিকল্পনার কথা জানাননি। প্রশাসনের এমন বক্তব্যে স্থানীয় মানুষের মধ্যে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
নড়াইলের হাজার বছরের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের ধারক চিত্রা নদীকে বাঁচাতে এখন সরকারের উচ্চপর্যায়ের হস্তক্ষেপ চান স্থানীয়রা। তাদের দাবি, দ্রুত নদী খনন করে পানির প্রবাহ ফিরিয়ে আনা এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্তভাবে অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ করতে হবে। কারণ চিত্রা বাঁচলেই বাঁচবে নড়াইলের প্রকৃতি, সংস্কৃতি ও জনজীবন।
আরবিএন