এক টেবিলে সব বয়সি মানুষ। কেউ পরেছেন সাদামাটা আর কেউ বাহারি। কেউ দূরের আবার কেউ কাছের গ্রাম থেকে। কেউ খাবার পরিবেশনে আবার কেউ প্লেট এগিয়ে। অহংকার মাড়িয়ে সবাই যেন একই পরিবারের। এই সম্প্রীতির অনন্য উদাহরণ চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির গোপালঘাটা গ্রামের কালা গাজী শাহ জামে মসজিদ প্রাঙ্গণে। শুক্রবার রাতে পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (স.) উপলক্ষে এ আয়োজন।
আশপাশের কয়েক গ্রামের মানুষ ছোটেন এই আয়োজনে। কারও হাতে থাকে খাবার, কেউ ব্যস্ত থাকেন অতিথি আপ্যায়নে। আবার কেউ স্বেচ্ছায় দায়িত্ব নেন পরিবেশন ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতায়। হাজারো মানুষের উপস্থিতিতে প্রাঙ্গণ পরিণত হয় এক মহামিলন মেলায়।
আয়োজনে দৃশ্যপট একেবারেই ভিন্ন, খাবার টেবিলে নেই কোনো সেবক। নেই বিভাজন। সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এক কাতারে বসে খাচ্ছেন। ধনী-গরিব, কৃষক-শ্রমিক, ব্যবসায়ী কিংবা চাকরিজীবী সবার পরিচয় একটাই, তাঁরা এই আয়োজনের অতিথি।
খাবার পরিবেশনেও নেই কোনো সংকোচ। অসংকোচ প্রকাশে একে অপরের হাতে খাবার তুলে দেওয়া, পানি এগিয়ে কিংবা খাবার শেষে প্লেট পরিষ্কার করে রাখা; সবকিছুতেই দেখা মেলে পারস্পরিক সহযোগিতা ও ভ্রাতৃত্বের অটুট বন্ধন।
তথ্যানুযায়ী, প্রতিবছর প্রায় ১০ থেকে ১২ হাজার মানুষের জন্য খাবারের আয়োজন হয়। স্থানীয় বাসিন্দার সাধ্যমতো এতে আর্থিকভাবে শরীক হন। আশপাশের কয়েক গ্রামের মানুষ এতে অংশ নিতে দুইদিনব্যাপী অনুষ্ঠানের শেষ দিনে মসজিদ প্রাঙ্গণে ভিড় করেন।
পুরুষদের পাশাপাশি শিশু ও বৃদ্ধদের উপস্থিতিও সবার নজর কাড়ে। অনেকেই পরিবার-পরিজন নিয়ে হাজির হন ঐতিহ্যের অংশ হতে। বিশেষ করে নারীদের জন্য দিনের বেলায় বাড়িতে পৌঁছানো হয় টিফিনবক্স ভর্তি খাবারের থলে। ফলে প্রাঙ্গণে উপস্থিত না থেকেও অনেক নারী আয়োজনের অংশ হন।
প্রজন্ম পেরিয়ে এখনো ধরে আছে ঐতিহ্য
দু’শো বছরের এক আয়োজন এলাকার জন্য নিঃসন্দেহে দীর্ঘ। সময়ের সঙ্গে বদলেছে মানুষের জীবন, বদলেছে সমাজের রীতিনীতি ও কাঠামো। আধুনিকতার ছোঁয়ায় হারাতে বসেছে বহু বছরের পুরোনো রীতি-সংস্কৃতিও। কিন্তু কালা গাজী শাহ জামে মসজিদের এই আয়োজন টিকেছে ইতিহাসের সাক্ষী হতে, এতেই পুরো এলাকার মানুষ পরিতৃপ্ত।
স্থানীয় বাসিন্দা ও মিলাদুন্নবী উদযাপন কমিটির সভাপতি শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. জয়নাল আবেদিন মুহুরি বলেন, ‘সময়ের স্রোতে অনেক কিছু হারিয়ে গেলেও প্রতিবছর এই পুরোনো দৃশ্য আমাদের আপ্লুত করে। কোলাকুলি, একই টেবিলে আপ্যায়ন, সেবা ও ভেদাভেদ ভুলে মানুষের পাশে দাঁড়ানোটাই সবার লক্ষ্য। গ্রামের মানুষ এই আয়োজনকে তাদের পরম মমতায় আপন করে নিয়েছেন। সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা।’
অন্তত দু’শো বছরের এই আয়োজন যেন নীরবে বলে যায়, মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয় কাজের চেয়েও সামাজিকতায়। কথায় আছে ‘সকলের তরে সকলে আমরা, প্রত্যেকে আমরা পরের তরে।
সময়ের আলো/আতা