সদরঘাটে ঈদযাত্রার প্রস্তুতি নিরাপত্তা ভালো, দুশ্চিন্তা ভাড়ায়

মোশফিকুর রহমান ইমন

জাতীয়

আসন্ন ঈদুল আজহা উপলক্ষে ঢাকার সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে শুরু হয়েছে ব্যাপক কর্মযজ্ঞ। দক্ষিণবঙ্গের হাজারো মানুষের নাড়ির টানে বাড়ি ফেরার অন্যতম

2026-05-16T03:47:11+00:00
2026-05-16T03:47:11+00:00
 
  শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬,
৩ শ্রাবণ ১৪৩৩
শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬
জাতীয়
সদরঘাটে ঈদযাত্রার প্রস্তুতি নিরাপত্তা ভালো, দুশ্চিন্তা ভাড়ায়
মোশফিকুর রহমান ইমন
প্রকাশ: শনিবার, ১৬ মে, ২০২৬, ৩:৪৭ এএম 
ছবি : সময়ের আলো
আসন্ন ঈদুল আজহা উপলক্ষে ঢাকার সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে শুরু হয়েছে ব্যাপক কর্মযজ্ঞ। দক্ষিণবঙ্গের হাজারো মানুষের নাড়ির টানে বাড়ি ফেরার অন্যতম প্রধান মাধ্যম এই নদীবন্দর। ঈদে ঘরমুখো যাত্রীদের যাতায়াত নির্বিঘ্ন ও নিরাপদ করতে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা পন্টুন মেরামত, লঞ্চের ফিটনেস পরীক্ষা ও সার্বিক নিরাপত্তাব্যবস্থায় বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছেন।

তবে এবারের ঈদযাত্রার প্রেক্ষাপট কিছুটা ভিন্ন। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি ও পদ্মা সেতুর প্রভাবে যাত্রী সংকটের কারণে লঞ্চমালিক ও শ্রমিকরা এক ধরনের অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়েই প্রস্তুতি নিচ্ছেন। একদিকে যেমন ভাড়া বৃদ্ধির চাপ রয়েছে, অন্যদিকে তেমনই যাত্রী টানার চ্যালেঞ্জও বিদ্যমান।

নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কর্তৃপক্ষ স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, কোনোভাবেই মাঝ নদী থেকে নৌকায় করে যাত্রী তোলা যাবে না। সবাইকে মূল টার্মিনাল দিয়েই লঞ্চে উঠতে হবে। 

গতকাল সরেজমিন সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল ঘুরে দেখা যায়, ঈদযাত্রা সামনে রেখে চলছে জোর প্রস্তুতি। বিভিন্ন পন্টুন সংস্কার, ঘাট পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা এবং যাত্রীদের জন্য নির্দেশনামূলক সাইনবোর্ড স্থাপনের কাজ করছেন বন্দরসংশ্লিষ্টরা। কোথা থেকে কোন রুটের লঞ্চ ছাড়বে, জরুরি প্রয়োজনে কোথায় যোগাযোগ করতে হবে- এসব তথ্যও টাঙিয়ে দেওয়া হয়েছে বিভিন্ন স্থানে।
আরও পড়ুন

প্রস্তুত লঞ্চ : বিআইডব্লিউটিএর ঢাকা নদীবন্দর সদরঘাটের নৌ নিরাপত্তা ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা বিভাগ সূত্রে জানা যায়, আগে ২২০ থেকে ২২৫টি লঞ্চ চলত। এর মধ্যে বর্তমানে ৩৮টি রুটের মধ্যে ৩৩টি রুটে লঞ্চ চলাচল করে। গত ঈদেও ঢাকা নদীবন্দর থেকে প্রতিদিন গড়ে ৫৫ থেকে ৬০টি লঞ্চ চালু ছিল। কিন্তু এখন লঞ্চের সংখ্যা কম। বর্তমানে ১৭০ থেকে ১৮০টি লঞ্চ প্রস্তুত রয়েছে। গার্মেন্টস ছুটির পর বসে থাকা সবকটি লঞ্চ চলাচলের প্রস্তুতি রাখা হয়েছে। যাত্রীচাপ সামলাতে নিয়মিত লঞ্চের পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী বিশেষ লঞ্চ সার্ভিসও চালু রাখা হবে।

এই সংস্থার যুগ্ম পরিচালক মুহাম্মদ মোবারক হোসেন বলেন, ঢাকা থেকে বরিশালসহ অন্যান্য সব রুটে পর্যাপ্ত লঞ্চ যাতায়াতের জন্য প্রস্তুত আছে। বর্তমানে সদরঘাটে ১৫০টির মতো লঞ্চ রয়েছে, যার মধ্যে ৩০টি নিয়মিত চলাচল করছে। ঈদযাত্রায় সবগুলো চলবে।

অন্যদিকে ঘাটে নোঙ্গর করা লঞ্চগুলো ধুয়ে-মুছে প্রস্তুত করছেন মালিকপক্ষের কর্মীরা। যাত্রাপথে দুর্ঘটনা এড়াতে অনেক লঞ্চে মেরামত ও রঙের কাজও করা হয়েছে। এখনও ঈদের চাপ শুরু হয়নি। তবে ২০ মের পর যাত্রী বাড়বে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

ঢাকা-ভোলা রুটের এম ডি গাজী সালাউদ্দিন লঞ্চের সুপারভাইজার জাবেদ হোসেন বলেন, ঈদ সামনে রেখে লঞ্চগুলো ধুয়ে-মুছে সম্পূর্ণ প্রস্তুত রাখা হয়েছে। যাত্রীদের নিরাপদ যাত্রা নিশ্চিত করতে নিয়মিত সার্ভিসিং ও নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। এখনও যাত্রীচাপ শুরু হয়নি, তবে ২০ মের পর চাপ অনেক বেড়ে যাবে বলে আমরা ধারণা করছি।

এম ভি জাকির সম্রাট-৩ লঞ্চের সহকারী সুপারভাইজার মাকসুদুর রহমান বলেন, যাত্রীদের সুবিধার কথা মাথায় রেখে কেবিনসহ পুরো লঞ্চ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা হয়েছে। কিছু প্রয়োজনীয় মেরামত ও রঙের কাজও শেষ করা হয়েছে। ঈদের আগে শেষ মুহূর্তে যাত্রী বাড়বে, সেই প্রস্তুতিই এখন নেওয়া হচ্ছে।

তাসরিফ-১ লঞ্চের সুপারভাইজার মো. আকতার হোসেন বলেন, নিরাপদ যাত্রা নিশ্চিত করতে লঞ্চের সব ধরনের যান্ত্রিক পরীক্ষা ও ফিটনেস যাচাই সম্পন্ন করা হয়েছে। এখন যাত্রী তুলনামূলকভাবে কম থাকলেও ঈদের কাছাকাছি সময়ে চাপ বাড়বে, তাই আমরা পুরোপুরি প্রস্তুত।

সুন্দরবন-৩ লঞ্চের সুপারভাইজার ইমরান আলী বলেন, ঈদযাত্রা কেন্দ্র করে লঞ্চে বাড়তি নজরদারি ও পরিচ্ছন্নতার কাজ চলছে। যাত্রীদের কোনো ধরনের ভোগান্তি যেন না হয়, সে বিষয়টি আমরা গুরুত্ব দিচ্ছি। এখনও ভিড় কম, তবে শেষ দিকে চাপ অনেক বাড়বে।

এমভি অথৈ-১ লঞ্চের সুপারভাইজার সাইদুল ইসলাম বলেন, আমরা যাত্রীসেবা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছি। লঞ্চের নিরাপত্তা ও আরামদায়ক যাত্রা নিশ্চিত করতে নিয়মিত তদারকি চলছে। ঈদের আগে শেষ মুহূর্তে যাত্রীচাপ বাড়বে- এটাই স্বাভাবিক।

জ্বালানির প্রভাবে ভাড়া বৃদ্ধি : অন্যদিকে সারা দেশে জ্বালানির দাম বাড়ার প্রভাব পড়েছে সদরঘাটেও। বেড়েছে ভাড়া। গত ৫ মে লঞ্চের ভাড়ার প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, ১০০ কিলোমিটার পর্যন্ত ২ টাকা ৭৭ পয়সা থেকে ১৮ পয়সা বেড়ে ২ টাকা ৯৫ পয়সা এবং ১০০ কিলোমিটারের বেশি দূরত্বের ক্ষেত্রে ভাড়া ২ টাকা ৩৮ পয়সা থেকে ১৪ পয়সা বাড়িয়ে ২ টাকা ৫২ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে। এতে জনপ্রতি সর্বনিম্ন ভাড়া ২৯ টাকা থেকে ৩ টাকা বাড়িয়ে ৩২ টাকা করা হয়েছে। 

প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, ডেকের ভাড়া ঢাকা থেকে বরিশাল রুটে ৪৫০ থেকে বেড়ে ৪৮০-৫০০; চাঁদপুর রুটে ১৭০ থেকে বেড়ে ১৮৫-১৯৫; ভোলা রুটে ৩৫০ থেকে বেড়ে ৩৮০-৪০০; পটুয়াখালী রুটে ৫০০ থেকে বেড়ে ৫৩০-৫৫০ ও ঝালকাঠি রুটে ৪৮০ থেকে বেড়ে ৫১০-৫২৫ টাকা হতে পারে। 

তবে এই সুযোগে যাতে কেউ বেশি ভাড়া না নিতে পারে সে বিষয়ে নজরদারি করছেন সংশ্লিষ্টরা।

লঞ্চ মালিক সমিতি সূত্রে জানা যায়, যাত্রীদের স্বস্তির জন্য সরকারের নির্ধারিত ১০ শতাংশ পর্যন্ত ভাড়া কম নেওয়া হতে পারে। 

সমিতির কর্মকর্তা মামুনুর রশিদ বলেন, জ্বালানি সংকটে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে রুট অনুযায়ী ভাড়া বাড়তে পারে। কিন্তু ঈদ উপলক্ষে ভাড়া বাড়বে না। এ ছাড়া গত ঈদের মতো এবারও ১০ শতাংশ ছাড় দেওয়া হতে পারে।

বরগুনাগামী যাত্রী মো. আব্দুল হালিম বলেন, জ্বালানির দাম বাড়ার কারণে ভাড়া কিছুটা বাড়লেও লঞ্চে এখনও যাতায়াত তুলনামূলক সাশ্রয়ী। তবে ঈদের সময় যাতে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করা না হয়, সেটি প্রশাসনকে কঠোরভাবে নজরদারি করতে হবে।

বরিশালগামী যাত্রী মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, সরকার নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে ১০ শতাংশ ছাড়ে টিকেট পাওয়া যাত্রীদের জন্য স্বস্তির। বিশেষ করে ঈদ উপলক্ষে কেবিন ভাড়ায় ছাড় দেওয়ায় পরিবার নিয়ে যাতায়াত সহজ হবে।

দুর্ঘটনা-ভোগান্তি এড়াতে নির্দেশনা, ফ্লাইওভারের দাবি :
যাত্রীচাপ সামলাতে নিয়মিত লঞ্চের পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী বিশেষ সার্ভিসও চালু রাখা হবে। একই সঙ্গে এবারের ঈদযাত্রায় দুর্ঘটনা এড়াতে যাত্রীদের টার্মিনাল দিয়ে প্রবেশের নির্দেশনা দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। যাত্রীদের কেবল টার্মিনাল দিয়েই লঞ্চে উঠতে এবং নামতে হবে। কোনো নৌকা যাতে লঞ্চ টার্মিনালে প্রবেশ না করতে পারে সে ক্ষেত্রে নৌপুলিশ, কোস্ট গার্ড, বিআইডব্লিউটিএ এবং ডিজি শিপিংকে নজরদারির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

বিআইডব্লিউটিএর ঢাকা নদীবন্দর সদরঘাটের নৌ নিরাপত্তা ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা বিভাগের যুগ্ম পরিচালক মুহাম্মদ মোবারক হোসেন বলেন, মন্ত্রণালয়ের মিটিংয়েও বলেছি, নদীতে মেইন চ্যানেলে জাল ফেলা যাবে না। যাতে লঞ্চের কোনো প্রতিবন্ধকতা তৈরি না হয়, দুর্ঘটনা না ঘটে। সব যাত্রী টার্মিনাল দিয়ে লঞ্চে উঠবে। নৌকা দিয়ে কোনো যাত্রী উঠবে না বা নামবে না।

লঞ্চ মালিক সমিতির যুগ্ম মহাসচিব বদিউজ্জামান বাদল বলেন, ঈদযাত্রা নিরাপদ রাখতে নৌপুলিশ, কোস্ট গার্ড, বিআইডব্লিউটিএ ও ডিবি শিপিংকে কঠোরভাবে নজরদারি করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সদরঘাট অভিমুখে সব রাস্তার প্রতিবন্ধকতা দূর করতেও সংশ্লিষ্টদের বলা হয়েছে।

অন্যদিকে গুলিস্তান থেকে সদরঘাট পর্যন্ত আসতে যানজটের কারণে দীর্ঘ সময় নষ্ট হয়, যা যাত্রীদের নৌপথ বিমুখ করছে। ফুটপাথে হকার এবং যত্রতত্র বাস কাউন্টার স্থাপনের ফলে মালামাল নিয়ে যাত্রীদের যাতায়াতে চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়। নৌবান্ধব অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে যাত্রীদের যাতায়াত নিরাপদ ও আরামদায়ক করতে হবে। এই লক্ষ্যে গুলিস্তান থেকে সদরঘাট পর্যন্ত যাতায়াত সহজ করতে ফ্লাইওভার নির্মাণ করা অথবা মেট্রোরেলের একটি শাখা সম্প্রসারণ করার দাবি জানান সংশ্লিষ্টরা।

সমিতির কর্মকর্তা মামুনুর রশিদ বলেন, নৌ শিল্প একটি প্রাচীন এবং গুরুত্বপূর্ণ শিল্প। সঠিক অবকাঠামোগত সহায়তা না পেলে এই শিল্প অচিরেই ধ্বংসের মুখে পড়বে। এই শিল্প বাঁচাতে এবং যাত্রীদের ভোগান্তি কমাতে গুলিস্তান থেকে সদরঘাট পর্যন্ত ফ্লাইওভার নির্মাণ করা অথবা মেট্রোরেল স্থাপন করার দাবি জানাই।

এএডি/


  বিষয়:   সদরঘাটে ঈদযাত্রার প্রস্তুতি নিরাপত্তা ভালো  দুশ্চিন্তা ভাড়ায় 


Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: