বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) বীজ প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্রের ট্রাক শেড নির্মাণ প্রকল্পের কাজ শেষ না হলেও সম্পূর্ণ টাকা উঠিয়ে নিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার। রাজধানী ঢাকার গাবতলীতে বিএডিসির ‘ট্রাক সেড নির্মাণ’ নামে এই প্রকল্পের কাজ শুরু হয় ২০২৪ সালের নভেম্বরে। কাজটি শেষ হওয়ার কথা ছিল ৩০ জুন ২০২৫ সালে। কিন্তু এখন পর্যন্ত এই প্রকল্পের অনেকাংশের কাজ শেষ হয়নি। কাজ আদৌ শেষ হবে কি না, তা নিয়ে সন্দিহান বিএডিসি কর্মকর্তারা।
তাদের অভিযোগ, গাবতলী বীজ প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্রের উপ-পরিচালক কে এম আবুল কালামের যোগসাজশে ঠিকাদার টাকা নিয়ে লাপাত্তা। খোঁজ নিয়ে এর সত্যতাও মিলেছে।
বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) অধীনে পরিচালিত একটি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি প্রতিষ্ঠান বীজ প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র- যা ঢাকার গাবতলী এলাকায় অবস্থিত। এটি মূলত দেশের কৃষকদের জন্য গুণগত মানসম্পন্ন বীজ সংগ্রহ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও সংরক্ষণের কাজ করে থাকে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ‘ট্রাক সেড নির্মাণ’ প্রকল্পের কাজটি পায় আর ডি ট্রেডিং নামে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয় ১৭ লাখ ৯২ হাজার টাকা। এক বছর আগে প্রকল্পের শতভাগ কাজ শেষ করার কথা থাকলেও তা হয়নি। এখনও শেডের ওপরের ছাউনি, বাউন্ডারি, ফ্লোর, দরজা-জানালা এবং ফিনিশিংয়ের কাজ বাকি। কিন্তু ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান প্রকল্পের পুরো টাকা উঠিয়ে নিয়েছে। যার ব্যাংক প্রমাণও পাওয়া গেছে। দুই দফায় সোনালী ব্যাংকের কল্যাণপুর শাখা থেকে এই টাকা উত্তোলন করে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানটি।
গাবতলী বীজ উৎপাদন খামারের কয়েকজন কর্মকর্তা সময়ের আলোকে জানান, কাজ সম্পন্ন না করে ঠিকাদার সম্পূর্ণ টাকা উঠিয়ে পলাতক আছে। তিনি কোনোভাবে যোগাযোগ করছেন না। উপ-পরিচালক কে এম আবুল কালামের সঙ্গে আর্থিক যোগসাজশে করে সম্পূর্ণ টাকা উঠিয়ে নেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে ঠিকাদার ও কর্মকর্তা দুজনে টাকা ভাগাভাগি করে নেন।
তাদের ভাষ্য- ঠিকাদার সাইট হ্যান্ড ওভার না করেই কাজ অসম্পূর্ণ রেখে সব টাকা উঠিয়ে নিয়েছেন। অভিযুক্ত কর্মকর্তা ওই টাকা উত্তোলন করতে ঠিকাদারকে চেক প্রদান করেন। অর্থাৎ ঠিকাদারের কাছ থেকে উপ-পরিচালক চার লাখ টাকার ব্যাংক ড্রাফট রেখে দিয়ে, ঠিকাদারকে প্রকল্পের পুরো টাকা উত্তোলন করতে সহায়তা করেন। এটি সম্পূর্ণ নিয়মবহির্ভূত। কোনো সরকারি কর্মকর্তার ঠিকাদারের সঙ্গে এভাবে টাকার লেনদেন করার এখতিয়ার নেই। যা পুরোপুরি আর্থিক দুর্নীতির পর্যায়ে পড়ে।
খোঁজ নিয়ে আরও জানা যায়, গত মাসে এই বিষয়ে কৃষি ও পরিবেশ অডিট অধিদফতর একটি অডিট করে। এপ্রিলের মাঝামাঝিতে সেই অডিট প্রতিবেদন দাখিল করে অডিট কমিটি।
অডিটের দলনেতা ও অধিদফতরের নিরীক্ষা ও হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা মো. আবুল কালাম আজাদ সময়ের আলোকে বলেন, আমরা সরেজমিন যা দেখেছি সেই আলোকে অফিসে প্রতিবেদন দাখিল করেছি। আপনারাও তাই দেখেছেন। প্রকল্পের কাজ তো বাকি আছে। কিন্তু মেয়াদ তো বহু আগেই শেষ হয়ে গেছে।
আরও পড়ুন
অভিযোগের বিষয়ে বীজ প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্রের উপ-পরিচালক কে এম আবুল কালাম সময়ের আলোকে বলেন, অফিসে আসেন সামনাসামনি কথা হবে। প্রকল্পের প্রায় ৮০ ভাগ কাজ শেষ হয়েছে। ঠিকাদার কাজ না করলেও তার জামানত রয়েছে। সেখান থেকে পুরো কাজ করা যাবে।
পরে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আর ডি ট্রেডিংয়ের কর্ণধার দীপন নিজেই টেলিফোন করে এই প্রতিবেদককে বলেন, আমাকে আবুল কালাম স্যার (উপ-পরিচালক) আপনার সঙ্গে কথা বলতে বলেছেন। আমি আপনার সঙ্গে দেখা করব।
প্রকল্পের কাজের বিস্তারিত জানতে চাইলে তিনি বলেন, কাজ অনেক আগেই শেষ করার কথা ছিল। কিন্তু তা হয়নি। কাজ সামান্য কিছু বাকি আছে। ছাউনি ছাড়া সব কাজ ওকে। আর আমি পাঁচ লাখ টাকা উপ-পরিচালক (বীপ্রকে), মিরপুর, ঢাকার অনুকূলে পে-অর্ডার করে দিয়েছি।
পে-অর্ডার করার কোনো নিয়ম আছে কি না, জবাবে ঠিকাদার বলেন, নিয়ম নেই; আবার আছেও।
এই টাকা উত্তোলনের পেছনে উপ-পরিচালকের সঙ্গে আর্থিক সমঝোতা হয়েছে কিনা, জানতে চাইলে তিনি বলেন, না না। আবুল কালাম স্যারের মতো সৎ অফিসার পাবেন না।
জানা যায়, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আর ডি ট্রেডিং এই প্রকল্পের কিছু অংশের কাজ করায় থার্ড পার্টিকে দিয়ে। বিএডিসির বিভিন্ন প্রকল্পের কাজ করেন মো. জাহাঙ্গীর আলম খোকা নামে এক ব্যক্তি।
সময়ের আলোকে তিনি বলেন, আমার দায়িত্ব ছিল ‘ট্রাক সেড নির্মাণ’ প্রকল্পের কিছু অংশের কাজ করা। আমি তা যথাযথভাবে করে কর্তৃপক্ষকে বুঝিয়ে দিয়েছি। কিন্তু ঠিকাদার দীপন আমাদের সঙ্গে প্রতারণা করেছেন। তিনি কাজের টাকা দিতে গড়িমসি করছেন। তিনি খুবই ধুরন্ধর লোক। তাকে ছাই দিয়েও ধরা যায় না।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের বীজ প্রক্রিয়াজাতকরণ ও সংরক্ষণ বিভাগের অতিরিক্ত মহাব্যবস্থাপক মো. মোশাব্বের হোসেন সময়ের আলোকে বলেন, হ্যাঁ প্রকল্পটির মেয়াদ শেষ হয়েছে। শুনেছি ঠিকাদার কাজ করছে না। আজাদ সাহেবের কাছে খোঁজ-খবর নেব। তিনি আপনাকে বিস্তারিত বলতে পারবেন। তিনিই ‘ট্রাক সেড নির্মাণ’ প্রকল্পের অনুমোদন দেন।
এএডি/