দীর্ঘ সাত দশক তথা ৭০ বছর ধরে বিবাহবহির্ভূত লিভ-ইন সম্পর্কে একসঙ্গে বসবাস করার পর অবশেষে আনুষ্ঠানিকভাবে বিয়ের পিঁড়িতে বসেছেন ভারতের রাজস্থানের এক বৃদ্ধ দম্পতি। রাজস্থানের দুঙ্গারপুর জেলার গালান্দার নামক একটি উপজাতি অধ্যুষিত গ্রামের বাসিন্দা ৯৫ বছর বয়সী রামা ভাই খারাড়ি এবং ৯০ বছর বয়সী জিওয়ালি দেবী সম্প্রতি সনাতন ধর্মীয় রীতি মেনে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন।
দীর্ঘদিনের এই জীবনে বিয়ে না করলেও এই দম্পতির ঘরে ইতিমধ্যে আটটি সন্তান এবং বহু নাতি-নাতনি রয়েছে। সাত দশকের দীর্ঘ প্রেমের পর জীবনের শেষ অধ্যায়ে এসে এই বৃদ্ধ দম্পতির বিয়ের সিদ্ধান্ত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে এবং তাদের এই চমৎকার উদ্যোগে সন্তানেরাও পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছেন।
এই অনন্য বিয়ের বিষয়ে নবদম্পতির ছেলে কান্তি লাল খারাড়ি ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভিকে জানিয়েছেন, কিছুদিন আগে তার বাবা-মা আনুষ্ঠানিকভাবে বিয়ে করার ব্যাপারে গভীর আগ্রহ প্রকাশ করেন। তাদের এই ইচ্ছার কথা জানার পর পুরো পরিবার একসঙ্গে বসে বিয়ের আয়োজন করার সিদ্ধান্ত নেয়।
এই বিষয়ে গ্রামের প্রবীণ মুরব্বিদের সঙ্গেও বিস্তারিত পরামর্শ করা হয় এবং সবার সম্মতিতে গত ১ জুন তাদের ঐতিহ্যবাহী গায়ে হলুদের অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়। এরপর গত ৪ জুন পুরো গ্রামের মানুষের উপস্থিতিতে অত্যন্ত আনন্দঘন পরিবেশে এই দম্পতির বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়। কান্তি লাল আরও বলেন, ‘বাবা-মা তাদের এই বিয়েতে অত্যন্ত সুখী এবং তাদের এই খুশিতে আমরা সন্তানেরাও ভীষণ আনন্দিত।’
বিয়ের আগে এই প্রবীণ দম্পতির একটি ঐতিহ্যবাহী শোভাযাত্রা বা ‘বান্দোলি’ বের করা হয়েছিল, যেখানে ডিজে মিউজিকের তালে তালে পুরো গ্রামের মানুষ এবং বর-কনের ছেলেমেয়েরা একসঙ্গে নেচে-গেয়ে আনন্দ উল্লাস করেন।
এরপর পবিত্র অগ্নিকে সাক্ষী রেখে সনাতন রীতির ‘সাত ফেরে’ বা অগ্নিপ্রদক্ষিণ সম্পন্ন করার মাধ্যমে তাদের দীর্ঘ ৭০ বছরের সম্পর্কের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি মেলে। বিয়ে সম্পন্ন হওয়ার পর নবদম্পতির সম্মানে পুরো গ্রামবাসীর জন্য একটি বিশাল ভোজসভার আয়োজন করা হয়েছিল, যেখানে গ্রামের প্রতিটি মানুষ উপস্থিত থেকে এই প্রবীণ দম্পতিকে আশীর্বাদ ও শুভেচ্ছা জানান।
উল্লেখ্য, রামা ভাই ও জিওয়ালি দেবী রাজস্থানের উপজাতীয় অঞ্চলের অত্যন্ত জনপ্রিয় ও প্রাচীন ‘নাতা প্রথা’ বা নাতা ঐতিহ্যের অধীনে দীর্ঘ ৭০ বছর ধরে এক ছাদের নিচে বসবাস করে আসছিলেন।
এই বিশেষ সামাজিক নিয়ম অনুযায়ী, যেকোনো উপজাতীয় পুরুষ বা নারী বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা ছাড়াই পারস্পরিক সম্মতিতে নিজেদের পছন্দের অন্য কোনো ব্যক্তির সঙ্গে লিভ-ইন সম্পর্কে আজীবন বসবাস করতে পারেন। এই ধরনের সম্পর্ক থেকে জন্ম নেওয়া সন্তানেরাও বাবার সমস্ত স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির পূর্ণ আইনি উত্তরাধিকার লাভ করে থাকে।
তবে সমাজে নাতা প্রথার স্বীকৃতি থাকলেও আইনগতভাবে বিবাহিত মর্যাদা না থাকার কারণে এই দম্পতিকে কিছু সামাজিক প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতে হচ্ছিল, বিশেষ করে বিভিন্ন শুভ ও মাঙ্গলিক অনুষ্ঠানে তাদের অংশগ্রহণে কিছু নিষেধাজ্ঞা ছিল।
রাজস্থানের স্থানীয় উপজাতীয় নিয়ম অনুযায়ী, আনুষ্ঠানিকভাবে বিয়ে না করার কারণে মায়েরা তাদের নিজেদের সন্তানদের বিয়ে, গায়ে হলুদ কিংবা নতুন জামাইকে বরণ করার মতো পবিত্র সামাজিক উৎসবগুলোতে সরাসরি অংশ নিতে পারতেন না। মূলত জীবনের শেষ সময়ে এসে এই সমস্ত সামাজিক নিষেধাজ্ঞা ও সীমাবদ্ধতা থেকে মুক্তি পেতেই এই প্রবীণ দম্পতি তাদের সাত দশকের সম্পর্ককে বিয়ের মাধ্যমে পূর্ণতা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
সূত্র: এনডিটিভি।
সময়ের আলো/টিএইচ