‘ডিজিটাল জীবনধারা, সংযোগে স্থিতি, সহনশীলতায় শক্তি’ এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে প্রতি বছরের ন্যায় এবারও বর্ণাঢ্য আয়োজনের মধ্য দিয়ে দেশে পালিত হচ্ছে বিশ্ব টেলিযোগাযোগ ও তথ্য সংঘ দিবস-২০২৬।
তবে বিশ্বের অন্য দেশগুলোর পাশাপাশি প্রতি বছর ঢাকঢোল পিটিয়ে বাংলাদেশেও দিবসটি পালন করা হলেও এখনও সব মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছেনি ডিজিটাল সেবা। আর যেটুকু পৌঁছেছে সেখানেও রয়েছে নানা প্রতিবন্ধকতা ও ভোগান্তি।
গত ১৬ এপ্রিল বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ‘আইসিটি ব্যবহারের সুযোগ ও প্রয়োগ পরিমাপ’ শীর্ষক সর্বশেষ জরিপ অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের প্রায় ৫৩ দশমিক ৪ শতাংশ মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করেন।
অর্থাৎ দেশের ৯ কোটি ৯১ লাখ ৮০ হাজার মানুষ ইন্টারনেট সুবিধার আওতায় থাকলেও, এখনও মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪১.৬ শতাংশ মানুষ ইন্টারনেট সেবার বাইরে রয়েছে।
জরিপের তথ্য অনুযায়ী, ইন্টারনেট ব্যবহারে শহর ও গ্রামের মধ্যে বড় ধরনের পার্থক্য রয়েছে। শহর এলাকায় ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর হার ৭৫ দশমিক ৭ শতাংশ হলেও গ্রামে তা মাত্র ৪৩ দশমিক ৬ শতাংশ। ফলে দুই অঞ্চলের মধ্যে ব্যবধান দাঁড়িয়েছে ৩২ দশমিক ১ শতাংশে, যা দেশের ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিচ্ছে।
ইন্টারনেট ব্যবহারের পাশাপাশি মোবাইল ফোন ব্যবহারে ব্যাপক বিস্তার লক্ষ্য করা গেলেও ব্যক্তিগত মালিকানায় এখনও ঘাটতি রয়েছে। দেশে মোট ৮৮ দশমিক ৪ শতাংশ মানুষ মোবাইল ফোন ব্যবহার করলেও নিজস্ব মোবাইল রয়েছে ৬৪ দশমিক ৪ শতাংশের।
জরিপে ৪৩ দশমিক ৬ শতাংশ নাগরিক জানিয়েছেন, উচ্চ খরচের কারণে তারা ইন্টারনেট ব্যবহারে অনাগ্রহী। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, ডিজিটাল সেবা সবার নাগালে আনতে হলে সাশ্রয়ী মূল্যে ইন্টারনেট নিশ্চিত করার পাশাপাশি দক্ষতা উন্নয়নেও জোর দিতে হবে।
অন্যদিকে নেটওয়ার্ক সমস্যা, ইন্টারনেটের ধীরগতি ও অতিরিক্ত কলরেটসহ ডিজিটাল সেবার মান নিয়ে নানা ভোগান্তিতে রয়েছে ব্যাবহারকারীরা। গত এক বছরে ১১ হাজার ৪২৭ গ্রাহক টেলিকম সেবার মান নিয়ে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনে (বিটিআরসি) অভিযোগ করেছেন। ২৫টি ক্যাটাগরিতে করা এসব অভিযোগের মধ্যে সবচেয়ে বেশি অভিযোগ ছিল ‘কোয়ালিটি অব সার্ভিস’ নিয়ে।
তবে এসব অভিযোগের মধ্যে ১০৩১১টি অভিযোগ নিষ্পত্তির দাবি করেছে বিটিআরসি। বিটিআরসির সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থ বছরের পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, জুলাই ২০২৪ থেকে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত মোট ২৫টি ক্যাটাগরিতে ১১ হাজার ৪২৭টি অভিযোগ করেছেন গ্রাহকরা।
এর মধ্যে ডাটা স্পিড নিয়ে ৯২৬টি, ডাটা ভলিউম নিয়ে ৪৮১টি, ডিসকানেক্টেড কল নিয়ে ২৬১টি, প্রতারণামূলক কার্যক্রম ১৩২টি, ইনকামিং ও আউটগোয়িং কল সংক্রান্ত ১৮১টি, ইনকামিং ও আউটগোয়িং এসএমএস সংক্রান্ত ৩১৯টি, লাইসেন্স ইস্যু নিয়ে ৭৯৮টি, এমএফএস ব্যাংকিং নিয়ে ৬৪টি, বিবিধ ১৩৩১টি, এমএনপি নিয়ে ২৭৬টি, প্যাকেজ মাইগ্রেশন নিয়ে ৬৪৭টি, কোয়ালিটি অব সার্ভিস নিয়ে ৩৫২৯টি, কুইজ প্রাইজ অ্যাওয়ার্ড ইস্যু নিয়ে ৪৩টি, রিচার্জ বিলিং নিয়ে ৪৬৭টি, সিমবার নিয়ে ১৭৬টি, সিম মালিকানা নিয়ে ৫৭টি, সিম নিবন্ধন নিয়ে ৬২টি, সোশ্যাল মিডিয়া এবং সাইবার সংক্রান্ত ৩টি, ট্যারিফ সংক্রান্ত ২৬৯টি, টেস্ট কল নিয়ে ৭৩টি, অনিবন্ধিত হ্যান্ডসেট বা এনইআইআর নিয়ে ৫৯টি, অবৈধ আইএসপি নিয়ে ১৮৪টি, আনলিমিটেড কল ও এসএমএস সংক্রান্ত ৭৩টি ও মূল্য সংযোজন সেবা (ভ্যাস) নিয়ে ৮১১টি অভিযোগ করেছেন গ্রাহকরা।
২০২৬ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত দেশে মুঠোফোন গ্রাহকের সংখ্যা ১৮ কোটি ৬০ লাখ। এর মধ্যে গ্রামীণ ফোনের গ্রাহক রয়েছে ৮ কোটি ৪৮ লাখ ৪০ হাজার। রবি আজিয়াটার গ্রাহক হচ্ছে ৫ কোটি ৭৩ লাখ ৯০ হাজার, বাংলালিংকের গ্রাহক রয়েছে ৩ কোটি ৭৩ লাখ ৭০ হাজার ও রাষ্ট্রীয় অপারেটর টেলিটকের গ্রাহক হচ্ছে ৬৮ লাখ ২০ হাজার। এসব গ্রাহকের মধ্যে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় ১১ কোটি ৪৮ লাখ।
এত সংখ্যক গ্রাহকের বিপরীতে দেশে বর্তমানে টেলিকম অপারেটরদের মোট টাওয়ার রয়েছে মাত্র ৪৬ হাজার ১৭৬টি। এ ছাড়া সারা দেশে টাওয়ার কোম্পানি ও মোবাইল অপারেটরদের মোট ৯৮ হাজার ৫১৪টি বেইজ ট্রান্সসিভার স্টেশন (বিটিএস) চালু রয়েছে, যার মধ্যে ২জি ৪৮ হাজার ৪০৬টি, ৩জি ১ হাজার ৪৭টি ও ৪জি ৪৮ হাজার ৬৩০টি।
এ বিষয়ে তথ্য প্রযুক্তিবিদ সুমন আহমেদ সাবির সময়ের আলোকে বলেন, গত পাঁচ থেকে দশ বছরে দেশে মোবাইল ব্যবহারকারীর সংখ্যা অনেক বেড়েছে। কিন্তু সেই তুলনায় মোবাইল নেটওয়ার্ক অবকাঠামোর উন্নয়ন কম হয়েছে। অপারেটররা গ্রাহক অনুপাতে তাদের সাইট বাড়িয়েছে কিন্তু স্প্রেকটার্ম বাড়ায়নি। এমনকি দেশের সব স্থানে তারা ফোরজি সার্ভিসও ডেপ্লয় করেনি। অবকাঠামোতে প্রপার ইনভেস্টমেন্ট হয়নি। তাই গ্রাহক সেবার মান বাড়ছে না।
অন্যদিকে মেলা উপলক্ষে আজ আগারগাঁও বিটিআরসি ভবনের প্রধান সম্মেলন কক্ষে (১০১) ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যযোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়সহ টেলিযোগাযোগ ও আইসিটি খাতের সরকারি-বেসরকারি অংশীজনদের নিয়ে আলোচনা সভা ও সেমিনারের আয়োজন করেছে বিটিআরসি।
দিবসটি উদযাপন উপলক্ষে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের উদ্যোগে গৃহীত দিনব্যাপী বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে বিশেষ ক্রোড়পত্র প্রকাশ, স্মারক ডাকটিকেট উন্মোচন, সমসাময়িক প্রযুক্তির ওপর বিসিএস (টেলিকম) সমিতি কর্তৃক স্মরণিকা প্রকাশ, বিটিসিএল ও ডাক বিভাগের স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের নিয়ে রচনা প্রতিযোগিতা, সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলে বিষয়ভিত্তিক আলোচনা ও বিটিআরসি প্রাঙ্গণে দুদিনব্যাপী টেলিকম মেলাসহ নানা আয়োজন। এসব কর্মসূচির মাধ্যমে ডিজিটাল প্রযুক্তির ইতিবাচক ব্যবহার, টেলিযোগাযোগ খাতের অগ্রগতি এবং একটি সংযুক্ত ও সহনশীল ডিজিটাল সমাজ বিনির্মাণে জনসচেতনতা বৃদ্ধির প্রয়াস গ্রহণ করা হয়েছে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের অধীনস্থ দফতর ও সংস্থাগুলো, বিটিআরসির ঊর্ধ্বতন কমকর্তারা, মোবাইল অপারেটর, মোবাইল হ্যান্ডসেট উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান, এনটিটিএন অপারেটর, আইএসপিএবি, আইসিএক্স অপারেটর, আইআইজি অপারেটর এবং খাত সংশ্লিষ্ট সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করবেন।
দিবসটি উপলক্ষে এক ভিডিও বার্তায় আন্তর্জাতিক টেলিকমিউনিকেশন ইউনিয়নের (আইটিইউ) মহাসচিব ডোরিন বোগডান-মার্টিন বলেন, ডিজিটাল সংযোগ আজ কেবল প্রযুক্তিগত সুবিধা নয় বরং এটি মানবিক সহনশীলতা, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং সামাজিক নিরাপত্তার অন্যতম ভিত্তি। একটি সংযুক্ত বিশ্বে টেকসই ও নির্ভরযোগ্য ডিজিটাল অবকাঠামো গড়ে তোলার মাধ্যমে আমরা সংকট মোকাবিলা, উদ্ভাবন এবং সবার জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন নিশ্চিত করতে পারি।
প্রসঙ্গত ১৮৬৫ সালের ১৭ মে আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠা এবং প্রথম আন্তর্জাতিক টেলিগ্রাফ সম্মেলন অনুষ্ঠানের নিদর্শনস্বরূপ ১৯৬৯ সালের ১৭ মে থেকে প্রতিবছর বিশ্ব টেলিযোগাযোগ দিবস পালিত হয়ে আসছে। পরবর্তী সময়ে ২০০৬ সালের নভেম্বরে আইটিইউ সম্মেলনে ১৭ মে বিশ্ব টেলিযোগাযোগ এবং তথ্য সংঘ দিবস পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
সময়ের আলো/জেডি