আসছে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সাধারণ মানুষের জন্য কিছুটা স্বস্তির বার্তা দিতে যাচ্ছে সরকার। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারের প্রথম বাজেটে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে কর ছাড়ের বড় উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
বৈশ্বিক অর্থনৈতিক টানাপোড়েন ও দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতির চাপের মধ্যে জনগণের ক্রয়ক্ষমতা ধরে রাখতে চাল, ডাল, তেল, চিনি, ময়দা, পেঁয়াজ, পাকা ধান, গম, আলুসহ বিভিন্ন মসলাজাতীয় পণ্যের ওপর বিদ্যমান ১ শতাংশ উৎসে কর প্রত্যাহারের পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার।
একই সঙ্গে নিত্যপণ্যের ওপর আরোপিত ১ শতাংশ টার্নওভার করও কমিয়ে যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনার চিন্তা চলছে।
আগামী ১১ জুন জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট উপস্থাপন করা হবে। প্রস্তাবিত বাজেটের আকার ধরা হচ্ছে ৯ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হচ্ছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা।
সরকারের নীতিনির্ধারকরা বলছেন, এবারের বাজেটের মূল অগ্রাধিকার থাকবে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি। তবে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা ও ভূরাজনৈতিক সংকটের কারণে মূল্যস্ফীতি ও জিডিপি প্রবৃদ্ধির ওপর নেতিবাচক চাপ অব্যাহত থাকতে পারে।
নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে কর ছাড়ের মাধ্যমে জনগণকে স্বস্তি দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হলেও বিলাসবহুল পণ্যের ক্ষেত্রে উল্টো কঠোর অবস্থানে যাচ্ছে সরকার। বিলাসবহুল গাড়ি, প্রাইভেট কার, জিপ, হেলিকপ্টার ও বিমানের ওপর বাড়তি আয়কর আরোপের প্রস্তাব থাকছে বাজেটে।
পাশাপাশি আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স নবায়ন ফি দ্বিগুণ করারও পরিকল্পনা রয়েছে। বিশেষ করে পিস্তল, রিভলভার ও শর্টগানের মালিকদের বাড়তি করের আওতায় আনা হতে পারে।
চিকিৎসা খাতে কিছু স্বস্তির উদ্যোগও থাকছে। হার্টের রিং ও ডায়ালাইসিস টিউবসহ বিভিন্ন চিকিৎসা সরঞ্জামের ওপর শুল্ক কমানোর পরিকল্পনা করেছে সরকার। অন্যদিকে তামাকবিরোধী আন্দোলনের দাবির প্রেক্ষিতে তামাকপণ্যের ওপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের চিন্তা করা হচ্ছে। শলাকা অনুযায়ী করহার নির্ধারণের সম্ভাবনাও রয়েছে।
আসন্ন বাজেটে ব্যক্তিশ্রেণির করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানো হচ্ছে না। অন্তর্বর্তী সরকারের নির্ধারণ করে যাওয়া কাঠামো অনুযায়ী আগামী দুই অর্থবছরে করমুক্ত আয়সীমা ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকাই থাকছে। তবে কর কাঠামোয় কিছু পরিবর্তন আনা হচ্ছে।
আগে যেখানে সাতটি স্ল্যাবে আয়কর দিতে হতো, সেখানে আগামী বাজেটে ছয়টি স্ল্যাব নির্ধারণ করা হতে পারে। একই সঙ্গে প্রতিটি স্তরে করহার ৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব রয়েছে বলে জানা গেছে। ফলে নিম্ন-মধ্যবিত্ত থেকে উচ্চ আয়ের মানুষ- সব শ্রেণির করদাতাকেই বাড়তি করের চাপ বহন করতে হতে পারে।
এবারের বাজেটে সম্পদ করেও বড় পরিবর্তনের আভাস পাওয়া গেছে। বিদ্যমান সারচার্জ ব্যবস্থার পরিবর্তে ‘সম্পদ কর’ আরোপের পরিকল্পনা করছে সরকার। দলিল মূল্যের পরিবর্তে জমির বাজারমূল্য বা মৌজা মূল্যের ভিত্তিতে কর নির্ধারণ করা হতে পারে। রাজধানীর গুলশান, বনানী, ধানমন্ডি, বারিধারাসহ অভিজাত এলাকা এবং চট্টগ্রামের খুলশী, আগ্রাবাদসহ বিভাগীয় শহরগুলোর ধনী শ্রেণিকে এই করের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রথমবারের মতো ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাকে করের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। ইউনিয়ন পর্যায়ের অটোরিকশার জন্য ১ হাজার টাকা, পৌরসভা এলাকায় ২ হাজার টাকা এবং সিটি করপোরেশন এলাকায় ৫ হাজার টাকা অগ্রিম আয়কর নির্ধারণের প্রস্তাব রয়েছে। শুধু ঢাকা শহরেই প্রায় ১০ লাখ অটোরিকশা চলাচল করছে বলে সরকারি হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, লাইসেন্স ও নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা এসব অটোরিকশাকে নিয়ন্ত্রণে আনতেই কর কাঠামোর আওতায় আনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সড়ক পরিবহন বিভাগ ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুপারিশের ভিত্তিতে অর্থ মন্ত্রণালয় এ প্রস্তাবে সম্মতি দিয়েছে।
মোটরসাইকেলের ক্ষেত্রেও নতুন কর আরোপের পরিকল্পনা রয়েছে। ১১০ সিসির বেশি ক্ষমতাসম্পন্ন মোটরসাইকেলের ওপর অগ্রিম আয়কর ধার্য করা হচ্ছে। ১১১ থেকে ১২৫ সিসির মোটরসাইকেলে ২ হাজার টাকা, ১২৬ থেকে ১৬৫ সিসিতে ৫ হাজার টাকা এবং ১৬৫ সিসির বেশি মোটরসাইকেলে ১০ হাজার টাকা কর দিতে হবে।
এ ছাড়া ব্যাংক হিসাব খোলার ক্ষেত্রেও নতুন শর্ত আরোপের চিন্তা করছে সরকার। কোনো গ্রাহক নতুন ব্যাংক হিসাব খুলতে চাইলে তাকে ভ্যাট নিবন্ধন নম্বর বা ভ্যাট রেজিস্ট্রেশন বাধ্যতামূলকভাবে জমা দিতে হতে পারে।
সব মিলিয়ে আসন্ন বাজেটে একদিকে যেমন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে কর ছাড় দিয়ে সাধারণ মানুষের ব্যয় কমানোর চেষ্টা থাকবে, অন্যদিকে বিলাসী ভোগ, সম্পদ ও অনিয়ন্ত্রিত খাতগুলোকে করের আওতায় এনে রাজস্ব বাড়ানোর কৌশল নিয়েছে সরকার।
সময়ের আলো/জেডি