রোডশোর নামে অর্থ অপচয় সমর্থনযোগ্য নয়

নিজস্ব প্রতিবেদক

অর্থনীতি

আওয়ামী শাসনামলে বিদেশে রোডশোর নামে আমলা ও রাজনৈতিক ব্যক্তিদের নিয়ে আনন্দভ্রমণ ও অর্থ অপচয়ের তীব্র সমালোচনা করেছেন সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ

2026-07-19T04:07:45+00:00
2026-07-19T04:07:45+00:00
 
  রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬,
৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
অর্থনীতি
রোডশোর নামে অর্থ অপচয় সমর্থনযোগ্য নয়
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: রোববার, ১৯ জুলাই, ২০২৬, ৪:০৭ এএম 
ছবি : সংগৃহীত
আওয়ামী শাসনামলে বিদেশে রোডশোর নামে আমলা ও রাজনৈতিক ব্যক্তিদের নিয়ে আনন্দভ্রমণ ও অর্থ অপচয়ের তীব্র সমালোচনা করেছেন সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) নবনিযুক্ত চেয়ারম্যান। 

এই ধরনের প্রদর্শনীমূলক আয়োজনের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, দেশের পুঁজিবাজারকে যদি একটি সত্যিকার অর্থেই আকর্ষণীয় বিনিয়োগ গন্তব্যে পরিণত করা যায়, তবে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা নিজ উদ্যোগেই এখানে আসবেন। এর জন্য আলাদা করে কোনো রোডশোর প্রয়োজন নেই। পুঁজিবাজারে সুশাসন ও সুসমন্বয় নিশ্চিত করার মাধ্যমে বিদেশি বিনিয়োগের খরা দূর করা সম্ভব বলে তিনি মনে করেন। 

শনিবার বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশনে (এফডিসি) ডিবেট ফর ডেমোক্রেসি আয়োজিত ‘পুঁজিবাজারে আস্থার সংকট নিরসনে করণীয়’ শীর্ষক ছায়া সংসদ অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ডিবেট ফর ডেমোক্রেসির চেয়ারম্যান হাসান আহমেদ চৌধুরী। প্রতিযোগিতায় সরকারি দল হিসেবে প্রাইম ইউনিভার্সিটি এবং বিরোধী দল হিসেবে সোনারগাঁও ইউনিভার্সিটির বিতার্কিকরা অংশগ্রহণ করেন।

পুঁজিবাজারের বর্তমান নাজুক পরিস্থিতিতে পেশাগত দায়বদ্ধতা এবং বর্তমান সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে পূর্ণ স্বাধীনতার আশ্বাসে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন- এমনটা জানিয়ে বিএসইসি চেয়ারম্যান বলেন, পুঁজিবাজারে সুশাসন ফেরাতে কোনো ধরনের রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বা চাপ প্রয়োগ করা হবে না- প্রধানমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রীর কাছ থেকে এমন আশ্বাস পেয়েছি।

পুঁজিবাজারের বর্তমান আস্থাহীনতার পেছনে বিগত চার দশকেরও বেশি সময় ধরে চলে আসা কিছু কাঠামোগত দুর্বলতা এবং ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের অজ্ঞতাকে দায়ী করেন চেয়ারম্যান। তিনি বলেন, চিকিৎসকের অ্যানালাইসিস কিংবা প্রকৌশলীর নকশার মতো শেয়ার ভ্যালুয়েশন বা মূল্যায়নও একটি নিখাদ বিজ্ঞান ও শিল্প। কিন্তু দুঃখজনকভাবে বাংলাদেশের সিংহভাগ সাধারণ বিনিয়োগকারী শেয়ারের প্রকৃত মূল্যায়ন না বুঝেই গুজবের ওপর ভিত্তি করে বিনিয়োগ করেন। এই সুযোগে কারসাজি চক্র বাজারে সক্রিয় হয়ে ওঠে। বিশেষ করে স্বল্প মূলধনী বা স্মল ক্যাপ কোম্পানির শেয়ারে তারা কৃত্রিমভাবে দর বৃদ্ধি ও সার্কুলার ট্রেডিংয়ের মাধ্যমে পাম্প অ্যান্ড ডাম্প করে। আর ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা ‘হার্ডিং ইফেক্ট’ বা ভেড়ার পালের মতো অন্ধের মতো সেই ফাঁদে পা দিয়ে সর্বস্বান্ত হন।

ভারতে শক্তিশালী পুঁজিবাজারের পেছনে মিউচুয়াল ফান্ডের গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, ভারতে জিডিপির তুলনায় মার্কেট ক্যাপিটালাইজেশন ১৩০ শতাংশ, যেখানে বাংলাদেশের মাত্র ৬ শতাংশ। ভারতে মুদির দোকানদার পর্যন্ত মিউচুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগ করে, কারণ সেখানে প্রফেশনাল ফান্ড ম্যানেজাররা শেয়ারের প্রকৃত মূল্য নির্ধারণ করে সাধারণ মানুষের অর্থ খাটিয়ে নিরাপদ রিটার্ন নিশ্চিত করে। বাংলাদেশে অতীতে রেস বা এলআর গ্লোবালের মতো ফান্ডগুলো ভালো শুরু করলেও পরবর্তীতে লোভ ও লালসার কারণে সাধারণ মানুষ মিউচুয়াল ফান্ডের ওপর থেকে আস্থা হারিয়ে ফেলে। তবে এই পরিস্থিতির পরিবর্তন করতে এবার প্রতিটি মিউচুয়াল ফান্ডের নেট অ্যাসেট ভ্যালু (এনএভি) এবং তাদের পারফরম্যান্স কঠোরভাবে তদারকি করা হবে।

 এ ছাড়া দেশের বৃহৎ প্রভিডেন্ট ফান্ড ও পেনশন ফান্ডগুলোকে শুধু সঞ্চয়পত্র বা ট্রেজারি বন্ডে আটকে না রেখে প্রফেশনাল ফান্ড ম্যানেজারের মাধ্যমে বন্ড মার্কেট ও ক্রমান্বয়ে পুঁজিবাজারে নিয়ে আসার পরিকল্পনা রয়েছে। ব্যাংকের বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও পেশাদার ফান্ড ম্যানেজারদের যুক্ত করার পরামর্শ দেন তিনি।

মার্জিন রুল এবং ব্রোকারেজ হাউসগুলোর অনিয়ম নিয়েও কড়া হুঁশিয়ারি দেন বিএসইসি চেয়ারম্যান। তিনি জানান, দেশের প্রায় ৪০০ ব্রোকারের বড় অংশই বর্তমান মার্জিন রুল লঙ্ঘন করছে, কারণ আগের নিয়মটি বাস্তবসম্মত ছিল না। এ নিয়ে অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনার পর একটি খসড়া তৈরি করা হলেও তা আগেই লিক হয়ে বাজারে গুজব ছড়ায়, যার ফলে বাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। 

ব্রোকারেজ হাউসে বিনিয়োগকারীদের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বর্তমানে প্রচলিত গ্রাহকদের কাছ থেকে আগেভাগেই ফাঁকা কাগজে সই বা ‘রেড সিগনেচার’ নেওয়ার পদ্ধতি পুরোপুরি বন্ধ করা হবে। জালিয়াতি রোধে লেনদেনের দিন শেষেই ইমেইল, এসএমএস এবং সিডিবিএল ট্র্যাকিংয়ের মাধ্যমে কনফার্মেশন বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। 

একই সঙ্গে যেসব ব্রোকারেজ হাউসে বছরের পর বছর অডিট হয় না, বিশেষ করে ছোট ছোট হাউসগুলো, সেগুলোতে নিয়মিত এবং ঘনঘন অডিট পরিচালনা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মিউচুয়াল ফান্ডের এনএভি ২৫ শতাংশ কমে গেলে লিকুইডেশনের যে গুজব ছড়ানো হয়েছে, তা নাকচ করে দিয়ে তিনি স্পষ্ট করেন যে, এমন পরিস্থিতিতে ট্রাস্টিরা ইউনিট হোল্ডারদের সভা ডাকবেন এবং ৭৫ শতাংশ সদস্যের ভোটের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত হবে যে ফান্ডটি বন্ধ হবে নাকি সাইন্টিফিক উপায়ে ‘ওপেন এন্ডেড’ করা হবে।

পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তির প্রক্রিয়া সহজ করতে এবং বাজারের গভীরতা বাড়াতে ‘ডাইরেক্ট লিস্টিং’ বা সরাসরি তালিকাভুক্তির ওপর জোর দেওয়া হবে বলে জানান নতুন চেয়ারম্যান। প্রথাগত আইপিও আবেদনের পর এক বস্তা কাগজ জমা দেওয়া এবং বছরের পর বছর ধরে প্রশ্নোত্তরের নামে সময়ক্ষেপণ করার আমলাতান্ত্রিক জটিলতার অবসান ঘটানো হবে। বিকাশ কিংবা বড় কোনো প্রতিষ্ঠিত ব্যাংকের মতো সলিড কোম্পানিগুলোর জন্য আর ফিন্যান্সিয়াল স্টেটমেন্টের দীর্ঘ যাচাই-বাছাইয়ের প্রয়োজন নেই, তারা সরাসরি বাজারে এসে এক মাসের মধ্যে ১০ থেকে ২০ শতাংশ শেয়ার বিক্রি করে তালিকাভুক্ত হতে পারবে। 

রাজনৈতিক সদিচ্ছার ধারাবাহিকতায় এবারের বাজেটে ইন্টার-কোম্পানি ডিভিডেন্ডের ওপর থেকে দ্বৈত কর প্রত্যাহারের মতো পুঁজিবাজারবান্ধব সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন সম্ভব হয়েছে। এ ছাড়া বর্তমানে দেশের বন্ড মার্কেটে ১২ শতাংশের বেশি রিস্ক-ফ্রি রিটার্ন থাকা সত্ত্বেও কমিশনের নতুন পদক্ষেপে বিনিয়োগকারীদের আস্থার কারণে বাজারে দৈনিক টার্নওভার ১৪০০ থেকে ১৫০০ কোটি টাকায় ধরে রাখা সম্ভব হয়েছে, যা ডে-নেটিং এবং প্লাস-ওয়ান ট্রেডিং চালুর মাধ্যমে দুই হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ না করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে বিএসইসি চেয়ারম্যান বলেন, লিস্টিং বা তালিকাভুক্তির কাজ সম্পূর্ণ ডিএসইর। তবে তারা দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে কমিশন অত্যন্ত কঠোর অবস্থান নেবে। 

ডিএসইর বর্তমান ম্যানুয়াল ও দুর্বল সার্ভেলেন্স সিস্টেমকে আধুনিকায়ন করে আগামী এক বছরের মধ্যে সম্পূর্ণ এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যাতে কোনো শেয়ারের অস্বাভাবিক দর বৃদ্ধি হলে মানুষের হস্তক্ষেপ ছাড়াই স্বয়ংক্রিয়ভাবে ট্রেডিং হল্ট হয়ে যায়। উন্নত বিশ্বের মতো তিন স্তরের এই হল্ট ব্যবস্থার মাধ্যমে কারসাজি চক্রকে থামানো হবে। বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর পুঁজিবাজারে আসার অনীহার কারণ হিসেবে তাদের নিজস্ব গোপন রেসিপি প্রকাশ না করা এবং স্বাধীন পরিচালকদের মান নিয়ে সংশয়কে দায়ী করে তিনি আশ্বস্ত করেন যে, নতুন কিছু কার্যকর পদক্ষেপের মাধ্যমে শিগগিরই এই বড় কোম্পানিগুলোকে বাজারে আনা হবে। 

এ ছাড়া ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মার্জার বা একীভূতকরণের ফলে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের যে ক্ষতি হচ্ছে, তা কাটিয়ে উঠতে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী ফরেনসিক অডিটের মাধ্যমে সম্পদের সঠিক মূল্যায়ন নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে সমন্বয় করে সরকার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে। ব্যক্তিগত কোনো স্বার্থে নয়, বরং সমষ্টিগত স্বার্থে সব ধরনের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে দেশের পুঁজিবাজারকে একটি টেকসই ও শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে যেতে বর্তমান কমিশন বদ্ধপরিকর।

সময়ের আলো/এসএকে


  বিষয়:   রোডশো  অর্থ অপচয়  সমর্থনযোগ্য নয়  সময়ের আলো 


Loading...
Loading...
অর্থনীতি- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: