নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে সরকার। চলছে শেষ সময়ের তোড়জোড়। মন্ত্রিসভার অনুমোদনের পর আগামী মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহেই পে-স্কেলের গেজেট প্রকাশ হতে পারে। সবরকম প্রস্তুতি প্রায় শেষ পর্যায়ে। যদিও নতুন এই বেতন কাঠামো কার্যকর ধরা হবে চলতি জুলাই মাসের ১ তারিখ থেকেই। জাতীয় বেতন কমিশন-২০২৫-এর সুপারিশ প্রণয়ন কমিটির সর্বশেষ বৈঠকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে নতুন পে-স্কেলের ধাপগুলো নির্ধারণ করবে মন্ত্রিসভা। অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
জানা গেছে, নতুন বেতন কাঠামোর প্রস্তাবটি মন্ত্রিসভায় ওঠার আগে সচিব কমিটি আগামী দুই থেকে তিন দিনের মধ্যে পে-স্কেলের কারিগরি বিষয়গুলো পর্যালোচনা করবে। এর পর চলতি মাসের শেষ সপ্তাহে অথবা আগামী মাসের প্রথম সপ্তাহে নতুন পে-স্কেলের বিষয়টি মন্ত্রিসভায় উপস্থাপন করা হতে পারে। সেখানে বাস্তবায়নের ধাপসহ এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের পর প্রস্তাবটি ভেটিংয়ের জন্য যাবে আইন মন্ত্রণালয়ে।
এরপর প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন-সাপেক্ষে গেজেট প্রকাশ করা হবে। মূলত এরপর বাস্তবায়ন হবে নতুন বেতন কাঠামো। তবে এটি কার্যকর হবে ১ জুলাই থেকে। অবশ্য নতুন বেতন কাঠামোতে শুধু মূল বেতন বাড়ছে তা নয়, এর সঙ্গে বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, শিক্ষা, যাতায়াত ভাতাসহ বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধাও পুনর্বিন্যাসের সুপারিশ করা হয়েছে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট খসড়া বিধি ও এসআরও প্রস্তুতের কাজ শুরু করেছে অর্থ বিভাগ।
অবশ্য শুরুতে তিন ধাপে ও পরে দুই ধাপে পে-স্কেলে বাস্তবায়নের প্রস্তাব ছিল। তবে সুপারিশ প্রণয়ন কমিটি এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত না দিয়ে সেটি মন্ত্রিসভার ওপর ছেড়ে দিয়েছে। বর্তমান বেতন স্কেল অনুযায়ী সর্বনিম্ন ২০তম গ্রেডের মূল বেতন হচ্ছে ৮ হাজার ২৫০ টাকা, নবম পে-স্কেলে সুপারিশ করা হয়েছে সর্বনিম্ন বেতন ২০ হাজার টাকা।
সর্বোচ্চ স্কেলে বর্তমান বেতন কাঠামো অনুযায়ী মূল বেতন রয়েছে ৭৮ হাজার টাকা, নবম পে-স্কেলে সেটি ধরা হয়েছে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা। প্রায় একই হারে অন্যান্য গ্রেডেও বেতন বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। গ্রেড ১ থেকে ৯ পর্যন্ত গড়ে ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ বেতন বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। আর গ্রেড ১০ থেকে ২০ পর্যন্ত ৯০ থেকে ১০০ শতাংশ বেতন বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।
বর্তমানে প্রায় ১৪ লাখ সরকারি চাকরিজীবী রয়েছেন এবং ৯ লাখের মতো পেনশনভোগী রয়েছেন। বেতন-ভাতা ও পেনশন বাবদ বর্তমানে সরকারের বার্ষিক ব্যায় হয় ১ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা। আর নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন করতে সরকারের বাড়তি আরো ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা দরকার পড়বে।
এদিকে নবম জাতীয় পে-স্কেল বাস্তবায়নের লক্ষ্যে গঠিত সচিব কমিটির সর্বশেষ বৈঠকে নতুন বেতন কাঠামো নিয়ে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনা হয়। গত ৬ জুলাই অনুষ্ঠিত বৈঠকে বেতন বৃদ্ধি, বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া, ভাতা কাঠামো এবং পরবর্তী প্রশাসনিক পদক্ষেপ নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
ওই বৈঠক সূত্রে জানা যায়, সব গ্রেডে সমান হারে বেতন বাড়বে না। নিম্ন গ্রেডের সরকারি কর্মচারীদের মূল বেতন তুলনামূলক বেশি বাড়ানোর সুপারিশ করা হচ্ছে। কমিশনের আগের প্রস্তাব অনুযায়ী মূল বেতন সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে- এ বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। এ ছাড়া ভাতা ও অন্যান্য সুবিধা বাস্তবায়নের জন্য একাধিক বিধিবদ্ধ নিয়ন্ত্রক আদেশ (এসআরও) জারির বিষয়েও বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, পে-স্কেল বাস্তবায়নে তাড়াহুড়া করা হবে না। প্রতিটি প্রস্তাবের আর্থিক প্রভাব, প্রশাসনিক সক্ষমতা ও আইনগত দিক যাচাই করেই চূড়ান্ত সুপারিশ তৈরি করা হবে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বেসামরিক সরকারি কর্মচারীদের পাশাপাশি বিচার বিভাগ ও সশস্ত্র বাহিনীর জন্যও পৃথক প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে।
এ ছাড়া গত বুধবার সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনির সভাপতিত্বে বেতন কমিশনের সুপারিশ পর্যালোচনা কমিটির ষষ্ঠ সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় নবম জাতীয় বেতন কমিশনের বিভিন্ন সুপারিশ পর্যালোচনার পাশাপাশি অষ্টম বেতন কাঠামোর বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা ও ত্রুটি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়।
সভায় অংশ নেওয়া পর্যালোচনা কমিটির এক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, নতুন বেতন কাঠামো নিয়ে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে যেন কোনো ধরনের অসন্তোষ বা বৈষম্যের অভিযোগ না ওঠে, সে বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। এ কারণে প্রতিটি সুপারিশ খুঁটিয়ে পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, ২০১৫ সালের অষ্টম বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের পর সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকসহ বিভিন্ন শ্রেণির চাকরিজীবীদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিয়েছিল। এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বেতন বৃদ্ধির বিষয়েও তখন স্পষ্ট নির্দেশনা ছিল না। এসব অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়েই এবার আরও সতর্কতার সঙ্গে কাজ করছে কমিটি।
পর্যালোচনা কমিটির সূত্র জানায়, সদস্যরা নীতিগতভাবে ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে নতুন মূল বেতন এবং ২০২৭ সালের ১ জুলাই থেকে বিভিন্ন ভাতা কার্যকর করার বিষয়ে একমত হয়েছেন। তবে এই সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত না করে মন্ত্রিসভার অনুমোদনের জন্য পাঠানো হবে।
কমিটিতে সরকারি চাকরিজীবীদের মূল বেতন সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। একই সঙ্গে সব গ্রেডে সমান হারে বেতন না বাড়িয়ে নিম্ন গ্রেডের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের তুলনামূলক বেশি সুবিধা দেওয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন অধিকাংশ সদস্য। এ ছাড়া বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, যাতায়াতসহ বিভিন্ন ভাতা পুনর্বিন্যাসের বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। তবে মূল বেতন ও ভাতা একসঙ্গে কার্যকর হবে, নাকি ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত মন্ত্রিসভা নেবে।
উল্লেখ্য, সাবেক অর্থ সচিব জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বাধীন ২৩ সদস্যের বেতন কমিশন চলতি বছরের ২১ জানুয়ারি তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে বেতন ভাতা বৃদ্ধির সুপারিশ সংবলিত প্রতিবেদন জমা দেয়। তখন প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং জানায়, ১৪ লাখ সরকারি কর্মচারী ও ৯ লাখ পেনশনভোগীর জন্য সরকারের বর্তমান ব্যয় ১ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা।
কমিশনের প্রস্তাব বাস্তবায়নে প্রয়োজন হতে পারে আরও ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা। বেসামরিক কর্মচারীদের পাশাপাশি জুডিশিয়াল সার্ভিস পে-কমিশন ও সশস্ত্র বাহিনীর জন্যও বেতন কমিটির প্রতিবেদন প্রস্তুত হয়েছে। তিনটি প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে বাস্তবায়নের সুপারিশ তৈরির জন্য বিএনপি সরকার গত মাসে মন্ত্রিপরিষদ সচিবের নেতৃত্বে ১০ সদস্যের উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করে।
নতুন বেতন কাঠামোতে সর্বনিম্ন বেতন ২০ হাজার, সর্বোচ্চ ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়। প্রস্তাবিত কাঠামোয় ১০০ থেকে ১৪০ শতাংশ পর্যন্ত বেতন বৃদ্ধির সুপারিশ রয়েছে। তবে গ্রেড রাখা হয়েছে আগের মতো ২০টি। সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ বেতনের অনুপাত ১:৮, যা আগে ছিল ১:৯ দশমিক ৪। সর্বনিম্ন বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
নতুন বেতন কাঠামোতে সর্বনিম্ন বেতন ২০ হাজার, সর্বোচ্চ ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়। প্রস্তাবিত কাঠামোয় ১০০ থেকে ১৪০ শতাংশ পর্যন্ত বেতন বৃদ্ধির সুপারিশ রয়েছে। তবে গ্রেড রাখা হয়েছে আগের মতো ২০টি। সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ বেতনের অনুপাত ১:৮, যা আগে ছিল ১:৯ দশমিক ৪। সর্বনিম্ন বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
ভাতায়ও বড় পরিবর্তন হবে : এদিকে নতুন পে-স্কেলে বৈশাখী ভাতা ২০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৫০ শতাংশের সুপারিশ করা হয়েছে। টিফিন ভাতা ২০০ থেকে ১ হাজার টাকা। শিক্ষা ভাতা প্রতি সন্তান ৫০০ টাকা থেকে ১ হাজার টাকা, সর্বোচ্চ ২ সন্তান। এসব প্রস্তাব এখনও প্রস্তাবিত তালিকা। অর্থ মন্ত্রণালয়ের চূড়ান্ত প্রজ্ঞাপন বের হলে সেটাই চূড়ান্ত।
উল্লেখ্য স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালে দেশে প্রথম জাতীয় বেতন স্কেল চালু হয়। এরপর ২০১৫ সাল পর্যন্ত মোট আটবার নতুন পে-স্কেল ঘোষণা করা হয়েছে। প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী প্রতি পাঁচ বছর পরপর নতুন বেতন কাঠামো হওয়ার কথা থাকলেও করোনা মহামারি, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকট ও রাজস্ব চাপে সেই প্রক্রিয়া পিছিয়ে যায়।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/কেএইচও