উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং ব্যাংকিং খাতে তীব্র অস্থিরতার জাঁতাকলে পড়েছে বাংলাদেশের অর্থনীতি, এমন সতর্কবার্তা দিয়ে ঢাকা সফর শেষ করেছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) প্রতিনিধিদল।
বাংলাদেশ সরকারের অনুরোধে নতুন একটি অর্থনৈতিক সংস্কার কর্মসূচি নিয়ে আলোচনার লক্ষ্যে গত রবিবার থেকে বৃহস্পতিবার ঢাকা সফর করে প্রতিনিধিদল। আইএমএফ কর্মকর্তা ইভো ক্রজনার-এর নেতৃত্বে প্রতিনিধিদলটি সফরকালে দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে। আইএমএফ জানিয়েছে, আগামী মাসগুলোতে এই নতুন কর্মসূচির সম্ভাব্য রূপরেখা, যার মধ্যে ঋণের আকার এবং এর সাথে সংশ্লিষ্ট সংস্কারের প্রতিশ্রুতি অন্তর্ভুক্ত থাকবে, তা নিয়ে সরকারের সাথে আরও বিস্তারিত আলোচনা করা হবে।
আইএমএফ-এর বিবৃতিতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ বর্তমানে বড় ধরনের রাজস্ব ঘাটতি, আর্থিক খাতের দুর্বলতা এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতিজনিত চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধের কারণে এই সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে। বিশ্ববাজারে পণ্যের উচ্চ মূল্য এবং সরবরাহ ব্যবস্থার বিঘ্ন ঘটায় দেশে মূল্যস্ফীতির চাপ নতুন করে বৃদ্ধি পেয়েছে এবং ভতুর্কি ব্যয় বেড়েছে, যা সরকারের সীমিত রাজস্ব সক্ষমতার ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে। এছাড়া রেমিট্যান্সের উচ্চ প্রবৃদ্ধি বজায় থাকা সত্ত্বেও আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় বৈদেশিক লেনদেনে চাপ তৈরি হয়েছে এবং ব্যাংকিং খাতের অস্থিরতা এখনও অত্যন্ত উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে।
রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি এবং ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা দূরীকরণে যদি চূড়ান্ত কোনো সংস্কার পদক্ষেপ গ্রহণ করা না হয়, তবে মধ্যমেয়াদে প্রবৃদ্ধি আরও কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। আইএমএফ-এর প্রাক্কলন অনুযায়ী, ২০২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমে ৩.৫ শতাংশে নেমে আসতে পারে এবং মধ্যমেয়াদে তা ৩ শতাংশের নিচে চলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সংস্থাটি সতর্ক করেছে যে, ব্যাংকিং খাতের অস্থিরতা, রাজস্ব ঘাটতি এবং বাহ্যিক চাপের কারণে দেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনার ক্ষেত্রে ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।
দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় আইএমএফ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারের সুপারিশ করেছে। তারা জানিয়েছে, সামাজিক নিরাপত্তা এবং উন্নয়নমূলক খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর জন্য রাজস্ব সংগ্রহ বৃদ্ধি ও ভর্তুকি যৌক্তিকীকরণ করা প্রয়োজন। পাশাপাশি, সংস্কারের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোকে সুনির্দিষ্ট সামাজিক সহায়তার আওতায় আনতে হবে। মূল্যস্ফীতি হ্রাস এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ পুনর্গঠনের জন্য কঠোর সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি ও বিচক্ষণ রাজস্ব নীতি বজায় রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া, বৈদেশিক খাতের স্থিতিশীলতা রক্ষা ও বিনিময় হারের নমনীয়তা বাড়াতে ২০২৫ সালে গৃহীত ‘ক্রলিং পেগ’ ব্যবস্থার ধারাবাহিক বাস্তবায়ন এবং ব্যাংকিং খাতের খেলাপি ঋণ ও অন্যান্য দুর্বলতা দূর করতে একটি বিশ্বাসযোগ্য ও সমন্বিত কৌশল গ্রহণের তাগিদ দেওয়া হয়েছে।
সফর শেষে প্রতিনিধিদলের প্রধান ইভো ক্রজনার আশা প্রকাশ করেন, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে আইএমএফ-এর এই সহযোগিতা আগামীতেও অব্যাহত থাকবে।
সময়ের আলো/জেডআই