দেশের রফতানিতে অবদান বাড়ছে বেপজার। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা ও দেশের সামগ্রিক রফতানি হ্রাসের চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বেশ সাফল্য অর্জন করেছে বাংলাদেশ রফতানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা কর্তৃপক্ষ (বেপজা)। সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরে দেশের মোট রফতানিতে বেপজা ১৭ দশমিক ৫১ শতাংশ অবদান রাখার পাশাপাশি নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে রেকর্ড গড়েছে। বেপজা সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের সামগ্রিক রফতানি কিছুটা হ্রাস পেলেও বেপজাধীন জোনগুলো রফতানি প্রবৃদ্ধির ইতিবাচক ধারা বজায় রেখেছে। আলোচিত অর্থবছরে দেশের মোট রফতানি আয় হয়েছে ৪৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যার মধ্যে বেপজাধীন জোনগুলো থেকেই রফতানি হয়েছে ৮ দশমিক ৪১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার সমমূল্যের পণ্য, যা দেশের মোট রফতানির ১৭ দশমিক ৫১ শতাংশ।
উল্লেখ্য, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশের মোট রফতানি ছিল ৪৮ দশমিক ২৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং বেপজার পরিমাণ ছিল ৮ দশমিক ২২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। সেই তুলনায় ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের সামগ্রিক রফতানি যেখানে শূন্য দশমিক ৫৮ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে, সেখানে বেপজার রফতানি ২ দশমিক ২০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
এদিকে বিনিয়োগকারীদের দ্রুত ও সহজে বিনিয়োগ সেবা প্রদান এবং সুষ্ঠু ব্যবসায়িক পরিবেশ নিশ্চিত করায় ২০২৫-২৬ অর্থবছরে নতুন বিনিয়োগ প্রস্তাব ও লিজ চুক্তি স্বাক্ষরের ক্ষেত্রে এক অভূতপূর্ব মাইলফলক স্পর্শ করেছে বেপজা। সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরে চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সামোয়া ও বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের মোট ৩৬টি প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগের লক্ষ্যে বেপজার সঙ্গে লিজ চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। এই প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রস্তাবিত বিনিয়োগের পরিমাণ ৭১৭ দশমিক ৭১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা বেপজার ইতিহাসে একক অর্থবছরে সর্বোচ্চ বিনিয়োগ প্রস্তাব। নতুন চুক্তিবদ্ধ এ প্রতিষ্ঠানগুলো সম্পূর্ণ উৎপাদনে গেলে জোনগুলোতে ৭৫ হাজার ৭৪৪ জন বাংলাদেশি নাগরিকের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
নতুন শিল্প-প্রতিষ্ঠানগুলোর অধিকাংশই প্রথাগত পণ্যের বাইরে গিয়ে বৈচিত্র্যময় পণ্য যেমন ব্যাগ ও লাগেজ, ফ্যাশন এক্সেসরিজ, টেক্সটাইল, ইলেকট্রিক্যাল ও ইলেকট্রনিক পণ্য, ব্লুটুথ হেডফোন, এয়ারপ্লেন অ্যামিনিটি ব্যাগ অ্যান্ড কিট, খেলনা ড্রোন/মাছ ধরার ড্রোন ও কম ওজনের পণ্য পরিবহনের ড্রোন, জুতা ও জুতা তৈরির এক্সেসরিজ, তাঁবু ও তাঁবু তৈরির এক্সেসরিজ, চামড়াজাত পণ্য, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং পণ্য, ক্যাম্পিং ফার্নিচার, গ্রিনহাউস হাইড্রোপনিকস টেন্ট, কৃষিজাত পণ্য ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্যসামগ্রী এবং গৃহস্থালি পণ্য উৎপাদন ও রফতানি করবে।
বিনিয়োগকারীদের আস্থা ও বেপজায় বিনিয়োগ সম্প্রসারণ : দক্ষ ব্যবস্থাপনা, জোন পরিচালনায় দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ও দ্রুত বিনিয়োগকারীদের সেবা প্রদানের বেপজা দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে আস্থার প্রতীক হয়ে উঠেছে। এখানকার অনেক বিনিয়োগকারী বেপজার প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে বিনিয়োগ সম্প্রসারণ করছেন। এর সাম্প্রতিক একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত চীনের বিখ্যাত খাইশি গ্রুপ। বেপজার সুশৃঙ্খল পরিবেশে দ্রুত উৎপাদন শুরু করতে পেরে সন্তুষ্ট হয়ে তারা তাদের প্রথম প্রতিষ্ঠান ‘খাইশি লিনজারে বাংলাদেশ’-এর ৬০ দশমিক ৮৫ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের পর গত বছরে দ্বিতীয় প্রতিষ্ঠান ‘খাইশি গার্মেন্টস বাংলাদেশ’-এর মাধ্যমে আরও ৪০ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের নতুন চুক্তি স্বাক্ষর করেছে।
প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগে (এফডিআই) জোরালো অবদান : চলতি মূলধন ব্যতিরেকে কেবল মূলধনি যন্ত্রপাতি, নির্মাণসামগ্রী এবং অন্যান্য সম্পদ বাবদ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বেপজাধীন জোনগুলোতে প্রকৃত বিনিয়োগ এসেছে ২৮৬.৪৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে (জুলাই-২৫ থেকে মার্চ-২৬ পর্যন্ত) বেপজার এফডিআই নেট ইনফ্লোর পরিমাণ ছিল ২২১ দশমিক ৫৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা উল্লিখিত সময়ে দেশের মোট এফডিআই নেট ইনফ্লোর ১৯ দশমিক ৬১ শতাংশ। এ চিত্র বিদেশি বিনিয়োগ আনয়নে বেপজার জোরালো ভূমিকার বহিঃপ্রকাশ।
কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে বেপজার উল্লেখযোগ্য ভূমিকা : দেশের বেকারত্ব দূরীকরণ ও দক্ষ জনশক্তি গঠনে বেপজা তার ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছে।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে বেপজাধীন জোনগুলোতে নতুন করে ২৫ হাজার ১৬৪ জন বাংলাদেশি নাগরিকের কর্মসংস্থান হয়েছে। ফলে জুন ২০২৫-এ যেখানে কর্মরত শ্রমিকের সংখ্যা ছিল ৫ লাখ ৩৩ হাজার ৫২৭ জন। গত ৩০ জুন শেষে তা বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৫৮ হাজার ৬৯১ জনে, যা বেপজাধীন জোনগুলোতে এ যাবতকালের মধ্যে সর্বোচ্চ।
বহুমুখী পণ্য উৎপাদন ও বৈশ্বিক বাজারে বিস্তৃতি : পণ্য বহুমুখীকরণের মাধ্যমে একক খাতের ওপর নির্ভরতা কমাতে বেপজা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। বর্তমানে চালু থাকা ৪৫১টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৩৩ শতাংশ তৈরি পোশাক, ১৮ শতাংশ গার্মেন্টস এক্সেসরিজ এবং ৮ শতাংশ টেক্সটাইল পণ্য রফতানি করছে। বাকি ৪১ শতাংশ প্রতিষ্ঠান বৈচিত্র্যময় পণ্য রফতানি করে দেশের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করছে।
এই বিস্তৃত শিল্প ভিত্তি কেবল একটি একক খাতের ওপর নির্ভরতা কমায় এবং বেপজার অধীনে পরিচালিত শিল্পাঞ্চলগুলোর টিকে থাকার ক্ষমতা ও প্রতিযোগিতার সক্ষমতাকে আরও শক্তিশালী করে। এ ছাড়া বেপজাধীন জোনগুলোতে উৎপাদিত পণ্য বিশ্বের ১২৯টি দেশে রফতানি হয়েছে, যা বেপজার সক্ষমতা ও আন্তর্জাতিক বাজারের গ্রহণযোগ্যতাকে প্রমাণ করে।
বেপজা বর্তমানে ৮টি ইপিজেড এবং বেপজা অর্থনৈতিক অঞ্চল সফলভাবে পরিচালনা করছে। জুন ২০২৬ পর্যন্ত বেপজাধীন জোনগুলোতে মোট বিনিয়োগ এসেছে ৭ দশমিক ৩৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং সর্বমোট রফতানি হয়েছে ১২৭ দশমিক ৪২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার সমমূল্যের পণ্য। বর্তমানে বেপজার অধীনে মোট শিল্প প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৫৬৬টি। এর মধ্যে ৪৫১টি প্রতিষ্ঠান সফলভাবে উৎপাদন কার্যক্রম পরিচালনা করছে এবং ১১৫টি প্রতিষ্ঠান বাস্তবায়নধীন রয়েছে।
সময়ের আলো/জেডআই