দেশের তৈরি পোশাক শিল্পের সবচেয়ে বড় একক রফতানি বাজার যুক্তরাষ্ট্রে চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসে উল্লেখযোগ্য ধাক্কা লেগেছে। এ সময়ে রফতানি আয় কমেছে ৮ শতাংশের বেশি। শুধু আয়ই নয়, কমেছে রফতানির পরিমাণ এবং পোশাকের গড় ইউনিট মূল্যও। বিপরীতে একই সময়ে কম্বোডিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও ভিয়েতনাম যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে।
উদ্যোক্তাদের মতে, চীন ও ভারতের রফতানি কমে তৈরি হওয়া সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর সুযোগ থাকলেও দেশের অভ্যন্তরীণ নানা সংকট, উচ্চ করহার এবং নীতিগত সীমাবদ্ধতার কারণে বাংলাদেশ সেই সুবিধা পুরোপুরি নিতে পারেনি।
রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছর শেষে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় একক রফতানি গন্তব্য যুক্তরাষ্ট্রে মোট রফতানি আয় ৪ শতাংশ বেড়েছে। তবে ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে মে— এই পাঁচ মাসের চিত্র ভিন্ন। এই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রফতানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৮ দশমিক ০৮ শতাংশ কমেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য দফতরের টেক্সটাইল অ্যান্ড অ্যাপারেল অফিস (অটেক্সা) প্রকাশিত সর্বশেষ তথ্য বলছে, চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশ থেকে ৩ দশমিক ২৪৫ বিলিয়ন ডলারের পোশাক রফতানি হয়েছে। যদিও এ সময়েও যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রফতানিকারক দেশের অবস্থান ধরে রেখেছে বাংলাদেশ।
একই সময়ে প্রতিযোগী দেশগুলোর মধ্যে কম্বোডিয়ার পোশাক রফতানি বেড়েছে ১৪ দশমিক ৯০ শতাংশ এবং ইন্দোনেশিয়ার বেড়েছে ৫ দশমিক ৪৯ শতাংশ।
রফতানির পরিমাণেও পিছিয়েছে বাংলাদেশ। জানুয়ারি থেকে মে সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশ থেকে ১০৮ কোটি ৫ লাখ স্কয়ার মিটার ইকুইভ্যালেন্ট (এসএমই) পোশাক রফতানি হয়েছে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৬ দশমিক ২১ শতাংশ কম। পাশাপাশি পোশাকের গড় ইউনিট মূল্য ৩ দশমিক ০৫ ডলার থেকে কমে ২ দশমিক ৯৯ ডলারে নেমে এসেছে, যা প্রায় ২ শতাংশ হ্রাস।
এনজেড অ্যাপারেলসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সালেউদ জামান খান বলেন, বাংলাদেশকে এখন চীন, ভারত ও ভিয়েতনামের মতো দেশের সঙ্গে কঠিন প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হচ্ছে।
তার ভাষ্য, এসব দেশ নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণে বিভিন্ন ধরনের কর-সুবিধা দিচ্ছে, অথচ বাংলাদেশে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও ২৭ শতাংশ কর আরোপ করা হয়েছে। এতে ভবিষ্যতে বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতা আরও কঠিন হয়ে উঠবে।
শিল্প উদ্যোক্তাদের দাবি, জ্বালানি সংকট, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং অন্যান্য অভ্যন্তরীণ সমস্যার পাশাপাশি বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতিও পোশাক খাতকে চাপে ফেলেছে। প্রয়োজনীয় নীতিসহায়তা ও প্রণোদনার অভাবে চীন থেকে সরে আসা যুক্তরাষ্ট্রের ক্রয়াদেশের বড় অংশও বাংলাদেশ নিজেদের দখলে নিতে পারেনি।
বিজিএমইএর পরিচালক ফয়সাল সামাদ বলেন, গত প্রায় ছয় মাস ধরে, বিশেষ করে ইরান যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক বাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। যদিও অনেক ক্রয়াদেশ আগের বছরই দেওয়া হয়েছিল, তারপরও অনেক ক্রেতা সেগুলোর বাস্তবায়নে কিছুটা পিছিয়ে গেছেন।
বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেমের মতে, সামান্য প্রণোদনা পেতে উদ্যোক্তাদের যে পরিমাণ প্রশাসনিক হয়রানির মুখে পড়তে হয়, তাতে এমন প্রণোদনা তুলে নেওয়াই ভালো।
তবে সব মিলিয়ে হতাশার মধ্যেও মে মাসে কিছুটা ইতিবাচক ইঙ্গিত মিলেছে। অটেক্সার তথ্য অনুযায়ী, শুধু মে মাসে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের পোশাক রফতানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৬ দশমিক ০৪ শতাংশ বেড়েছে। তবে ওই মাসেও ইউনিট মূল্য শূন্য দশমিক ৮৯ শতাংশ কমেছে।
সময়ের আলো/কেআই