সিলেট টেস্টের প্রথম দিনটি কার? স্কোরবোর্ড বলছে পাকিস্তানের। ২৭৮ রানে অলআউট হওয়া বাংলাদেশের নিশ্চয়ই নয়! তবে দিনটি যে একেবারেই স্বাগতিকদের নয়, তাও বলার সুযোগ কই। পাকিস্তানি পেসত্রয়ী খুররম শেহজাদ, হাসান আলি, মোহাম্মদ আব্বাসদের দাপুটে বোলিং স্বাগতিকদের ব্যাটিং একেবারে ধসিয়ে দিয়েছে। ১০ উইকেটের মধ্যে তিন পেসারই নিয়েছেন ৯টি। স্কোরবোর্ডও তাদের বোলিং কীর্তির সাক্ষী। তবে স্কোরবোর্ড কি পুরো ম্যাচের চিত্রকে প্রকাশ করে। ২৭৮ রানে অলআউট হওয়া দলের সদস্য লিটন দাসের অনবদ্য সেঞ্চুরি, তার ব্যাটিং সংগ্রামের গল্প কিন্তু সেখানে অনুপস্থিত। উইকেটরক্ষক-ব্যাটারের ১২৬ রানের ইনিংস ব্যাটিং ব্যর্থতার দিনে বাঁকবদলের সাক্ষী। লিটন ব্যাটিংযোদ্ধা। লিটন একাই একশ।
সিলেট টেস্টে গতকাল নিঃসন্দেহে দলের ত্রাতা লিটন। শুধু সিলেটে কেন? ক্যারিয়ারে এখন পর্যন্ত যে ৬টি সেঞ্চুরির ইনিংস খেলেছেন, সেখানে ৫টিই করেছেন দলের বিপর্যয়ে, ব্যাটিং ব্যর্থতার দিনে। এর মধ্যে সিলেট টেস্টসহ পাকিস্তানের বিপক্ষেই এমন ঘটনা তিনটি। বাকি দুটি শ্রীলঙ্কা এবং নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে। ৫৪ টেস্টের ক্যারিয়ারে ১৯টি অর্ধশত রানও আছে। ওই ইনিংসগুলোকে সেঞ্চুরির রূপ দিতে না পারলেও সেখানেও আছে দলকে টেনে তোলার গল্প। মাটি কামড়ে ক্রিজে থেকে ম্যাচ বাঁচানোর সাহসী ভূমিকা।
টেস্টে লিটনের ক্যারিয়ারসেরা ইনিংস ১৪১। মিরপুরে ২০২২ সালে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে। লিটনের ক্যারিয়ারসেরা ইনিংসের ম্যাচটি শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ১০ উইকেটের বড় ব্যবধানে হেরেছিল বাংলাদেশ। হার আরও লজ্জার হতে পারত, ইনিংস পরাজয়ের শঙ্কা ছিল। কিন্তু লিটন দাস তা হতে দেননি। ২৪ রানে ৫ উইকেট হারিয়ে যখন ধুঁকছিল তার দল; অল্পরানে অলআউটের লজ্জায় পড়তে যাচ্ছিল, তখন ত্রাতারূপে দলের হাল ধরেন লিটন।
চলমান সিরিজের আগে পাকিস্তানের মাটিতে ২০২৪ সালে সিরিজ খেলেছিল বাংলাদেশ। দুই ম্যাচের ওই সিরিজ ২-০-তে জিতে ইতিহাস গড়েছিল টাইগাররা। দুটি টেস্টই রাওয়ালপিন্ডিতে হয়েছিল। সিরিজ নির্ধারণী ম্যাচটি জিতিয়েছিল এই লিটনই। সেদিন ২৬ রানে ৬ উইকেট পড়ে গিয়েছিল, পাকিস্তান তখন ম্যাচ জেতার খুশিতে আত্মহারা, একই সঙ্গে সিরিজ বাঁচানোর। কারণ বাংলাদেশের কাছে প্রথম টেস্ট হেরে এমনতিইে বিপর্যস্ত ছিল। দ্বিতীয় ও শেষ টেস্টে তাই জয়ের বিকল্প ছিল না। কিন্তু লিটন তা হতে দেননি। ১৩৮ রানের অনবদ্য ইনিংস খেলে ম্যাচ এবং সিরিজ জেতাতে দারুণ ভূমিকা রেখেছিলেন।
টেস্টে লিটনের ফেবারিট প্রতিপক্ষের নাম জানা না গেলেও সেখানে নিশ্চয়ই পাকিস্তান এগিয়ে থাকবে। গতকাল সিলেট টেস্টে সেঞ্চুরি করেছেন এ জন্য যেমন থাকবে, বছর দুই আগে রাওয়ালপিন্ডিতে সিরিজ জেতাতে ভূমিকা রাখার কারণেও। আরও একটি কারণ এখানে যোগ করা যেতে পারে। ক্যারিয়ারের প্রথম সেঞ্চুরি এই পাকিস্তানের বিপক্ষেই করেছেন। সেটি ২০২১ সালে। যদিও চট্টগ্রামে খেলা ম্যাচটি হেরেছিল লিটনের দল। কিন্তু তার ১১৪ রানের ইনিংসে হারটা সম্মানজনক হয়েছিল। সেদিন ব্যাটিং বিপর্যয়ে পড়েছিল দল। ৪৯ রান তুলতেই হারিয়েছিল ৪ উইকেট। লিটন সেঞ্চুরি করে মান বাঁচিয়েছিলেন।
উইলোবাজিতে ঘরের মাঠে অনবদ্য লিটন বিদেশেও উজ্জ্বল। ২০২২ সালে নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চে ১০২ রানের দারুণ এক ইনিংস খেলেন। সেই ইনিংসেও ছিল লিটনের একক লড়াইয়ের বীরত্ব গাথা। দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাট করতে নেমে ধুঁকছিল বাংলাদেশ। ১২৮ রান তুলতে সেদিন হারিয়ে ফেলেছিল ৫ উইকেট। সেখান থেকে লিটন এসে ১০২ রানের ইনিংস খেলে স্কোরটা বড় করতে পারলেও দলকে জেতাতে পারেননি। তবে সব ইনিংসেই যে ম্যাচ জেতানোর কীর্তি থাকবে এমন নয়। কিছু ইনিংস থাকে যা দলকে লজ্জার হাত থেকে বাঁচানোর, ম্যাচে টিকিয়ে রাখার ঘটনাও থাকে। যেমন সিলেট টেস্টে গতকালের ইনিংস। সিলেটে গতকাল ব্যাটিং ব্যর্থতার দিনে লেজের সারির ব্যাটারদের সঙ্গী করে একাই লড়াই চালিয়েছেন লিটন। ক্যারিয়ারে এমন ঘটনা বহুবার তার ক্যারিয়ারে ঘটেছে। তাই তো দিন শেষে দিনের নায়ক সংবাদ সম্মেলনে এসে নিজের চেয়ে দলের টেল-এন্ডারদেরই প্রশংসায় ভাসালেন। লিটন বলেছেন, ‘আমাদের টেলের ব্যাটাররা কিন্তু অত ভালো ব্যাটিং করে না। তারপরও গতকাল তাইজুল, তাসকিন, শরিফুল কিন্তু অনেক বল খেলেছে। দলকে সাপোর্ট করেছে।’ আসলেই তাই। তাইজুল-তাসকিনরা উপযুক্ত সঙ্গ না দিলে লিটনের সেঞ্চুরি সম্ভব ছিল না। ‘যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চলো রে’- লিটন একলা চলতে চলতে পরিপক্ব হয়ে গেছেন। এক ঝলক গতকাল সিলেট টেস্টের প্রথম ইনিংসে সেঞ্চুরি করে দেখিয়েছেন। সামনের ইনিংস নিশ্চয়ই আরও অনেক উপহার দেবেন। লিটন যে একাই একশ।
সময়ের আলো/জেডআই