ফুটবল বিশ্বে সাধারণত ঝাঁকড়া চুল আর আক্রমণাত্মক লেফট-ব্যাকের কথা উঠলেই ব্রাজিলের মার্সেলোর নাম মনে আসে। তবে বর্তমান ফুটবলবিশ্বে একই রকম স্টাইল, অদম্য ইচ্ছা আর লড়াকু মানসিকতা নিয়ে রাজত্ব করছেন স্পেনের মার্ক কুকুরেল্লা। ইউরো ২০২৪-এর আগে যাকে নিয়ে সমালোচনা করেছিলেন খোদ ফুটবল বোদ্ধারা, তিনিই আজ স্পেনের অবিসংবাদিত ডিফেন্ডার এবং বিশ্বের অন্যতম দামি লেফট-ব্যাক।
১৯৯৮ সালের ২২ জুলাই স্পেনের কাতালুনিয়া অঞ্চলের বার্সেলোনা শহরের কাছে ‘আলেলা’ নামক একটি ছোট উপকূলীয় শহরে মার্ক কুকুরেল্লা জন্ম নেন। তার বাবা ওস্কার কুকুরেল্লা এবং মা পাত্রিসিয়া সাসেতা। ছোটবেলায় মার্ক কিন্তু সরাসরি বড় মাঠে ফুটবল খেলা শুরু করেননি। মাত্র ৪ বছর বয়সে তার ফুটবল যাত্রা শুরু হয়েছিল ইনডোর ফুটবল বা ফুটসালের মাধ্যমে। ফুটসালের ছোট জায়গায় দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং চমৎকার ড্রিবলিংয়ের যে দক্ষতা, তা তিনি একদম ছোটবেলাতেই রপ্ত করেছিলেন।
২০০৬ সালে ৮ বছর বয়সে তিনি বার্সেলোনার অন্যতম প্রধান ক্লাব এস্পানিওলের যুব একাডেমিতে যোগ দেন। এস্পানিওলের হয়ে ট্রায়াল দেওয়ার সময় ক্লাব কর্তৃপক্ষ তার প্রতিভায় মুগ্ধ হয়ে তাকে দলে নেয়। তবে এই সময় তার মা-বাবা তাকে একটি অদ্ভুত শর্ত দিয়েছিলেন। তারা বলেছিলেন, ফুটবল খেলতে হলে পড়াশোনায় ভালো করতে হবে এবং স্কুলের রেজাল্ট খারাপ হলে ফুটবল খেলা বন্ধ করে দেওয়া হবে। মা-বাবার এই শাসনের কারণে কুকুরেল্লা খেলাধুলার পাশাপাশি পড়াশোনাতেও বেশ সিরিয়াস ছিলেন।
২০২২ সালে ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের ক্লাব চেলসিতে যোগ দেন। চেলসির ২০২৪-২৫ সালের উয়েফা কনফারেন্স লিগ ও ২০২৫ সালের ফিফা ক্লাব বিশ্বকাপের ট্রফি জেতেন। চলতি বিশ্বকাপ চলাকালেই নতুন করে নাম লেখান স্প্যানিশ জায়ান্ট রিয়াল মাদ্রিদে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ২০২০ সালে স্পেনের হয়ে তার অভিষেক হলেও মূলত আলোচনায় আসেন ২০২৪ সালে জার্মানিতে অনুষ্ঠিত ইউরো জেতার পর। সেই আসরে ফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে একটি অ্যাসিস্ট করেন তিনি। চলতি বিশ্বকাপেও গুরুত্বপূর্ণ সময়ে দুটি অ্যাসিস্ট করে দলকে সাহায্য করেছেন।
কুকুরেল্লাকে বিশ্বজুড়ে তার বড় বড় ঝাঁকড়া চুলের জন্য আলাদাভাবে পরিচিত। এই চুলের পেছনেও রয়েছে তার শৈশবের এক গল্প। ছোটবেলায় তার মা পাত্রিসিয়া সাসেতা তাকে এই চুল বড় রাখার পরামর্শ দিয়েছিলেন, যাতে গ্যালারিতে বসে হাজারো বাচ্চার ভিড়ের মধ্যে তিনি সহজেই তার ছেলেকে খুঁজে বের করতে পারেন। পরবর্তীতে বড় হয়েও কুকুরেল্লা মায়ের সেই কথা ও স্টাইল ধরে রাখেন এবং চেলসি বা রিয়াল মাদ্রিদের মতো বড় ক্লাবে খেলার সময়েও চুল কাটেননি।
আজ ঝাঁকড়া চুল শুধু মার্ক কুকুরেল্লার পরিচয়ের অংশ নয়, এটি তার পরিচয়ের প্রতীক। ফুটসালের ছোট কোর্ট থেকে শুরু করে ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ, প্রিমিয়ার লিগ এবং বিশ্বকাপের মঞ্চ। প্রতিটি ধাপে তিনি প্রমাণ করেছেন, সমালোচনার জবাব কথায় নয়, পারফরম্যান্সেই দিতে হয়।
একসময় যাকে নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল, অভিষেকের পর যাকে অনেক দিন থাকতে হয়েছিল দলের বাইরে, আজ সেই কুকুরেল্লাই স্পেনের রক্ষণভাগের অন্যতম ভরসার নাম। আর গ্যালারিতে মায়ের যেন তাকে সহজে খুঁজে পাওয়ার জন্য রাখা সেই ঝাঁকড়া চুলই এখন বিশ্বের কোটি ফুটবলভক্তের কাছে তার সবচেয়ে বড় পরিচয়।
সময়ের আলো/এসএকে