ফুটবল দলগত খেলা থেকে অনেক সময় রূপ নেয় ব্যক্তিগত শ্রেষ্ঠত্বের মঞ্চে। ম্যাচ জয়ের স্বপ্ন তখন নির্ভর করে একজন খেলোয়াড়ের এক মুহূর্তের জাদুতে। ২০২৬ বিশ্বকাপের তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সের লড়াইটাও ঠিক তেমনই। একদিকে ইংল্যান্ডের অধিনায়ক হ্যারি কেইন, অন্যদিকে ফ্রান্সের অধিনায়ক কিলিয়ান এমবাপে। দুই স্ট্রাইকারই নিজেদের দলের প্রাণভোমরা। দুজনই রয়েছেন বিশ্বকাপ গোল্ডেন বুটের দৌড়ে। তাই মিয়ামির এই মহারণে তৃতীয় স্থানের পাশাপাশি লড়াই হবে ব্যক্তিগত শ্রেষ্ঠত্বেরও।
হ্যারি কেইনের গল্পটা ধৈর্য, সংগ্রাম আর আত্মবিশ্বাসের। ২০২৩ সালে টটেনহ্যামের সঙ্গে ১৯ বছরের সম্পর্ক ছিন্ন করে, জার্মান ক্লাব বায়ার্ন মিউনিখে গিয়ে নিজের জাত চিনিয়েছেন। বিশ্বকাপের মঞ্চেও তার অভিজ্ঞতা অনন্য। ২০১৮ সালে গোল্ডেন বুট জয়ী এই স্ট্রাইকার জানেন বড় আসরে কীভাবে নিজেকে উজাড় করে দিতে হয়।
এবারের বিশ্বকাপেও তিনি সেই ধারাবাহিকতা ধরে রেখেছেন। গ্রুপ পর্ব থেকে শুরু করে নকআউট। সব জায়গাতেই ছিলেন ইংল্যান্ডের সবচেয়ে বড় ভরসা। মেক্সিকোর বিপক্ষে শেষ ষোলোতে তার ঠান্ডা মাথার পেনাল্টি দলকে কোয়ার্টার ফাইনালে তুলতে বড় ভূমিকা রাখে। এখন পর্যন্ত এই বিশ্বকাপে তার গোলসংখ্যা ছয়। তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে যদি আর দুই গোল করতে পারে তা হলে গোল্ডেন বুটের লড়াইয়েও তিনি অন্যতম প্রধান দাবিদার হবেন। বক্সের ভেতরে নিখুঁত অবস্থান, দুর্দান্ত হেড, দূরপাল্লার শট এবং চাপের মুহূর্তে অসাধারণ মানসিক দৃঢ়তা তাকে বিশ্বের অন্যতম সেরা স্ট্রাইকারে পরিণত করেছে।
অন্যদিকে কিলিয়ান এমবাপে ২০১৮ রাশিয়া বিশ্বকাপে দেখিয়েছেন তার গতি। সেবার ফ্রান্সকে চ্যাম্পিয়ন করতে রেখেছিলেন গুরুত্বপূর্ণ অবদান। সেবার শেষ ষোলোতে আর্জেন্টিনা মূলত তার গতির কাছেই পরাস্ত হয়েছিল। আর ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে ফাইনালে গোল করে হয়েছিলেন টুর্নামেন্টের সেরা তরুণ খেলোয়াড়, সিলভার বল জয়ী। ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ফাইনালে করেছিলেন হ্যাটট্রিক। শেষ পর্যন্ত টাইব্রেকারে দিবু মার্টিনেজের দুই সেভে হেরে টানা শিরোপা হাতছাড়া করলেও টুর্নামেন্টে করেছিলেন ৮ গোল, হয়েছিলেন গোল্ডেন বুট জয়ী। আর চলতি বিশ্বকাপে আবারও মেসির সঙ্গে গোল্ডেন বুটের দৌড়ে সমান ৮ গোল করে আছেন শীর্ষে।
হ্যারি কেইন চলতি বিশ্বকাপেই ইংল্যান্ডের হয়ে সর্বোচ্চ গোলদাতা লিনেকারের রেকর্ড ভেঙে দিয়ে করেছেন ১৪ গোল। অন্যদিকে কিলিয়ান এমবাপে বিশ্বকাপের ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোল করা লিওনেল মেসির ২১ গোল থেকে মাত্র এক গোল পিছিয়ে রয়েছেন (২০টি)। তবে দুই স্ট্রাইকারের ফুটবল দর্শন একেবারেই ভিন্ন। কেইন একজন ‘কমপ্লিট ফরোয়ার্ড’। তিনি গোল করেন, আবার মাঝমাঠে নেমে আক্রমণও গড়ে দেন।
বিপরীতে এমবাপে একজন উইঙ্গার হিসেবে খেলেন। তার কাজ প্রতিপক্ষের রক্ষণ ভেঙে জালে বল জড়ানো। একজন ম্যাচ নিয়ন্ত্রণ করেন বুদ্ধিমত্তা ও অভিজ্ঞতায়, অন্যজন গতি, শক্তি আর নির্মম ফিনিশিংয়ে মুহূর্তেই ম্যাচের ভাগ্য বদলে দেন। এই ম্যাচে ইংল্যান্ড অধিনায়ক হ্যারি কেইন চাইবেন শেষটা জয়ে রাঙাতে। আর এমবাপে চাইবেন কোচ দিদিয়ের দেশমকে নিজেদের শেষ জয় উপহার দিতে।
তাই শনিবারের তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে ইংল্যান্ড ও ফ্রান্স লড়াই যতটা দুই দেশের, ঠিক ততটাই দুই মহাতারকারও। কেইনের অভিজ্ঞতা নাকি এমবাপের বিস্ফোরক শক্তি শেষ পর্যন্ত কোনটি হাসবে, সেটিই হয়তো নির্ধারণ করবে বিশ্ব আসরে তৃতীয় হওয়ার পথ। আর যে শেষ পর্যন্ত আলো ছড়াবেন, তিনিই গোল্ডেন বুটের দৌড়েও নিজের অবস্থান আরও সদৃঢ় করবেন।
সময়ের আলো/এসএকে