ফাঁস হওয়া একটি গোপন কূটনৈতিক নথি ঘিরে আবারও আলোচনায় এসেছে পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের তথাকথিত ‘বিদেশি ষড়যন্ত্র’ তত্ত্ব। পাকিস্তানে ‘সাইফার’ নামে পরিচিত এই নথিতে ২০২২ সালের মার্চে যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত পাকিস্তানের তৎকালীন রাষ্ট্রদূত আসাদ মাজিদ খান এবং মার্কিন কূটনীতিক ডোনাল্ড লুর মধ্যকার এক গোপন বৈঠকের বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, ওই বৈঠকের পর থেকেই ইমরান খানকে ক্ষমতা থেকে সরানোর প্রক্রিয়া শুরু হয় এবং শেষ পর্যন্ত তার কারাবাসের পথ তৈরি হয়।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক অনুসন্ধানী সংবাদমাধ্যম ড্রপ সাইট সম্প্রতি ক্যাবল আই-০৬৭৮ নম্বরের ওই নথি প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ২০২২ সালের ৭ মার্চের বৈঠকে বাইডেন প্রশাসনের পক্ষ থেকে পাকিস্তানকে ইঙ্গিত দেওয়া হয় যে, ইমরান খানকে সরানো হলে দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক হবে। মূলত ইউক্রেন যুদ্ধের প্রশ্নে ইমরান খানের নিরপেক্ষ অবস্থান এবং আফগানিস্তানে মার্কিন সামরিক তৎপরতায় পাকিস্তানের ঘাঁটি ব্যবহার করতে না দেওয়ার কারণে ওয়াশিংটন তার প্রতি অসন্তুষ্ট ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। ইমরান খান বরাবরই অভিযোগ করে আসছেন, স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ এবং রাশিয়া ও চীনের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানের সঙ্গে একমত না হওয়ায় তাকে ক্ষমতা থেকে সরানো হয়েছে।
তার দাবি, পাকিস্তানের ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক দল পিএমএল-এন ও পিপিপিকে সঙ্গে নিয়েই এই পরিকল্পনা করা হয়। ২০২২ সালের এপ্রিল মাসে তিনি বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র ব্যক্তিগতভাবে তাকে সরাতে চায় এবং তিনি ক্ষমতা হারালেই সব বিরোধ মিটে যাবে।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নীতির সমালোচনা এবং আফগানিস্তানে মার্কিন ড্রোন অভিযানের জন্য পাকিস্তানের ভূমি ব্যবহার করতে না দেওয়াই তার বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সে সময় তিনি বলেছিলেন, ‘ইমরান খান অনাস্থা ভোটে হারলেই কেবল তাদের ক্ষোভ কমবে।’
তবে যুক্তরাষ্ট্র শুরু থেকেই এসব অভিযোগ অস্বীকার করে এসেছে। মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের তৎকালীন মুখপাত্র নেড প্রাইস বলেছিলেন, অভিযোগগুলোর কোনো ভিত্তি নেই। তিনি জানান, ওয়াশিংটন পাকিস্তানের সাংবিধানিক প্রক্রিয়া ও আইনের শাসনের প্রতি সম্মান দেখায় এবং সেটিকেই সমর্থন করে।
ফাঁস হওয়া নথিতে দেখা যায়, ডোনাল্ড লু পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূতকে সতর্ক করে বলেন, ইমরান খান ক্ষমতায় থাকলে পাকিস্তান যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে বড় ধরনের সমস্যায় পড়বে। একই সঙ্গে তিনি ইঙ্গিত দেন, অনাস্থা ভোট সফল হলে ইসলামাবাদের প্রতি ওয়াশিংটনের অসন্তোষ দূর হয়ে যাবে।
এর কিছু দিন পর, ২০২২ সালের ৯ এপ্রিল অনাস্থা ভোটে ক্ষমতা হারান ইমরান খান। অভিযোগ রয়েছে, এ প্রক্রিয়ায় পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর পরোক্ষ সমর্থন ছিল। পরে দুর্নীতি, আদালত অবমাননা এবং রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তা ফাঁসের মামলায় তাকে ও তার স্ত্রী বুশরা বিবিকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। ২০২৪ সালের নির্বাচনের আগে তার দল পিটিআইর নির্বাচনি প্রতীকও বাতিল করা হয় এবং দলটির ওপর নানা বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়।
যুক্তরাষ্ট্র ও পাকিস্তানের সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরেই নানা টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে গেছে। ওয়াশিংটন বহুবার অভিযোগ করেছে, পাকিস্তান তালেবানকে আশ্রয় দিচ্ছে। যদিও একই সময়ে দেশটি যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে বিপুল আর্থিক সহায়তাও পেয়েছে। ২০১১ সালে অ্যাবোটাবাদে ওসামা বিন লাদেনকে হত্যা অভিযানের পর দুই দেশের সম্পর্ক আরও জটিল হয়ে ওঠে।
ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন পাকিস্তানের সামরিক সহায়তা বন্ধ করে দিয়েছিল। পরে বাইডেন প্রশাসনও ইমরান খানের সরকারের সঙ্গে দূরত্ব বজায় রাখে। আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের পর পাকিস্তানে মার্কিন ঘাঁটি স্থাপনের প্রস্তাব সরাসরি নাকচ করে দেন ইমরান খান। এরপর থেকেই দুই দেশের সম্পর্ক আরও খারাপ হতে থাকে।
ইউক্রেনে রাশিয়ার হামলার দিনেই ইমরান খান মস্কো সফরে ছিলেন, যা ওয়াশিংটনের অসন্তোষ আরও বাড়িয়ে দেয়। পরে জাতিসংঘে রাশিয়ার বিরুদ্ধে প্রস্তাবে পাকিস্তান ভোট না দেওয়ায় পরিস্থিতি আরও তিক্ত হয়। ইমরান খানের সরকার একদিকে যুক্তরাষ্ট্র, অন্যদিকে উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করছিল। তবে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী মনে করছিল, এই নীতি দেশটিকে আন্তর্জাতিকভাবে বিচ্ছিন্ন করে ফেলছে।
ড্রপ সাইটের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, সে সময় সৌদি আরবও পাকিস্তানের ওপর একটি প্রতিরক্ষা চুক্তির জন্য চাপ দিচ্ছিল। কিন্তু ইমরান খান সরকার কূটনৈতিক স্বাধীনতা বজায় রাখতে অনড় ছিল। সামরিক বাহিনী এ অবস্থানকে দেশের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করে।
এক পর্যায়ে পাকিস্তানের সেনাবাহিনী ওয়াশিংটনে নিজস্বভাবে লবিং কার্যক্রমও চালায় বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। ইমরান খান ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর নতুন সরকার যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত অবস্থানের দিকে আরও ঘনিষ্ঠ হয়। পরে ইউক্রেন যুদ্ধে ব্যবহারের জন্য পাকিস্তান থেকে গোলাবারুদ সরবরাহের কথাও প্রতিবেদনে উঠে আসে।
এ ছাড়া প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ঋণ সহায়তার বিষয়টিও ইউক্রেনে সামরিক সরবরাহ অব্যাহত রাখার সঙ্গে পরোক্ষভাবে জড়িত ছিল। শেষ পর্যন্ত পাকিস্তান সেই সৌদি প্রতিরক্ষা চুক্তিতেও সই করে, যেটি ইমরান খান সরকার দীর্ঘদিন আটকে রেখেছিল।
আরবিএন