চট্টগ্রামে বাড়ছে কুরবানি দাতার সংখ্যা। কুরবানি বৃদ্ধির সঙ্গে চামড়ার খাত বড় হচ্ছে। কিন্তু কাঁচা চামড়া সংগ্রহের সুযোগ কমছে দ্রুত।
চট্টগ্রাম নগরীর আতুরার ডিপো এলাকায় চলে আড়ত ব্যবসা। সেখানে মাত্র ২০ থেকে ২৫ জন আড়তদার সক্রিয় আছেন। আড়তদার সমিতিতে সদস্য আছেন ১১২ জন। বেশিরভাগই ছেড়ে দিয়েছেন ব্যবসা।
তারা বলছেন, আর্থিক দৈন্যতায় কমেছে আড়ত। সেই সঙ্গে উপযুক্ত দামে চামড়া কেনার সুযোগও কমেছে। এবার লবণের চড়া মূল্যের কারণে আড়তদাররা দুশ্চিন্তায় পড়েছেন।
লবণের দাম কমাতে বিভিন্ন স্থানে ধরনা দিচ্ছেন। লবণের উচ্চমূল্যের কারণে সক্রিয় অনেক আড়তদার হতাশ। উচ্চমূল্যের কারণে প্রতি বছরই তৈরি হয় সংকট। এতে পুঁজি বিনিয়োগে সৃষ্টি হচ্ছে অনিশ্চয়তা।
বৃহত্তর চট্টগ্রাম কাঁচা চামড়া আড়তদার ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি মো. মুসলিম উদ্দিন সময়ের আলোকে বলেন, কাঁচা চামড়ার খাত বড় হচ্ছে। এই চামড়া সংগ্রহ করতে আড়তদার ব্যবসায়ীদের বিকল্প নেই।
বিশেষ প্রক্রিয়ায় পেশাদার আড়তদাররা চামড়া সংগ্রহ করেন। অপেশাদার কেউ চামড়া সংরক্ষণ করতে পারেন না। আড়তদার বাঁচলে চামড়া শিল্প বাঁচবে। মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সুযোগ আরও সম্প্রসারিত হবে।
কিন্তু নানা সংকটে আড়তদার কমছে। সেদিকে প্রশাসন বা বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের খেয়ালই নেই। চট্টগ্রামে আড়তদার সমিতির ১১২ জন সদস্য আছে।
বাস্তবে সক্রিয় আড়তদার আছেন ২০ থেকে ২৫টি। এবার বৃহত্তর চট্টগ্রামের চামড়া এসব আড়তদার ছাড়া আর কেউ চামড়া সংগ্রহ করবে না। অথচ এবার সব মিলে চার লাখ পিস চামড়া সংগ্রহের টার্গেট আছে। চামড়ার তুলনায় আড়ত খুবই কম।
তিনি বলেন, ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে সংকট মোকাবিলায় ব্যর্থ হওয়ায় আড়ত ব্যবসা বিমুখ হয়ে পড়েছেন অনেকে। ঢাকার ট্যানারিগুলো সময়মতো চামড়ার দাম পরিশোধ না করা একটি বড় সমস্যা।
চট্টগ্রামে চামড়া কেনার ট্যানারি সংখ্যা কমে গেছে। সেই সঙ্গে চামড়া সংগ্রহের ভরা মৌসুম কুরবানির ঈদে লবণের উচ্চমূল্যের খড়গ তো আছেই।
বর্তমানে লাফিয়ে বাড়ছে লবণের দাম। ৭৪ কেজি প্রতি বস্তা এক লাফে ৯৫০ টাকায় ঠেকেছে। অথচ এক মাস আগেও ছিল ৬০০ টাকার নিচে। এসব কারণে অনেকে চামড়া সংগ্রহে আড়ত ব্যবসা ছেড়েই দিয়েছেন।
আতুরার ডিপো এলাকার আড়তদার মোহাম্মদ আলি বলেন, সরকারি সহযোগিতা-পৃষ্ঠপোষকতা পেলে কোনো আড়ত নিষ্ক্রিয় হতো না। কুরবানি দাতা বাড়ছে। চামড়ার খাত বড় হচ্ছে। এ জন্য আড়তদার ব্যবসায়ীর সংখ্যা আরও বেশি থাকা স্বাভাবিক।
কিন্তু সেই চামড়া সংগ্রহের কাজটি যারা করেন তারা সংকটের মধ্যে আছেন। ব্যাংক ঋণ, চামড়া সংগ্রহ মৌসুমে লবণের উচ্চ মূল্য, ট্যানারি থেকে সময়মতো বিক্রির টাকা না পাওয়ায় অনেকে ব্যবসা বিমুখ হয়ে গেছেন।
আড়তদার সমিতির ১১২ জন সদস্য সক্রিয় থাকলে চামড়ার দাম বাড়তো। কুরবানিদাতারা উপযুুক্ত দামে চামড়া বিক্রি করতে পারতেন। আড়ত কমে যাওয়ায় অতিরিক্ত চামড়া সংগ্রহ করে রাখার মতো অবস্থা থাকে না।
প্রতি বছরের মতো এবারও লবণের সেই পুরোনো সমস্যা প্রকট হয়ে দেখা দিয়েছে। প্রতি মণ উচ্চ দামে কেনা লবণ দিয়ে ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে পারবে না আড়তদাররা।
আড়তদারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এবার বৃহত্তর চট্টগ্রাম থেকে সাড়ে তিন লাখ থেকে চার লাখ পিস চামড়া সংগ্রহের টার্গেট আছে। এসব চামড়া সংরক্ষণে লাগবে অন্তত সাড়ে ৩ হাজার টন লবণ। টাকার অঙ্কে এসব লবণের মূল্য চার কোটি টাকার কাছাকাছি।
কুরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে চাঙ্গা হয়ে উঠে লবণ শিল্প। কিন্তু চাহিদার ভরা মৌসুমে কিছু অসাধু লবণ ব্যবসায়ী তৎপর হয়ে উঠেন। প্রশাসনের তদারকি না থাকায় দাম বাড়িয়ে দেন লবণের। এতে বিপাকে পড়েন আড়তদাররা। প্রতি বছরের মতো এবারও উচ্চমূল্যে প্রতি মণ লবণ বিক্রি হচ্ছে।
চট্টগ্রামে ট্যানারি সংকটে ব্যবসা ঢাকামুখী : চট্টগ্রামে লাখ লাখ পিস সংগ্রহ করা চামড়া একসময় প্রতিযোগিতামূলক দরে কিনত স্থানীয় ট্যানারি।
একসময় শুধু চট্টগ্রাম অঞ্চলেই ট্যানারি ছিল ২২টির বেশি। সংকটের কবলে পড়ে এখন টিকে আছে মাত্র একটি। বাকি সব ট্যানারি বন্ধ। আড়ত ব্যবসা গুটিয়ে নেওয়ার অন্যতম কারণ হিসেবে ট্যানারি সংকটকে দায়ী করা হচ্ছে।
আড়তদার মো. মুসলিম উদ্দিন বলেন, রিফ লেদার নামে একটি সচল ট্যানারি আছে চট্টগ্রামে। তারা আমাদের কাছ থেকে চামড়া তেমন সংগ্রহ করে না। তাদের কাঁচা চামড়া সংগ্রহের সক্ষমতাও কম।
তাই আমাদের কাঁচা চামড়ার ব্যবসা এখন ঢাকামুখী। ট্যানারির সংখ্যা বেশি হলে আমরা চট্টগ্রামেই বিক্রি করতাম। এত টাকা বকেয়া পড়ে থাকত না।
বিনামূল্যে লবণ চান আড়তদাররা : সরকার গত বছর থেকে চামড়া সংরক্ষণে মসজিদ ও এতিমখানা কর্তৃপক্ষের কাছে বিনামূল্যে লবণ সরবরাহ করেছে। কিন্তু আড়তদাররা চান এসব প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি তাদেরও বিনামূল্যের লবণ দেওয়া হোক।
আড়তদার মুসলিম উদ্দিন বলেন, আড়তে বিনামূল্যে লবণের একটি অংশ সরবরাহ হলে চামড়া সংরক্ষণ কাজে গতি পাবে। তার মতে ৮০ শতাংশ কাঁচা চামড়া আড়তদার ব্যবসায়ীরা সংগ্রহ করেন।
মসজিদ-মাদরাসা এতিমখানা মাত্র ২০ শতাংশ সংগ্রহ করে থাকে। তাই মসজিদ মাদ্রাসা এতিমখানার পাশাপাশি আড়তে দেওয়া প্রয়োজন। এতে চামড়া শিল্প লাভবান হবে। নিষ্ক্রিয় আড়তদাররা আবার ব্যবসায় যুক্ত হবেন।
উচ্চমূল্য নিয়ে লবণ মিল মালিক সমিতির বক্তব্য : চট্টগ্রামে লবণ মিল আছে প্রায় একশটি। এর মধ্যে ৪০টি আছে পটিয়ায়। চট্টগ্রাম অঞ্চলে লবণের উৎপাদন বেশি।
তাই মিলগুলোর বেশিরভাগের অবস্থান চট্টগ্রামে। সারা দেশে কুরবানির মৌসুমে প্রায় এক লাখ টন লবণের চাহিদা থাকে। চাহিদার বেশিরভাগ চট্টগ্রামের মিল থেকে সরবরাহ হয়ে থাকে।
লবণের দাম দ্রুত বাড়ছে বলে স্বীকার করেছেন চট্টগ্রাম লবণ মিল মালিক সমিতির সভাপতি নুরুল কবির। তিনি সময়ের আলোকে বলেন, প্রতি কেজিতে লবণের দাম ২ টাকা বেড়েছে। গেল ১০ দিন ধরে লবণের দাম অনেক বেড়েছে।
আমার ধারণা কয়েকটি কারণে লবণের দাম বেড়েছে। এর মধ্যে আছে বৃষ্টির কারণে লবণের উৎপাদন কম হওয়া, লবণ চাষ কমে যাওয়া এবং কুরবানি উপলক্ষে চাহিদা বৃদ্ধি। তবে কুরবানির পর লবণের দাম ঠিক হয়ে যাবে বলে আমার বিশ্বাস।
চট্টগ্রামে পশুর চাহিদা ৮ লাখ ১৮ হাজার : চট্টগ্রামে কুরবানিদাতা বাড়ছে। বাড়ছে গবাদি পশুর চাহিদা। চট্টগ্রাম জেলা প্রাণিসম্পদ অধিদফতর জানায়, চট্টগ্রাম নগরী ও ১৫ উপজেলায় ৮ লাখ ১৮ হাজার ৬৭১টি পশুর চাহিদা আছে এবার। অথচ এক দশক আগেও কুরবানিদাতা ছিল অনেক কম।
জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদ আলমগীর বলেন, পশুর চাহিদার তারতম্য প্রতি বছরই থাকে। তবে সার্বিক বিবেচনায় বলা যায় কুরবানিদাতা তেমন কমেনি।
বরং বাড়ছে কিংবা স্থিতিশীল আছে বলা যায়। তবে কুরবানির পশুর কোনো সংকট হবে না। আমাদের পাওয়া পরিসংখ্যানে দেখা যায়, চাহিদার বিপরীতে পশুর সরবরাহ বেশ ভালো আছে।
/এসএকে