শান্তদের আকাশে নতুন সূর্য

ক্রীড়া প্রতিবেদক

খেলা

বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটে এমন দৃশ্য খুব বেশি দেখা যায়নি। পাকিস্তানের মতো শক্তিশালী দলকে টানা দুই সিরিজে হোয়াইটওয়াশ, সেটিও ঘরের মাঠ

2026-05-21T05:35:24+00:00
2026-05-21T05:35:24+00:00
 
  রবিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬,
২ কার্তিক ১৪৩৩
রবিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬
খেলা
শান্তদের আকাশে নতুন সূর্য
ক্রীড়া প্রতিবেদক
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২১ মে, ২০২৬, ৫:৩৫ এএম 
শিরোপা উদযাপনে মুশফিক-শান্তরা। সংগৃহীত ছবি
বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটে এমন দৃশ্য খুব বেশি দেখা যায়নি। পাকিস্তানের মতো শক্তিশালী দলকে টানা দুই সিরিজে হোয়াইটওয়াশ, সেটিও ঘরের মাঠ ও প্রতিপক্ষের মাঠ মিলিয়ে টানা চার টেস্ট জিতে। ২৬ বছরের টেস্ট ইতিহাসে বাংলাদেশের জন্য এর চেয়ে বড় সাফল্য আসেনি অতীতে। কিন্তু এই ঐতিহাসিক জয়ও সহজভাবে ধরা দেয়নি শান্তদের হাতে। 

সিলেট টেস্টের শেষ দিনে একসময় ম্যাচ যেন ধীরে ধীরে বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছিল। মোহাম্মদ রিজওয়ান ও সাজিদ খানের ব্যাটে পাকিস্তান তখন লড়াই জমিয়ে তুলেছে, আর বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের শরীরী ভাষায় ফুটে উঠছিল চাপ আর শঙ্কা। তবে আগের মতো ভেঙে না পড়ে এবার ঘুরে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশ। তাইজুল ইসলামের স্পিনে শেষ পর্যন্ত ম্যাচ নিজেদের করে নিয়ে ইতিহাসের নতুন অধ্যায় লিখেছে নাজমুল হোসেন শান্তর দল। ওরা প্রমাণ করেছে, এই বাংলাদেশ আর আগের বাংলাদেশ নয়।

পানি পানের বিরতির পর হঠাৎই বদলে গেল দৃশ্যপট। তাইজুল ইসলামের এক স্পেলে ম্যাচ ঘুরে গেল আবার। পাকিস্তানের শেষ আশাটুকুও নিভে গেল দ্রুত। আর শেষ পর্যন্ত ৭৮ রানের জয় নিয়ে ইতিহাসের আরেকটি অধ্যায় লিখল শান্ত-লিটন-তাইজুলরা পাকিস্তানের বিপক্ষে টানা চার টেস্ট জয়ের এই কীর্তিকে অধিনায়ক নিজেই বললেন বাংলাদেশের টেস্ট ইতিহাসের সেরা অর্জন। শেষ দিনের সকালটা শুরু হয়েছিল বাংলাদেশের স্পষ্ট আধিপত্য নিয়েই। জয়ের জন্য দরকার ছিল মাত্র তিন উইকেট। পাকিস্তানের সামনে লক্ষ্য ছিল আরও ১২১ রান। 

কিন্তু ক্রিকেট কখনো কখনো সংখ্যার চেয়েও বড় হয়ে ওঠে মানসিকতার লড়াইয়ে। রিজওয়ান ও সাজিদ সেই লড়াইটাই ফিরিয়ে এনেছিলেন পাকিস্তানের পক্ষে। দিনের প্রথম ৯ ওভারে আসে ৪২ রান। বাংলাদেশের বোলিং ছিল এলোমেলো, ফিল্ডিংয়েও ছিল না আগের ধার। গ্যালারিতেও ধীরে ধীরে বাড়ছিল উৎকণ্ঠা। 

ম্যাচ শেষে সংবাদ সম্মেলনে সেই সময়ের অনুভূতির কথা বলতে গিয়ে শান্ত বললেন, ‘ওই এক ঘণ্টার আবেগ ব্যাখ্যা করা মুশকিল। সত্যি বলতে, ওরা ভালো ব্যাটিং করছিল। আমরা একটু চাপেও ছিলাম। তবে একটা ব্যাপার বলব যে, আগের টেস্ট ম্যাচগুলো থেকে আস্তে আস্তে এখন ওই আবেগ নিয়ন্ত্রণ করা, প্যানিক না করা, এসব আরও ভালো হয়েছে।’

বাংলাদেশ অধিনায়কের কথায় স্পষ্ট হয়ে উঠল এই দলের বদলে যাওয়ার গল্প। আগে যেখানে চাপ এলেই দল ছন্দ হারিয়ে ফেলত, এখন তারা ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করতে শিখছে। শান্ত নিজেও মনে করেন, বড় দল হওয়ার পথে এটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন, ‘যদিও ওখানে আরও উন্নতির জায়গা আছে, বড় দলগুলো এখানে আরও ধীরস্থির থাকে। তবে আগের চেয়ে আরও উন্নতি হওয়ায় অধিনায়ক হিসেবে আমি খুশি।’

এই সিরিজের দুই টেস্টই গড়িয়েছে শেষ দিন পর্যন্ত। মিরপুরে শেষ সেশনের নাটকীয়তার পর জয়, সিলেটে আবার রোমাঞ্চ ছড়িয়ে শেষ দিনের সাফল্য। টানা ১০ দিন ধরে লড়াই করে একটি সিরিজ জেতার মধ্যেও আলাদা গর্ব খুঁজে পাচ্ছেন শান্ত, ‘১০ দিন ধরে টেস্ট সিরিজ খেলতে পেরেছি। এটা অবশ্যই গর্বের ব্যাপার। সাধারণত আমরা ওভাবে পাঁচ দিন, পাঁচ দিন করে ক্রিকেট খুব একটা খেলিনি অতীতে। এটাও উন্নতির জায়গা। পুরো সিরিজে দল হিসেবে খেলতে পেরেছি।’

এই সিরিজে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল দলীয় পারফরম্যান্স। কখনো লিটন দাস ব্যাট হাতে ম্যাচ বাঁচিয়েছেন, কখনো মুশফিকুর রহিম অভিজ্ঞতার আলো ছড়িয়েছেন, কখনো নাহিদ রানার আগুন ঝরানো গতি কাঁপিয়েছে পাকিস্তানকে, আবার কখনো তাইজুল ইসলামের ধৈর্য ম্যাচ ঘুরিয়ে দিয়েছে।

তাই জয়ের পর শান্ত কৃতিত্ব ভাগ করে দিলেন পুরো দলের সঙ্গে, ‘প্রত্যেক ক্রিকেটার যেভাবে পরিশ্রম করেছে, প্রতিটি ব্যাটসম্যান, বোলার, এমনকি যারা ম্যাচ খেলার সুযোগ পায়নি, কোচিং স্টাফ, দলে সহায়তা করার জন্য যারা থাকে, সবারই অবদান ছিল। সবাই চাচ্ছিল যে আরেকবার আমরা এরকম একটা ভালো ফল করতে পারি।’

সিলেটের বৃষ্টিভেজা সকালে যারা গ্যালারিতে এসেছিলেন, তাদের প্রতিও কৃতজ্ঞতা জানাতে ভোলেননি অধিনায়ক। কারণ শেষ দিনের চাপের মুহূর্তে গ্যালারি থেকেও বাংলাদেশ পেয়েছে বাড়তি শক্তি। শান্তর ভাষ্যে, ‘আজকে (বুধবার) একটা সময় দেখছিলাম যে, যখন উইকেট পড়ছিল না, গ্যালারি থেকে সাপোর্টটা আমরা পাচ্ছিলাম। টেস্ট ক্রিকেটে দর্শকরা খেলার মোমেন্টাম বুঝে আমাদের ওই সাপোর্টটা দিয়েছেন।’

২০২৪ সালে পাকিস্তানের মাটিতে প্রথমবারের মতো তাদের হোয়াইটওয়াশ করেছিল বাংলাদেশ। এবার দেশের মাটিতেও একইভাবে হারাল তারা পাকিস্তানকে। টেস্ট ক্রিকেটে বাংলাদেশের ২৬ বছরের যাত্রায় এটিকেই সবচেয়ে বড় অর্জন মনে করছেন শান্ত, ‘এখন পর্যন্ত (সেরা)... এখন পর্যন্ত। 

সব মিলিয়ে বলব যে, এই চারটা ম্যাচ অনেক স্পেশাল। আমরা অনেক ভালো ক্রিকেট খেলেছি।’ তবে এখানেই থেমে থাকতে চান না বাংলাদেশ অধিনায়ক। তার চোখ এখন আরও বড় পরীক্ষার দিকে। অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকার মতো কঠিন কন্ডিশনে কেমন লড়াই করতে পারে বাংলাদেশ, সেটিকেই আসল মানদণ্ড হিসেবে দেখছেন তিনি, ‘আমাদের টেস্ট টিম আস্তে আস্তে গড়ে তুলতে হবে। আরও অনেক জায়গা আছে উন্নতির। ওসব ঠিকঠাক করে যখন আমরা দেশে এবং দেশের বাইরে ধারাবাহিকভাবে ভালো খেলব, তখন বলব যে আমাদের দলটা আগের থেকে ভালো অবস্থানে যাচ্ছে।’

বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেট অনেক বছর ধরেই সম্ভাবনার গল্প শুনেছে। কিন্তু পাকিস্তানের বিপক্ষে টানা চার জয় যেন প্রথমবারের মতো সেই সম্ভাবনাকে বাস্তবতার রূপ দিল। এই দল এখন আর শুধু লড়াই করতে নামে না, জিততে নামেও।

সময়ের আলো/আআ
  বিষয়:   শান্ত  আকাশ  নতুন  সূর্য 


Advertisement
Loading...
Loading...
খেলা- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: