আমেরিকা ও ইসরায়েলের সাম্প্রতিক ভয়াবহ সামরিক হামলার ক্ষতি কাটিয়ে প্রাথমিক ধারণার চেয়ে অনেক দ্রুতগতিতে নিজেদের সামরিক বাহিনীকে পুনর্গঠন করছে ইরান। যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা পর্যালোচনার সাথে যুক্ত একাধিক সূত্রের বরাতে মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন এই তথ্য প্রকাশ করেছে।
গোয়েন্দা হিসাব অনুযায়ী, গত এপ্রিলের শুরুতে কার্যকর হওয়া ছয় সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির সুযোগ নিয়ে ইরান ইতিমধ্যেই তাদের ড্রোন উৎপাদন পুনরায় শুরু করেছে এবং মাত্র ছয় মাসের মধ্যেই তারা ড্রোন হামলার সক্ষমতা পুরোপুরি ফিরে পেতে পারে। তেহরানের এই দ্রুত ঘুরে দাঁড়ানোর ফলে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন মিত্রদের জন্য ড্রোন ও মিসাইল হামলা আবারও একটি বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মার্কিন গোয়েন্দা তথ্যের ব্যাপারে অবগত মোট চারটি সূত্র সিএনএনকে নিশ্চিত করেছে, পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে যুদ্ধ হামলায় ধ্বংস হওয়া মিসাইল ঘাঁটি, লঞ্চার এবং গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র উৎপাদন কেন্দ্রগুলো নতুন করে গড়ে তুলছে ইরান। সিএনএন এর আগে জানিয়েছিল যে ইরানের প্রায় অর্ধেক মিসাইল লঞ্চার মার্কিন হামলা থেকে রক্ষা পেয়েছিল, তবে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে এই সংখ্যা বাড়িয়ে দুই-তৃতীয়াংশ বলা হয়েছে।
এছাড়া হাজার হাজার ইরানি ড্রোন এখনো অক্ষত টিকে আছে, যা তাদের মোট ড্রোন সক্ষমতার প্রায় অর্ধেক। এই যুদ্ধ ইরানের সামরিক সক্ষমতা সাময়িকভাবে কমালেও পুরোপুরি ধ্বংস করতে পারেনি, যা দীর্ঘ মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিমান হামলার কার্যকারিতা নিয়েই বড় প্রশ্ন তুলেছে।
একটি সূত্র সিএনএনকে জানায়, ধারণার চেয়ে দ্রুত ইরানের এই ঘুরে দাঁড়ানোর পেছনে রাশিয়া ও চীনের বড় ধরনের কৌশলগত সমর্থন রয়েছে। দুটি সূত্র জানায়, যুদ্ধ চলাকালেও চীন ইরানকে এমন সব গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ সরবরাহ করেছে, যা দিয়ে ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করা যায়।
গত সপ্তাহে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সিবিএসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে চীনের এই ক্ষেপণাস্ত্রের যন্ত্রাংশ দেওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করেছিলেন। তবে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গুও জিয়াকুন এক সংবাদ সম্মেলনে এই অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করে একে ‘ভিত্তিহীন’ বলে দাবি করেছেন।
ইরানের উপকূলীয় প্রতিরক্ষামূলক ক্রুজ মিসাইলের একটি বড় অংশই অক্ষত রয়েছে, কারণ মার্কিন বিমান হামলা উপকূলীয় সামরিক সরঞ্জাম লক্ষ্য করে চালানো হয়নি। এসব মিসাইল হরমুজ প্রণালিতে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলে হুমকি তৈরির জন্য ইরানের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) একজন মুখপাত্র এই গোয়েন্দা তথ্য নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি না হলেও পেন্টাগনের প্রধান মুখপাত্র শন পার্নেল সিএনএনকে বলেন, ‘আমেরিকার সামরিক বাহিনী বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী এবং প্রেসিডেন্টের পছন্দমতো স্থান ও সময়ে অভিযান চালানোর সব প্রস্তুতি তাদের রয়েছে।’ কারণ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বারবার হুমকি দিয়েছেন, যুদ্ধ অবসানে চুক্তি না হলে তিনি আবারও যেকোনো মুহূর্তে সামরিক অভিযান শুরু করবেন।
ইরানের এই দ্রুত পুনর্গঠনের তথ্যটি মার্কিন সেন্টকম কমান্ডার অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপারের দাবির সম্পূর্ণ বিপরীত। গত মঙ্গলবার হাউস আর্মড সার্ভিসেস কমিটির শুনানিতে কুপার দাবি করেছিলেন, ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ ইরানের প্রতিরক্ষা শিল্পের ৯০ শতাংশ ধ্বংস করেছে এবং ইরান আগামী কয়েক বছর নিজেদের পুনর্গঠন করতে পারবে না। তবে সিএনএন-এর সূত্রটি জানিয়েছে, প্রতিরক্ষা স্থাপনাগুলোর ক্ষতি ইরানের পুনর্গঠনের ক্ষমতাকে বড়জোড় কয়েক মাস পিছিয়ে দিয়েছে, কিন্তু কুপারের দাবি মতো কয়েক বছর নয়, কারণ ইরানের কিছু গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা এখনো সম্পূর্ণ অক্ষত রয়েছে।
সূত্র: সিএনএন
সময়ের আলো/টিএইচ