মিরপুরের সৈয়দ নজরুল ইসলাম জাতীয় সুইমিং কমপ্লেক্সে এমন দৃশ্য আগে কখনো দেখা যায়নি। বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে এমন ঘটনাই যে ঘটেনি। এক সঙ্গে প্রায় শ’খানেক প্যারা সুইমারদের আগমন এবং প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ সত্যিই বিরল!
কারও হাত নেই, কারও পা। কেউ চোখে ভালো দেখতে পায় না; কারোর পুরো শরীরই অকেজো। কেউ হুইল চেয়ারে করে অন্যের সহযোগিতায় চলাচল করেন। এমন সব প্রতিবন্ধী সুইমারদের এক ছাতাতলে নিয়ে এসেছে ন্যাশনাল প্যারালিম্পিক কমিটি অব বাংলাদেশ (এনপিসি, বাংলাদেশ)। দেশব্যাপী ছড়িয়ে-ছটিয়ে থাকা প্রতিভাবান সুইমারদের আগমনে রীতিমতো মিলনমেলার সৃষ্টি হয় মিরপুর সুইমিং কমপ্লেক্সে।
প্রথমবারের মতো বাংলাদেশ প্যারা গেমস আয়োজন করে এ মহামিলনের সৃষ্টি করেছে ন্যাশনাল প্যারালিম্পিক কমিটি। প্রতিবন্ধী ক্রীড়াবিদদের জন্য একটি শক্তিশালী জাতীয় প্ল্যাটফর্ম তৈরি এবং প্যারা স্পোর্টসের সার্বিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত করাই বাংলাদেশ প্যারা গেমস আয়োজনের প্রধান উদ্দেশ্য। আর একটি মহৎ উদ্দেশ্য এতে রয়েছে।
তা হলো চলতি বছরের ১৮-২৪ অক্টোবর জাপানের আইচি-নাগোয়া শহরে অনুষ্ঠিত হবে প্যারা এশিয়ান গেমসের পঞ্চম আসর। সেখানে যাতে বাংলাদেশের প্রতিযোগীরা সম্মানের সঙ্গে অংশগ্রহণ এবং দেশের পতাকাকে আরও উঁচুতে তুলে ধরতে পারেন, দেশের জন্য পদক জয়ে ভূমিকা রাখতে পারেন- প্রতিবন্ধী প্যারা সুইমারদের প্রস্তুতির মঞ্চ হচ্ছে বাংলাদেশ প্যারা গেমস।
বাংলাদেশের প্যারা সুইমাররা যে প্রথমবারের মতো সুইমিংপুলে নেমেছেন বিষয়টা এমন নয়। এর আগেও তারা সুইমিং প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছেন। তবে এর ব্যাপ্তি এতটা ছিল না। আগে প্যারা সুইমাররা কেবল একটি ইভেন্ট ৫০ মিটার ফ্রি-স্টাইলে অংশ নিতেন। যেখানে আবার ডিসকোয়ালিফাইয়ের বিষয়টা ছিল না। যে যেভাবে পারত সাঁতার কাটতে নেমে যেত।
এবার তা হতে দেয়নি ন্যাশনাল প্যারালিম্পিক কমিটি। তাদের হাতে-কলমে ট্রেনিং দিয়ে তারপরই পুলে নামার ব্যবস্থা করেছে। ইভেন্টও ছিল আগের চেয়ে বেশি। ৫০ মিটার ব্যাকস্ট্রোক, ৫০ মিটার ব্রেস্টস্ট্রোক এবং হুইল চেয়ারের ৫০ মিটার ব্যাকস্ট্রোক। ছেলেমেয়ে উভয় প্রতিযোগীই এতে অংশ নিয়েছেন। এমন আয়োজনে যারপরনাই আনন্দিত সাগর, রাফি, সুমাইয়া, সবুজ, সোহাগ, সোলাইমানদের মতো পদকজয়ী সুইমাররা।
প্যারা গেমসে সুইমিংয়ে অংশ নেওয়া অধিকাংশ সাধারণ মানের সাঁতারু। অধিকাংশেরই পুলে নামার অভিজ্ঞতা প্রথম। পুকুর থেকে পুলে এসে অনেকেই ডুব সাঁতার যাকে গ্রাম্য সাঁতার বলা হয়- এমনভাবেই শুরুতে সাঁতরেছেন। তবে তাদের প্রতিযোগিতায় নামার ট্রেনিং দিয়েই শেষ পর্যন্ত প্রতিটি ইভেন্টে নামানো হয়।
নিবেদিতা দাসের মতো জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত সাঁতারুরা আয়োজনে বিচারকের ভূমিকায় ছিলেন। এখন থেকে যারা প্রথম, দ্বিতীয় এবং তৃতীয় হয়েছেন কিংবা এর বাইরে আরও কিছু সাঁতারুদের নিয়ে দারুণ উচ্ছ্বসিত বাংলাদেশ সুইমিং ফেডারেশনের যুগ্ম সম্পাদক এবং প্যারা সুইমিং প্রতিযোগিতার বিচারক নিবেদিতা।
তিনি মনে করেন, এশিয়ান প্যারা গেমসের আগে যে সময়টা তারা পাবে, নিয়মিত অনুশীলনে থাকলে এশিয়ান গেমসে আশা করি দেশের জন্য ভালো রেজাল্ট বয়ে নিয়ে আসতে পারবে।
নিবেদিতা দাসের মতো আশাবাদী ন্যাশনাল প্যারালিম্পিক কমিটির বর্তমান সহ-সভাপতি, বাংলাদেশ প্যারা গেমসের অর্গানাইজিং কমিটির প্রধান এবং পুলিশের যুগ্ম কমিশনার মোহাম্মদ নাসিরুল ইসলামও। তিনি মনে করেন, তৃণমূল থেকে উঠে আসা প্রতিভাই প্রকৃত প্রতিভা। তাদের পরিচর্চা করে জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে তুলে ধরাই প্যারালিম্পিকের কাজ এবং সেটিই ন্যাশনাল প্যারালিম্পিক কমিটির বর্তমান সদস্যরা করছেন।
বর্তমান কমিটি দায়িত্ব গ্রহণের পর যতগুলো কর্মসূচি কিংবা দেশ-বিদেশ থেকে যত সাফল্য এসেছে, তা আগে কখনো আসেনি মন্তব্য নাসিরুল ইসলামের। তার সুরে সুর মেলান জাতীয় দলের সাবেক ক্রিকেটার এবং কমিটির যুগ্ম সম্পাদক সানোয়ার হোসেন।
ন্যাশনাল প্যারালিম্পিক কমিটির মহাসচিব ড. মারুফ আহমেদ মৃদুলের অক্লান্ত পরিশ্রম, খেলোয়াড়দের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক এবং চৌকষ কর্মকাণ্ড বাংলাদেশ প্যারা গেমসই নয়, অন্যান্য গেমস থেকে সাফল্যে বয়ে আনার ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা রাখছে মন্তব্য প্যারা সুইমারদের।
এমন আয়োজন প্রসঙ্গে ড. মারুফ আহমেদ মৃদুল বলেন, গেমসটির মাধ্যমে প্যারা ক্রীড়াবিদদের সক্ষমতা বিকাশ, সামাজিক অন্তর্ভুক্তি, প্যারা স্পোর্টসে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো শক্তিশালীকরণ এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের জন্য সুসংগঠিত পাইপলাইন তৈরি সম্ভব হবে। পাশাপাশি এটি দেশব্যাপী ইতিবাচক আলোড়ন সৃষ্টি, প্রতিবন্ধিকতা বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং সামগ্রিক ক্রীড়া উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।’
প্যারালিম্পিক কমিটির আরেক সক্রিয় সদস্য, হুইয় চেয়ার ব্যবহারকারী মিডিয়া ব্যক্তিত্ব হেদায়তুল আজিজ মুন্না। আয়োজন নিয়ে তিনি জানান, আমি শুধু প্যারালিম্পিক কমিটির একজন সদস্যই নই, আমি কিন্তু একজন হুইল চেয়ার খেলোয়াড়ও।
আমাদের সময়ে আমরা কিন্তু এমন আয়োজন কিংবা সুযোগ-সুবিধা পাইনি। এমন প্ল্যাটফর্ম আমাদের সুইমারদের মনোবল বৃদ্ধিতে যেমন ভূমিকা রাখবে, তেমনি সাফল্য বয়ে আনার ক্ষেত্রেও।
প্যারা সুইমিংয়ের বিরল প্রতিভায় মুগ্ধতায় ঝরেছে অনুষ্ঠানে আগত দুই বিশেষ অতিথি আস্থা ফিড ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের চেয়ারম্যান মোশারফ হোসাইন চৌধুরী এবং বাংলাদেশ সুইমিং ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুর রহমান শাহীনের কণ্ঠেও।