আদালতে বিচারক শূন্যতা বা পর্যাপ্ত বিচারকের অভাব বিচারপ্রার্থীদের জন্য চরম ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। নিয়মিত বিচারক না থাকায় গুরুত্বপূর্ণ অনেক আদালতের বিচার কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছে। এর ফলে মামলা জট তৈরি হচ্ছে এবং প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে আসা বিচারপ্রার্থীরা দিনের পর দিন আদালতে ঘুরেও কোনো প্রতিকার পাচ্ছেন না। আদালতে নিয়মিত বিচারক না থাকলে নতুন মামলা গ্রহণ, সাক্ষ্যগ্রহণ বা অভিযোগ গঠনের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো স্থবির হয়ে যায়।
বিচারপ্রার্থীদের শুধু তারিখ নিয়ে বাড়ি ফিরতে হয়। তা ছাড়া নিয়মিত বিচারক না থাকলে আসামিদের জামিন শুনানি ব্যাহত হয়। গ্রেফতার ব্যক্তিদের অধিকার ক্ষুণ্ন হয় এবং আইনি সমাধান পেতে জটিলতা বাড়ে। অন্যদিকে দূরদূরান্ত থেকে আসা সাধারণ মানুষ দিনের পর দিন আদালতে ঘুরে আর্থিক ও মানসিকভাবে ক্লান্ত হয়ে পড়েন এবং বিচারের প্রতি আস্থা হারান। অনেক সময় একজন বিচারককে নিজ আদালতের পাশাপাশি পার্শ্ববর্তী একাধিক আদালতের অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করতে হয়, যার ফলে কাজের স্বাভাবিক গতি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। এর ফলে আইনজীবীদের কাজেও মারাত্মক ব্যাঘাত ঘটে, রাজধানীর অধস্তন আদালতের কয়েকটিতে দীর্ঘদিন ধরে বিচারক না থাকায় বিচারপ্রার্থীদের তেমনই ভোগান্তি হচ্ছে। অনেক আদালতে নিয়মিত বিচারক না থাকায় ভারপ্রাপ্ত বিচারক দিয়ে চলছে বিচারকাজ। এতে সংশ্লিষ্ট সবাইকে বিড়ম্বনার শিকার হতে হয়।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, ঢাকার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে খোদ চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট পদটিতেই দীর্ঘদিন ধরে বিচারক নেই। গত ১৮ ফেব্রুয়ারি আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামানের একান্ত সচিব হিসেবে নিয়োগ পান ঢাকার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো. সাজ্জাদুর রহমান। এরপর থেকে এ আদালতে কোনো বিচারক নেই। তবে অতিরিক্ত চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ভারপ্রাপ্ত হিসেবে চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের দায়িত্ব পালন করছেন। যার ফলে আদালতে বিচারিক ও প্রশাসনিক শূন্যতা দেখা দিয়েছে। এ ছাড়া চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের পাশাপাশি এ আদালতে অনেক দিন জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত নম্বর ৩ ও ৪ এ বিচারক নেই।
আরও পড়ুন
অন্যদিকে মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমনসম্পর্কিত মামলা নিষ্পত্তির জন্য প্রতিষ্ঠিত ঢাকা বিভাগের জন্য একমাত্র আদালতে বিচারক নেই দীর্ঘদিন ধরে। নিয়মিত বিচারক অবসরে যাওয়ার পর থেকে এ আদালত বিচারক শূন্য রয়েছে। ঢাকার জেলা ও দায়রা জজ এ আদালতের অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছেন। যার ফলে মামলা নিষ্পত্তিতে বিলম্ব হচ্ছে। এ ছাড়া ঢাকার জেলা জজ আদালতের অধীনস্থ যুগ্ম জেলা জজ ৪র্থ আদালতে নিয়মিত বিচারক নেই, সিনিয়র সিভিল জজ ১৫টি আদালতের মধ্যে ৫টি আদালতে বিচারক নেই, ভারপ্রাপ্ত বিচারক দিয়ে চলছে বিচারকাজ। অন্যদিকে আইন ও বিচার বিভাগ থেকে গত ১৬ সেপ্টেম্বর অতিরিক্ত জেলা জজ ৯টি, যুগ্ম জেলা জজ ৮টি, সিভিল জজ ৪০টি এবং পারিবারিক আদালত ১৪টি নতুন করে প্রতিষ্ঠার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এসব আদালত প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজনীয় জনবল এবং অবকাঠামোর কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। যার ফলে প্রজ্ঞাপনে আটকে আছে নতুন আদালতের ভবিষ্যৎ।
অন্যদিকে ঢাকার মহানগর দায়রা জজ আদালতে নবপ্রতিষ্ঠিত ৪টি অতিরিক্ত মহানগর দায়রা আদালতের মধ্যে ২০তম আদালতে বিচারকের পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য রয়েছে। কিন্তু এই চারটি আদালতের অনুকূলে কোনো জনবলের মঞ্জুরি নেই।
এ ছাড়া ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালতেও দীর্ঘ সময় ধরে বিচারকের পদ শূন্য রয়েছে। আদালতগুলো হলোÑ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট কোর্ট নম্বও ২৬, ৩১, ৩২ ও ৩৭।
বিচারক না থাকার বিষয়ে ঢাকার মহানগর দায়রা জজ আদালতের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. আবু হাসান সময়ের আলোকে জানান, অনেক আদালতের বিচারকরা পদোন্নতি পেয়ে অন্যত্র বদলি হয়েছেন। আবার কিছু আদালতে এখন পর্যন্ত নিয়মিত বিচারক পদায়নই করা হয়নি।
তবে তিনি বলেন, শিগগিরই এই আদালতগুলোতে নতুন বিচারক পেয়ে যাবেন। ফলে এ সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। আদালত সূত্রে জানা যায়, বিচারকবিহীন এ আদালতে গড়ে ২ হাজার ৬০০ থেকে ৩ হাজারের মতো মামলা বিচারাধীন রয়েছে।
এ বিষয়ে ভুক্তভোগী বিচারপ্রার্থী মোহাম্মদ সোহেল রানা বলেন, মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে নম্বর ৩২ এ আমার একটি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। আসামি প্রতারণা করে আমার কাছ থেকে ৩ লাখ টাকা নিয়ে আত্মসাৎ করেছে। সেই মামলায় নিয়মিত বিচারক না থাকায় দীর্ঘদিন ধরে আমি সাক্ষী দিতে পারছি না। যার ফলে আমি ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছি।
বিচারপ্রার্থী নজরুল ইসলাম বলেন, মানব পাচার ট্রাইব্যুনালে আমার একটি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। আমি সেই মামলার অভিযোগকারী বাদী। কিন্তু এ আদালতের নিজস্ব বিচারক অনেক দিন ধরে না থাকায় আমি ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছি। তিনি সংশ্লিষ্টদের কাছে অবিলম্বে এ সমস্যা সমাধানের দাবি জানান।
আইনজীবী মো. মুনজুর আলম বলেন, বিচারপ্রার্থীরা অনেক আশা নিয়ে তাদের পক্ষে মামলা লড়ার জন্য আমাদের কাছে আসেন। কিন্তু আদালতে যদি বিচারক না থাকেন, তা হলে আমরা কীভাবে বিচারপ্রার্থীদের বিচার নিশ্চিত করব। এভাবে দীর্ঘদিন আদালত বিচারক শূন্য থাকলে বিচারপ্রার্থীরা হতাশ হয়ে পড়বে।
ঢাকা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক আবুল কালাম খান বলেন, ঢাকার আদালত গুরুত্বপূর্ণ জায়গা। যেখানে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ বিচারের আশায় আসেন। সেখানে র্দীর্ঘদিন ধরে বিচারকের পদ শূন্য থাকার ঘটনা দুঃখজনক। তিনি অবিলম্বে এসব আদালতে বিচারক নিয়োগ দেওয়ার দাবি জানান।
এএডি/