মানুষের শরীরের বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে অমরত্ব অর্জন করা সম্ভব বলে বিশ্বাস করেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। এই লক্ষ্যকে সামনে রেখে ক্রেমলিন-সমর্থিত দীর্ঘায়ু ও বার্ধক্য-রোধ সংক্রান্ত একটি উচ্চাভিলাষী বৈজ্ঞানিক প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে, যা বর্তমানে রাশিয়ার অন্যতম প্রধান বিজ্ঞান প্রকল্পে পরিণত হয়েছে।
গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে বেইজিংয়ে এক সামরিক কুচকাওয়াজ চলাকালীন চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিনপিংয়ের সঙ্গে পুতিনের এমন একটি ঘরোয়া আলাপচারিতা ফাঁস হয়ে যাওয়ার পর বিষয়টি সামনে আসে।
ওয়ালস্ট্রিট জার্নালের অনুসন্ধানী বরাতে জানা গেছে, পুতিনের এই আকাঙ্ক্ষা এখন রাশিয়ায় একটি রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকার। গত মাসে রাশিয়া সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেছে যে পুতিনের ২৬ বিলিয়ন বা ২ হাজার ৬০০ কোটি ডলারের ‘নিউ হেলথ প্রিজারভেশন টেকনোলজিস’ প্রকল্পের অংশ হিসেবে বিজ্ঞানীরা কোষের বার্ধক্য ধীর গতির করার জন্য একটি বিশেষ জিন-থেরাপি চিকিৎসা তৈরি করছেন। রাশিয়ার উপ-বিজ্ঞান মন্ত্রী ডেনিস সেকিরিনস্কি গত ২৩ এপ্রিল বলেন, ‘কোষের বার্ধক্যের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে এই ওষুধটি অন্যতম প্রতিশ্রুতিশীল একটি মাধ্যম হতে যাচ্ছে।’
এই প্রকল্পের আরেকটি বড় দিক হলো গবেষণাগারে প্রতিস্থাপনের জন্য মানুষের কৃত্রিম অঙ্গ তৈরি করা। ২০২৪ সালে উন্মোচিত এই জাতীয় দীর্ঘায়ু প্রকল্পের মূল লক্ষ্য ২০৩০ সালের মধ্যে ১ লাখ ৭৫ হাজার মানুষের জীবন বাঁচানো। তবে সমালোচকেরা বলছেন, এই সংখ্যার সঙ্গে ইউক্রেন যুদ্ধে নিহত রুশ সেনাদের আনুমানিক সংখ্যার এক অদ্ভুত মিল রয়েছে। ক্রেমলিনের প্রেস সার্ভিস এক ইমেইল বার্তায় জানিয়েছে, ‘রাশিয়ান ফেডারেশনে এই ক্ষেত্রে বৈজ্ঞানিক কর্মসূচির একটি সম্পূর্ণ পরিসরের কাজ চলছে। এই প্রকল্পগুলো রাষ্ট্র দ্বারা সমর্থিত এবং বহু বৈজ্ঞানিক ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান এতে অংশ নিচ্ছে।’
এই দীর্ঘায়ু অভিযানের নেতৃত্বে রয়েছেন পুতিনের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ দুজন ব্যক্তি। একজন হলেন পুতিনের মেয়ে মারিয়া ভোরোনৎসোভা, যিনি একজন হরমোন বিশেষজ্ঞ হিসেবে এই জিনপ্রযুক্তি কর্মসূচির তদারকি করছেন। অন্যজন হলেন বিতর্কিত পদার্থবিদ মিখাইল কোভালচুক, যিনি সোভিয়েত আমলের পারমাণবিক গবেষণা কেন্দ্র কুর্চাতভ ইনস্টিটিউটের প্রধান। কোভালচুক রাশিয়ার গণমাধ্যমকে বলেন, ‘অমরত্ব নিয়ে আলোচনা করা কঠিন, তবে মানুষকে মেরামত করার সক্ষমতা যে সামনে নিঃসন্দেহে বৃদ্ধি পাবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।’
প্রকল্পের আওতায় থ্রিডি অর্গান প্রিন্টিং বা বায়োপ্রিন্টিং এবং জেনোট্রান্সপ্লান্টেশন বা জিনগতভাবে মানুষের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বিশেষ জাতের ছোট শূকরের শরীরে মানুষের অঙ্গ তৈরির মতো অভিনব প্রযুক্তির ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। ইতিমধ্যেই রুশ বিজ্ঞানীরা ইঁদুরের থাইরয়েড গ্রন্থি এবং মানুষের তরুণাস্থি বায়োপ্রিন্ট করতে সক্ষম হয়েছেন বলে দাবি করেছেন এবং ২০৩০ সালের মধ্যে মানবদেহের অঙ্গ প্রতিস্থাপন শুরু করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছেন। তবে পশ্চিমা গবেষণার মতো ক্রেমলিনের এই প্রকল্পের কোনো বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ আন্তর্জাতিক পিয়ার-রিভিউড জার্নালে প্রকাশিত হয়নি।
রাশিয়ায় বায়োপ্রিন্টিংয়ের অন্যতম পথিকৃৎ বিজ্ঞানী আলেকজান্ডার ওস্ত্রভস্কি, যিনি ইউক্রেন আক্রমণের পর দেশ ছেড়েছেন, তিনি এই প্রকল্পের সফলতা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করে বলেন, ‘যদি কোনো আন্তর্জাতিক প্রকাশনা না থাকে, তবে বুঝতে হবে সেখানে বাস্তবসম্মত কোনো ফলাফল নেই।
এগুলোকে ফলাফলের চেয়ে স্বপ্ন বলাই ভালো। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে রাশিয়ার বিজ্ঞান বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন। তারা সম্ভবত পুতিনকে তাই শোনাচ্ছে যা তিনি শুনতে চান, যাতে কোটি কোটি ডলারের তহবিল বরাদ্দ পাওয়া যায়।’ এ ছাড়া বিজ্ঞানী কোভালচুক এই বিজ্ঞানকে ক্রেমলিনের ভূ-রাজনৈতিক লড়াইয়ের সঙ্গে মিলিয়ে দাবি করেন, পশ্চিমা বিশ্ব বিজ্ঞানের মাধ্যমে এমন এক ধরনের ‘সেবক বা দাস মানব’ তৈরির চেষ্টা করছে যাদের নিজস্ব চেতনা থাকবে না।
ঐতিহাসিকভাবে বার্ধক্যকে জয় করার এই আকাঙ্ক্ষা রুশ শাসকদের জন্য নতুন কিছু নয়। ১৯২০-এর দশকে সোভিয়েত বিজ্ঞানী আলেকজান্ডার বোগদানভ রক্ত পরিবর্তনের মাধ্যমে তারুণ্য ধরে রাখার পরীক্ষা চালাতে গিয়ে মাত্র ৫৫ বছর বয়সে মারা যান। ১৯৩০-এর দশকে জোসেফ স্তালিনের প্রশংসাধন্য চিকিৎসক ওলেকসান্দর বোগোমলেটস দাবি করেছিলেন মানুষ ১৫০ বছর বাঁচতে পারে, যদিও তিনি নিজে ৬৫ বছর বয়সে মারা যান। এমনকি পুতিনের ‘ব্যক্তিগত জেরন্টোলজিস্ট’ খ্যাত ভ্লাদিমির খাভিনসন দাবি করেছিলেন মানুষ ১২০ বছর বাঁচবে, কিন্তু তিনিও ২০২৪ সালে ৭৭ বছর বয়সে মারা গেছেন।
বর্তমানে ৭৩ বছর বয়সী পুতিন দীর্ঘদিন ধরে খালি গায়ে শিকার করে বা বরফ-শীতল পানিতে ডুব দিয়ে নিজের ‘চিরতরুণ’ ইমেজ ধরে রাখার চেষ্টা করলেও বাস্তব চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। বর্তমানে উন্নত বিশ্বের তুলনায় রাশিয়ার গড় আয়ু বেশ কম। রাশিয়ায় পুরুষদের গড় আয়ু মাত্র ৬৮ বছর, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রে তা ৭৬ বছর এবং পশ্চিম ইউরোপে ৮০ বছরের বেশি। বিশ্লেষকদের মতে, ক্রেমলিনের জন্য রাশিয়ার সাধারণ নির্বাচন নিয়ন্ত্রণ করা যতটা সহজ, জীববিজ্ঞানের অমোঘ নিয়ম অর্থাৎ মৃত্যুকে ফাঁকি দেওয়া সম্ভবত ততটাই কঠিন।
সূত্র: ওয়ালস্ট্রিট জার্নাল