পৃথিবীর সবচেয়ে উঁচু স্থান। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৮ হাজার ৮৪৯ মিটার ওপরে দাঁড়িয়ে থাকা এক বিশাল বরফদুর্গ। যেখানে প্রতিটি নিঃশ্বাস সংগ্রাম, প্রতিটি পদক্ষেপ অনিশ্চয়তার বিরুদ্ধে লড়াই।
সেই দুর্জয় এভারেস্ট বারবার ডেকেছে বাংলাদেশিদেরও। আর সেই ডাকে সাড়া দিয়ে একের পর এক অভিযাত্রী তুলে ধরেছেন লাল-সবুজের পতাকা বিশ্বের সর্বোচ্চ চূড়ায়।
এ বছরের এভারেস্ট দিবসে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আছেন নুরুন্নাহার নিম্নি। তবে তার সাফল্য কেবল ব্যক্তিগত কোনো অর্জনের গল্প নয়; এটি বাংলাদেশের পর্বতারোহণের দীর্ঘ পথচলার আরেকটি উজ্জ্বল অধ্যায়।
নিম্নির জয়, বাংলাদেশের নতুন অনুপ্রেরণাদীর্ঘ প্রস্তুতি, শারীরিক ও মানসিক পরীক্ষার পর অবশেষে এভারেস্টের চূড়ায় পৌঁছেছেন নুরুন্নাহার নিম্নি। প্রথম চেষ্টায় প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে ফিরে আসতে হলেও হাল ছাড়েননি তিনি।
আরও পড়ুন
কয়েকদিন অপেক্ষার পর আবার শুরু করেন শিখর জয়ের অভিযান। মৃত্যু-ঝুঁকিপূর্ণ ‘ডেথ জোন’ অতিক্রম করে শেষ পর্যন্ত তিনি পৌঁছে যান বিশ্বের সর্বোচ্চ বিন্দুতে। এর মাধ্যমে ১৪ বছর পর কোনো বাংলাদেশি নারী আবারও এভারেস্টের শীর্ষে বাংলাদেশের পতাকা ওড়ালেন।
সমুদ্র থেকে শুরু, শেষ এভারেস্টেবাংলাদেশি অভিযাত্রার ইতিহাসে অনন্য এক নাম ইকরামুল হাসান শাকিল। ২০২৫ সালে তিনি শুরু করেছিলেন ব্যতিক্রমধর্মী এক অভিযান। কক্সবাজারের সমুদ্রসৈকত থেকে যাত্রা শুরু করে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে পৌঁছে যান এভারেস্টের চূড়ায়।
নিম্নভূমির একটি দেশ থেকে পৃথিবীর সর্বোচ্চ স্থানে পৌঁছানোর এই অভিযাত্রা আন্তর্জাতিকভাবেও প্রশংসিত হয়। এটি ছিল কেবল একটি পর্বত জয়ের গল্প নয়, বরং ধৈর্য, অধ্যবসায় ও স্বপ্নের শক্তির উদাহরণ।
নতুন প্রজন্মের উচ্চাকাঙ্ক্ষার প্রতীকবাংলাদেশের আধুনিক উচ্চপর্বতারোহণে অন্যতম আলোচিত নাম বাবর আলী। ২০২৪ সালে এভারেস্ট জয়ের পর তিনি থেমে থাকেননি।
বিশ্বের অন্যান্য ৮ হাজার মিটার উচ্চতার পর্বত অভিযানে অংশ নিয়ে বাংলাদেশের পর্বতারোহণকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের পর্বতারোহীদের সক্ষমতা প্রতিষ্ঠায় বাবর আলীর অবদান গুরুত্বপূর্ণ।
যে বিজয়ের সঙ্গে জড়িয়ে আছে শোকএভারেস্টের ইতিহাস শুধু আনন্দের নয়, বেদনারও। ২০১৩ সালে সজল খালেদ সফলভাবে এভারেস্টের চূড়ায় পৌঁছেছিলেন। কিন্তু ফেরার পথে অসুস্থ হয়ে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
পৃথিবীর সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছানোর গৌরব অর্জনের পরও তার আর দেশে ফেরা হয়নি। বাংলাদেশের পর্বতারোহণ ইতিহাসে সজল খালেদের নাম তাই সাহস ও আত্মত্যাগের প্রতীক হয়ে রয়েছে।
নারীর পদচিহ্নে বদলে যাওয়া ইতিহাস২০১২ সালের মে মাস বাংলাদেশের নারী পর্বতারোহণে এক যুগান্তকারী অধ্যায় হয়ে আছে। ১৯ মে নিশাত মজুমদার এভারেস্ট জয় করে বাংলাদেশের প্রথম নারী হিসেবে ইতিহাস গড়েন।
এর মাত্র এক সপ্তাহ পর ওয়াসফিয়া নাজরীনও পৌঁছে যান একই শিখরে। স্বল্প সময়ের ব্যবধানে দুই বাংলাদেশি নারীর এই সাফল্য সমাজে নারীর সক্ষমতা নিয়ে প্রচলিত অনেক ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করেছিল।
দুইবার এভারেস্টের শীর্ষেবাংলাদেশের পর্বতারোহণ ইতিহাসে এম এ মুহিতের অর্জন বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তিনি শুধু একবার নয়, দুইবার এভারেস্টের চূড়ায় উঠেছেন। আরও বিস্ময়কর বিষয় হলো, এভারেস্টের উত্তর ও দক্ষিণ- দুই ভিন্ন রুট ব্যবহার করে এই কৃতিত্ব অর্জন করেছেন তিনি।
বিশ্ব পর্বতারোহণ অঙ্গনেও এটি একটি বিরল অর্জন হিসেবে বিবেচিত।
যে মানুষটি পথ দেখিয়েছিলেনবাংলাদেশের এভারেস্ট অভিযানের ইতিহাসে মাইলফলক হয়ে আছে ২০১০ সালের ২৩ মে। সেদিন মুসা ইব্রাহিম প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে এভারেস্টের চূড়ায় পৌঁছান।
তার সেই সাফল্য দেশের অসংখ্য তরুণকে নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছিল। এভারেস্ট তখন আর কেবল দূরের কোনো কল্পনা ছিল না; হয়ে উঠেছিল অর্জনযোগ্য এক বাস্তব লক্ষ্য।
স্বপ্নের উচ্চতা পর্বতের চেয়েও বড়বাংলাদেশে হিমালয়ের মতো বিশাল পর্বতমালা নেই। নেই তুষারাবৃত শৃঙ্গও। তবু দেশের অভিযাত্রীরা প্রমাণ করেছেন, বড় স্বপ্ন দেখার জন্য ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতা কোনো বাধা নয়।
মুসা ইব্রাহিম থেকে নুরুন্নাহার নিম্নি-প্রত্যেকেই নিজেদের সাহস, অধ্যবসায় ও সংকল্প দিয়ে লিখেছেন একেকটি অনন্য গল্প। তাদের সাফল্য শুধু পর্বতারোহণের ইতিহাস নয়; এটি বাংলাদেশের মানুষের স্বপ্ন দেখার ক্ষমতারও প্রতীক।
এভারেস্টের চূড়ায় ওড়ানো প্রতিটি লাল-সবুজ পতাকা যেন মনে করিয়ে দেয়- সীমাবদ্ধতা মাটিতে থাকে, স্বপ্ন পৌঁছে যায় আকাশেরও ওপারে।
এএডি/