রাজধানীর মগবাজারের আদ-দ্বীন হাসপাতালে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় তদন্ত যত এগোচ্ছে, ততই সামনে আসছে হাসপাতালটির ব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার নানা ঘাটতির অভিযোগ। ঈদের আগে ঘটে যাওয়া এই মর্মান্তিক ঘটনায় এখনও মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ নিশ্চিত না হলেও তদন্তসংশ্লিষ্টদের প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে হাসপাতালের পরিবেশগত নিরাপত্তা, বায়ু চলাচল ব্যবস্থা এবং অবকাঠামোগত ত্রুটি নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের গঠিত তদন্ত কমিটি ইতোমধ্যে প্রাথমিক অনুসন্ধান শেষ করেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, যে কক্ষে নবজাতক ও প্রসূতিরা অবস্থান করছিলেন সেখানে পর্যাপ্ত বিশুদ্ধ বাতাস প্রবেশের ব্যবস্থা ছিল না। একই সঙ্গে জাতীয় ইমারত নির্মাণ বিধিমালার নির্দেশনা উপেক্ষা করে স্প্লিট এয়ার কন্ডিশনার ব্যবহারের বিষয়টিও তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।
ঘটনার দিন গভীর রাতে একের পর এক নবজাতকের অসুস্থ হয়ে পড়ার বর্ণনা দিয়েছেন পরিবারগুলো। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, শিশুদের মধ্যে হঠাৎ শ্বাসকষ্ট, অস্বাভাবিক অস্থিরতা ও বমির মতো উপসর্গ দেখা দেয়। পরে দ্রুত তাদের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে নেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত ছয় নবজাতককে বাঁচানো সম্ভব হয়নি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অস্ত্রোপচার-পরবর্তী ওয়ার্ড বা নবজাতক পরিচর্যার মতো সংবেদনশীল স্থানে বায়ু চলাচল ও পরিবেশ নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে কঠোর মানদণ্ড অনুসরণ করা বাধ্যতামূলক। তদন্তে উঠে এসেছে, সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডে বাইরের বাতাস প্রবেশের কার্যকর ব্যবস্থা ছিল না। ফলে কোনো কারণে ক্ষতিকর গ্যাস বা দূষিত বায়ু জমে থাকলে তা দ্রুত অপসারণের সুযোগ সীমিত ছিল।
এদিকে এসি থেকে গ্যাস লিকেজের সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্তসংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে, সংশ্লিষ্ট শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় পূর্বে ত্রুটি ছিল বলে তথ্য পাওয়া গেছে। তবে এই ত্রুটির সঙ্গে মৃত্যুর সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা চূড়ান্ত প্রতিবেদনের আগে নিশ্চিত করা যাচ্ছে না।
আরও পড়ুন
ঘটনার পর স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন প্রকাশ্যে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অবহেলা ও দায়িত্বহীনতার কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন, তদন্তে দায় প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তদন্তের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে হাসপাতাল ভবনের ভেতরে পরিচালিত একটি রুটির কারখানা। হাসপাতালের একটি তলায় বৈদ্যুতিক ওভেন ব্যবহার করে খাদ্য উৎপাদনের কার্যক্রম চলছিল বলে পরিদর্শনে পাওয়া গেছে। এই কারখানা থেকে কোনো ক্ষতিকর গ্যাস বা উপাদান তৈরি হয়েছিল কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
ঘটনার পর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ গভীর দুঃখ প্রকাশ করলেও নিহত শিশুদের পরিবারগুলো এটিকে নিছক দুর্ঘটনা হিসেবে মানতে নারাজ। তাদের অভিযোগ, দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, তদারকির অভাব এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতার ফলেই এই প্রাণহানি ঘটেছে।
ইতোমধ্যে একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে এবং বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন গঠনের দাবিও উঠেছে। পাশাপাশি হাসপাতালটিতে পরিচালিত ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে বিভিন্ন অনিয়মের প্রমাণ পাওয়ায় ৩ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে।
স্বাস্থ্য খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, এই ঘটনা শুধু একটি হাসপাতালের দায়বদ্ধতার প্রশ্ন নয়; বরং দেশের বেসরকারি হাসপাতালগুলোর নিরাপত্তা, অবকাঠামোগত মান এবং তদারকি ব্যবস্থার সামগ্রিক চিত্রও নতুন করে আলোচনায় এনেছে।
এএডি/