২০০১ সালের এক সকাল। ক্রেমলিনে রাশিয়ার নতুন প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের মুখোমুখি বসেছেন বিবিসির সাংবাদিক ব্রিজেট কেন্ডাল। ক্যামেরা চালু হওয়ার ঠিক আগ মুহূর্তে এক সহকারী এসে দ্রুত টেবিল থেকে পানির ছোট গ্লাসগুলো সরিয়ে নিলেন। সাংবাদিকের কৌতূহলী প্রশ্নের জবাবে পুতিন মৃদু হেসে বললেন, ‘আমরা চাই না দর্শক এগুলোকে ভদকার গ্লাস ভাবুক। তাছাড়া লাইভ সম্প্রচারের সময় গ্লাস উল্টে পানি পড়ার ঝুঁকিও নেওয়া যাবে না। টেলিভিশনের প্রচার তো এক ধরনের পারমাণবিক বোমা!’
পুতিনের এই ছোট্ট সতর্কতাই বলে দেয়, ক্ষমতার মসনদে বসার প্রথম দিন থেকেই নিজের ভাবমূর্তি ও ভিডিও চিত্রের শক্তি সম্পর্কে তিনি কতটা সচেতন ছিলেন। লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক পিটার পোমেরানৎসেভের মতে, পুতিন খুব ভালো করেই জানতেন— রাশিয়ায় ক্ষমতা ধরে রাখার সবচেয়ে বড় চাবিকাঠি হলো টেলিভিশন। আর এই টেলিভিশনকে ব্যবহার করেই এক সময়ের অন্তর্মুখী ও ক্যামেরার সামনে আড়ষ্ট এক মানুষ আজ পরিণত হয়েছেন রাশিয়ার একচ্ছত্র অধিপতিতে।
আজকের যে পুতিনকে বিশ্ব চেনে, সত্তরের দশকে তিনি ছিলেন সম্পূর্ণ ভিন্ন এক চরিত্র। সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রচারের আলো থেকে দূরে থাকা কেজিবির এক সাধারণ গোয়েন্দা কর্মকর্তা। সোভিয়েত টিভির গুপ্তচর নায়কদের দেখে অনুপ্রাণিত হওয়া পুতিন শিখেছিলেন কীভাবে ভিড়ের মধ্যে নিজেকে আড়াল করতে হয়।
১৯৯০-এর দশকে সেন্ট পিটার্সবার্গের মেয়রের সহকারী কিংবা মস্কোয় বোরিস ইয়েলৎসিনের প্রশাসনে কাজ করার সময়কার ছবিগুলোতে পুতিনকে সব সময় দেখা যেত পেছনের সারিতে, ফ্রেমের এক কোণায়। সোভিয়েত নেতা নিকিতা ক্রুশ্চেভের প্রপৌত্রী নিনা ক্রুশ্চেভ জানান, সেই সময়ে কেজিবি মহলে পুতিনের ডাকনাম ছিল ‘মথ’ বা পতঙ্গ; যিনি চাইলেই ছায়ার আড়ালে নিজেকে লুকিয়ে ফেলতে পারতেন।
১৯৯৯ সালের শেষলগ্নে আকস্মিকভাবে রাশিয়ার ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পান পুতিন। আর তখনই শুরু হয় তার খোলস বদলের পালা। পূর্বসূরি বোরিস ইয়েলৎসিনের অতিরিক্ত মদ্যপানের অভ্যাস জনসমক্ষে রাশিয়াকে বহুবার বিব্রত করেছিল। পুতিন ও তার জনসংযোগ দল প্রথমেই সেই ভাবমূর্তি ভাঙার কাজে হাত দেয়। জনগণকে বার্তা দেওয়া হলো— নতুন নেতা মদ্যপান করেন না, তিনি সুস্থ ও কর্মক্ষম।
পররাষ্ট্রনীতি বিশেষজ্ঞদের বার্ষিক বৈঠকে যখন দামি ওয়াইনের বন্যা বইত, পুতিন তখন কাপে নিতেন মধু মেশানো চা। ঐতিহ্যবাহী প্যানকেকের স্বাদ বাড়াতে সামান্য ভদকা মিশিয়ে পুতিনকে খাওয়ানো এক জাদুঘর তত্ত্বাবধায়ক বিবিসি সাংবাদিককে আকুতি করে বলেছিলেন, ‘দয়া করে কাউকে বলবেন না, জানাজানি হলে আমার চাকরি থাকবে না।’
একই সাথে পুতিনকে উপস্থাপন করা হতে থাকে এক ‘অ্যাকশন হিরো’ হিসেবে। কখনো যুদ্ধবিমানের ককপিটে পাইলটের হেলমেট মাথায়, কখনো জুডো ম্যাটে প্রতিপক্ষকে আছাড় মারছেন তিনি। আর ২০০৭ সালে প্রকাশিত খালি গায়ে ঘোড়ায় চড়ার কিংবা বরফশীতল নদীতে মাছ ধরার সেই বিখ্যাত ছবিগুলো তো পুতিনকে এক অজেয় পুরুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে।
২০০৭ সালে ‘টাইম’ সাময়িকীর বর্ষসেরা ব্যক্তি হওয়ার পর আলোকচিত্রী প্লাটন তার যে ছবিটি তোলেন, সেখানে পুতিনকে দেখা যায় চেয়ারে হেলান দিয়ে সরাসরি ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে থাকতে— যেন কোনো পরাক্রমশালী রুশ জার কিংবা মাফিয়া প্রধান।
কিন্তু এই অতি-পৌরুষত্ব প্রদর্শনের আড়ালে কি কোনো অনিশ্চয়তা লুকিয়ে ছিল? বিশ্লেষকদের মতে, ২০০৮ সালে চার বছরের জন্য প্রধানমন্ত্রীর পদে বসার পরও পুতিনের এমন ছবি আসত মূলত এই বার্তা দিতে যে, দিমিত্রি মেদভেদেভ রাষ্ট্রপতি হলেও আসল ক্ষমতা এখনো পুতিনের হাতেই।
২০১১ সালে পুতিনের চেহারায় এক নাটকীয় পরিবর্তন আসে। তার মুখ থেকে সব অভিব্যক্তি হারিয়ে যায়, ত্বক দেখায় অতিরিক্ত মসৃণ। জল্পনা শুরু হয়— এটি কি বোটক্সের কারসাজি নাকি স্টেরয়েড ব্যবহারের ফল? এর কিছুদিন পর ২০১২ সালের নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে মঞ্চে পুতিনের অশ্রুসজল চোখ নতুন আলোচনার জন্ম দেয়। সমালোচকদের একাংশ একে ‘রাশিয়ার ত্রাণকর্তা’ সাজবার সুচিন্তিত অভিনয় বললেও, সাংবাদিক ব্রিজেট কেন্ডালের মতে সেই কান্না ছিল স্বস্তির; কারণ তীব্র গণবিক্ষোভের মুখেও ক্ষমতা ধরে রাখতে পেরেছিলেন তিনি।
অনেকেই ধারণা করেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে— বিশেষ করে ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রায় সামরিক অভিযান এবং কোভিড মহামারির পর থেকে তিনি আরও বেশি মাত্রায় সন্দিহান ও শঙ্কাগ্রস্ত (paranoid) হয়ে উঠেছেন। এখন তিনি যখনই ক্যামেরার সামনে আসেন, তা অত্যন্ত নিখুঁতভাবে সাজানো থাকে; যেন তিনি বাইরের জগৎ থেকে নিজেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন রাখতে চান।
‘তিনি স্পষ্টতই সতর্ক থাকতে চান যেন কেউ তাঁর অবস্থান সহজে শনাক্ত করতে না পারে। এটি এমন একজন মানুষকে দেখায় যিনি নিজের নিরাপত্তা— তা জীবাণু হোক কিংবা গুপ্তহত্যার চেষ্টা— তা নিয়ে অত্যন্ত ভীত’, বলেন ফিওনা হিল।
ইউক্রেনের যুদ্ধই এখন পুতিনের ইমেজের মূল কেন্দ্রবিন্দু। অভিজ্ঞ রাশিয়ান সাংবাদিক মিখাইল ফিশম্যান বলেন, ‘আমরা যদি ২০১২ সালে ক্রেমলিনে ফিরে আসার পর পুতিনের দিকে তাকাই, তিনি নিজেই তখন হয়তো পুরোপুরি জানতেন না যে তিনি আসলে কী চান, তাঁর লক্ষ্য কী। কিন্তু এখন তিনি বিশ্বাস করেন যে তিনি অবশেষে তাঁর জীবনের আসল মিশন খুঁজে পেয়েছেন, আর তা হলো যুদ্ধ।’
ক্ষমতা গ্রহণের সিকি শতাব্দী পর, আজকের পুতিনকে অত্যন্ত দূরবর্তী এবং অনমনীয় দেখায়— যেন নিজের তৈরি করা এক খাঁচায় তিনি নিজেই বন্দি হয়ে গেছেন। যে গতিশীল ক্রীড়াবিদ এবং অ্যাকশন হিরোর ইমেজ দিয়ে তিনি একসময় নিজেকে দুনিয়ার সামনে চেনাতে চেয়েছিলেন, আজকের এই রূপটি তার থেকে অনেক, অনেক দূরে।
সূত্র : বিবিসি
সময়ের আলো/জেডি