রাজধানীর সড়কে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা ‘এআই’ (AI) ভিত্তিক আধুনিক ট্রাফিক নজরদারি ব্যবস্থা ফাঁকি দিতে মোটরসাইকেলের নম্বরপ্লেট ঢেকে চলাচলের ঘটনায় অভিযুক্ত চালককে গ্রেফতার করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)।
সিসিটিভি ফুটেজ ও তথ্যপ্রযুক্তি বিশ্লেষণের মাধ্যমে প্রায় এক সপ্তাহের চিরুনি অভিযান চালিয়ে চালককে শনাক্তের পর ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে তাকে এক মাসের কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
মঙ্গলবার (২ জুন) ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) মো: আনিছুর রহমান। দণ্ডপ্রাপ্ত চালকের নাম লাবলু হক (৩৮)। তিনি পুরান ঢাকার লালবাগ এলাকার বাসিন্দা।
পুলিশ জানায়, সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলে একটি ছবি ও ভিডিও ভাইরাল হয়। যেখানে দেখা যায়, এক মোটরসাইকেল আরোহী ট্রাফিক আইন ফাঁকি দিতে তাঁর নম্বরপ্লেটের শেষ তিনটি ডিজিট (সংখ্যা) কৌশলে ঢেকে রেখেছেন। বিষয়টি নজরে আসার পরই ঢাকা মহানগর পুলিশ ঘটনাটিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে তদন্তে নামেন। কারণ, একজন ব্যক্তি এভাবে পার পেয়ে গেলে প্রযুক্তিনির্ভর নতুন ট্রাফিক ব্যবস্থায় অন্যরাও আইন ভাঙতে উৎসাহিত হতো।
সংবাদ সম্মেলনে ডিএমপির কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের উপকমিশনার রাকিব হোসেন তদন্তের রোমাঞ্চকর বিবরণ তুলে ধরেন।
তিনি জানান, ভাইরাল হওয়া ছবিতে চালকের মুখ স্পষ্ট ছিল না এবং ঘটনাটি ঠিক কোথায় ঘটেছে তাও নিশ্চিত ছিল না। পুলিশ প্রাথমিকভাবে ছবি ও ভিডিওর পারিপার্শ্বিকতা বিশ্লেষণ করে ধারণা করে, এটি রাজধানীর সাতরাস্তা মোড়ের বিজি প্রেস সংলগ্ন এলাকার।
এরপর ওই এলাকার বিপুল পরিমাণ সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করে চুলচেরা বিশ্লেষণ শুরু হয়। যেহেতু নম্বরপ্লেটের তিনটি সংখ্যা ঢাকা ছিল, তাই পুলিশ সম্ভাব্য বিভিন্ন সংখ্যার সমন্বয় (কম্বিনেশন) তৈরি করে মোটরসাইকেলের রং, মডেল ও অন্যান্য বৈশিষ্ট্য মিলিয়ে একটি তালিকা প্রস্তুত করে। ঈদের ছুটির মধ্যেও পুলিশ সদস্যরা মাঠপর্যায়ে অক্লান্ত পরিশ্রম করে প্রায় ৭০ থেকে ৮০টি সন্দেহভাজন মোটরসাইকেলের তথ্য যাচাই-বাছাই করেন। অবশেষে সব তথ্যের মিল পাওয়ার পর গতকাল সোমবার চালক লাবলু হককে শনাক্ত ও গ্রেফতার করতে সক্ষম হয় পুলিশ।
জিজ্ঞাসাবাদে অভিযুক্ত লাবলু হক জানান, ঘটনার দিন তেজগাঁও এলাকায় একটি জরুরি কাজে যাওয়ার সময় তার মাথায় হেলমেট ছিল না। রাস্তায় বসানো এআই ক্যামেরার স্বয়ংক্রিয় মামলা ও জরিমানা এড়াতেই তিনি বুদ্ধি খাটিয়ে মোটরসাইকেলের নম্বরপ্লেটের অংশবিশেষ ঢেকে দিয়েছিলেন। পরবর্তীতে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হাজির করা হলে তিনি নিজের দোষ স্বীকার করেন, যার পরিপ্রেক্ষিতে আদালত তাকে এক মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড প্রদান করেন।
সংবাদ সম্মেলনে ডিএমপি কমিশনার নতুন প্রযুক্তিনির্ভর ট্রাফিক ব্যবস্থার প্রতি নগরবাসীর অভূতপূর্ব সাড়ার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ‘আমরা ভেবেছিলাম নতুন এই নিয়মের সঙ্গে মানুষের মানিয়ে নিতে অন্তত ছয় মাস সময় লাগবে। কিন্তু অত্যন্ত আনন্দের বিষয়, মাত্র ১৫ দিনের মাথায় ঢাকার সড়কে দৃশ্যমান পরিবর্তন এসেছে। এমনকি ঈদের ফাঁকা সড়কেও মানুষ ট্রাফিক নিয়ম মেনে চলেছেন।’
তিনি আরও স্পষ্ট করে বলেন, ‘পুলিশের মূল উদ্দেশ্য মামলা বা সাজা বাড়ানো নয়, বরং নাগরিকদের মধ্যে আইন মানার সংস্কৃতি তৈরি করা। তবে কেউ যদি প্রযুক্তির চোখে ধুলো দিয়ে ইচ্ছাকৃতভাবে আইন অমান্য করার চেষ্টা করেন, তবে তাঁর বিরুদ্ধে কঠোরতম ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
একই সাথে ট্রাফিক পুলিশ সদস্যদের সাধারণ মানুষের সঙ্গে বিনয়ী ও পেশাদার আচরণ করার কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।
সময়ের আলো/জেডি