নতুন করে আলোচনায় ‘পিতা-মাতা ভরণপোষণ আইন’

খন্দকার ওবায়দুল্লাহ

আইন-আদালত

রাজধানীর পল্লবীতে ৭৫ বছর বয়সী নূর জাহান বেগমের পচা-গলা মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা দেশজুড়ে আলোড়ন তৈরি করেছে। একই বাসায় মেয়ের বসবাস,

2026-06-03T19:02:40+00:00
2026-06-03T20:08:49+00:00
 
  রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬,
৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
আইন-আদালত
ফ্ল্যাটে মায়ের নিঃসঙ্গ মৃত্যু
নতুন করে আলোচনায় ‘পিতা-মাতা ভরণপোষণ আইন’
খন্দকার ওবায়দুল্লাহ
প্রকাশ: বুধবার, ৩ জুন, ২০২৬, ৭:০২ পিএম  আপডেট: ০৩.০৬.২০২৬ ৮:০৮ পিএম
নতুন করে আলোচনায় ‘পিতা-মাতা ভরণপোষণ আইন’। গ্রাফিক্স : সময়ের আলো
রাজধানীর পল্লবীতে ৭৫ বছর বয়সী নূর জাহান বেগমের পচা-গলা মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা দেশজুড়ে আলোড়ন তৈরি করেছে। একই বাসায় মেয়ের বসবাস, দুই ছেলে উচ্চপদস্থ ও প্রতিষ্ঠিত পেশাজীবী— তবুও কয়েক দিন ধরে মৃত অবস্থায় পড়ে ছিলেন বৃদ্ধা। এ ঘটনায় শুধু মানবিক ও সামাজিক প্রশ্নই নয়, আইনি প্রশ্নও সামনে আসছে।

এই ঘটনার পর নতুন করে আলোচনায় এসেছে পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন, ২০১৩ এবং এর ২০২৩ সালের বিধিমালা। আইন অনুযায়ী, সক্ষম সন্তানদের জন্য পিতা-মাতার ভরণপোষণ নিশ্চিত করা শুধু নৈতিক দায়িত্ব নয়, এটি একটি আইনি বাধ্যবাধকতাও।


কেন করা হয়েছিল এই আইন?

বাংলাদেশে যৌথ পরিবারের সংখ্যা কমে যাওয়া, নগরায়ণ, কর্মব্যস্ততা এবং পারিবারিক সম্পর্কের পরিবর্তনের কারণে অনেক বৃদ্ধ পিতা-মাতা অবহেলা ও আর্থিক অনিশ্চয়তার মুখে পড়ছেন। এই বাস্তবতায় ২০১৩ সালে সরকার ‘পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন’ প্রণয়ন করে। আইনের মূল উদ্দেশ্য ছিল বৃদ্ধ পিতা-মাতার খাদ্য, বাসস্থান, চিকিৎসা ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করা এবং সন্তানদের দায়িত্বকে আইনি কাঠামোর মধ্যে আনা।


সন্তানদের কী কী দায়িত্ব নির্ধারণ করেছে আইন?

পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন, ২০১৩ অনুযায়ী প্রত্যেক সক্ষম সন্তানের জন্য পিতা-মাতার ভরণপোষণ নিশ্চিত করা বাধ্যতামূলক। আইনটি শুধু আর্থিক সহায়তার বিষয় নয়, বরং একজন বৃদ্ধ বাবা বা মায়ের সামগ্রিক কল্যাণ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেয়।

আইন অনুযায়ী সন্তানের দায়িত্বের মধ্যে রয়েছে বাবা-মায়ের খাদ্যের ব্যবস্থা করা, প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা, নিরাপদ বাসস্থানের ব্যবস্থা করা এবং পোশাকসহ অন্যান্য মৌলিক চাহিদা পূরণ করা। তবে দায়িত্ব এখানেই শেষ নয়। বৃদ্ধ বয়সে অনেক মানুষ একাকীত্ব, মানসিক অবসাদ ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতায় ভোগেন। তাই আইন নিয়মিত খোঁজখবর নেওয়া এবং মানসিক সঙ্গ দেওয়ার বিষয়টিকেও সমান গুরুত্ব দিয়েছে।

যদি পরিবারের একাধিক সন্তান থাকে, তাহলে ভরণপোষণের দায়িত্ব একজনের ওপর চাপিয়ে দেওয়া যাবে না। আইন অনুযায়ী সবাই নিজেদের মধ্যে আলোচনা ও সমন্বয়ের মাধ্যমে বাবা-মায়ের দায়িত্ব পালন করবেন। অর্থাৎ দায়িত্বটি যৌথ এবং সমানভাবে সব সন্তানের ওপর বর্তায়।


একই সঙ্গে বসবাসের বিষয়টি কেন গুরুত্বপূর্ণ?

আইনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, বাবা-মাকে তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন করা যাবে না। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, সন্তানরা আর্থিক সহায়তা দিলেও বৃদ্ধ বাবা-মা একা থাকেন কিংবা অবহেলার শিকার হন। এই বাস্তবতা বিবেচনায় আইন শুধু অর্থনৈতিক সহায়তার কথা বলেনি, বরং পারিবারিক বন্ধন ও সহাবস্থানের বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়েছে।

আইন অনুযায়ী, সম্ভব হলে সন্তানদের সঙ্গে একই বাসায় বা একই পরিবেশে বাবা-মায়ের বসবাস নিশ্চিত করতে হবে। যদি চাকরি, ব্যবসা বা অন্য কোনো কারণে একসঙ্গে থাকা সম্ভব না হয়, তাহলে সংশ্লিষ্ট সন্তানকে তার আয়ের একটি নির্দিষ্ট অংশ নিয়মিত বাবা-মায়ের কাছে পাঠাতে হবে।

এই বিধানটি মূলত নিশ্চিত করতে চায় যে, দূরে থাকলেও সন্তান যেন দায়িত্ব এড়িয়ে যেতে না পারে এবং বাবা-মা যেন আর্থিকভাবে নিরাপদ থাকেন।


বৃদ্ধাশ্রমে পাঠানো কি বৈধ?

বাংলাদেশের আইনে বাবা-মায়ের ইচ্ছার বিরুদ্ধে তাদের বৃদ্ধাশ্রমে পাঠানো বেআইনি। এখানে আইনের মূল বার্তা হলো, বাবা-মা শুধু ভরণপোষণের বিষয় নয়; তারা পরিবারের সদস্য এবং তাদের মর্যাদা ও সামাজিক অবস্থান রক্ষা করা সন্তানের দায়িত্ব। তাই শুধু খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা করলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না।

অনেক সময় দেখা যায়, সন্তানরা নিজের সুবিধার জন্য বাবা-মাকে পরিবারের বাইরে সরিয়ে দিতে চান। আইন এ ধরনের প্রবণতাকে নিরুৎসাহিত করেছে। যদি কোনো বা বা মা স্বেচ্ছায় বৃদ্ধাশ্রমে থাকতে চান, সেটি ভিন্ন বিষয়। কিন্তু তাদের মতামত উপেক্ষা করে জোরপূর্বক সেখানে পাঠানো আইনের পরিপন্থী।


আইন অমান্য করলে কী শাস্তি?

আইনটি শুধু নৈতিক আহ্বান নয়, এর সঙ্গে শাস্তির বিধানও যুক্ত রয়েছে। যদি কোনো সক্ষম সন্তান ইচ্ছাকৃতভাবে বাবা-মায়ের ভরণপোষণ না করেন কিংবা দায়িত্ব পালনে অবহেলা করেন, তাহলে তার বিরুদ্ধে মামলা করা যেতে পারে। দোষী প্রমাণিত হলে সর্বোচ্চ এক লাখ টাকা জরিমানা করা হতে পারে। জরিমানা পরিশোধ না করলে সর্বোচ্চ তিন মাসের কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। এছাড়া বাবা-মাকে জোর করে সম্পত্তি লিখে দিতে বাধ্য করা, প্রতারণার মাধ্যমে সম্পত্তি হাতিয়ে নেওয়া বা তাদের সম্পত্তির অধিকার থেকে বঞ্চিত করার চেষ্টাও আইনত অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।


মামলা করবেন কীভাবে?

২০২৩ সালের বিধিমালায় মামলা দায়েরের একটি নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া উল্লেখ করা হয়েছে। যদি কোনো বাবা-মা মনে করেন যে তারা ভরণপোষণ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, তাহলে তারা নির্ধারিত ফরমে আদালতে লিখিত অভিযোগ করতে পারবেন। এই আইনের অধীন অপরাধকে আমলযোগ্য, জামিনযোগ্য এবং আপোষযোগ্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।

অর্থাৎ পুলিশ অভিযোগ গ্রহণ করতে পারবে, অভিযুক্ত ব্যক্তি জামিনের সুযোগ পাবেন এবং আদালত চাইলে উভয়পক্ষের সম্মতিতে আপোষ-মীমাংসার সুযোগও দিতে পারবেন। আইনের উদ্দেশ্য মূলত পারিবারিক সম্পর্ক পুনর্গঠন করা, শুধু শাস্তি দেওয়া নয়।


নূর জাহানের ঘটনা কি আইনি প্রশ্নও তৈরি করছে?

পল্লবীর নূর জাহান বেগমের মৃত্যুর ঘটনা বর্তমানে তদন্তাধীন। তার মৃত্যুর প্রকৃত কারণ ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর নিশ্চিত হওয়া যাবে। তবে ঘটনাটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে নিয়ে এসেছে— পরিবারের সদস্যরা কি তার প্রতি তাদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করেছিলেন? 

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, ভরণপোষণ বলতে শুধু খাবার বা অর্থ দেওয়া বোঝায় না। একজন বৃদ্ধ মানুষ নিরাপদ পরিবেশে আছেন কি না, নিয়মিত চিকিৎসা পাচ্ছেন কি না, তার শারীরিক ও মানসিক অবস্থার খোঁজ নেওয়া হচ্ছে কি না— এসব বিষয়ও ভরণপোষণের অংশ। তাই নূর জাহান বেগমের ঘটনা সামাজিক ও মানবিক প্রশ্নের পাশাপাশি আইনি দায়বদ্ধতার প্রশ্নও সামনে এনেছে।


আইন আছে, কিন্তু প্রয়োগ কতটা?

বাংলাদেশে ‘পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন’ কার্যকর হওয়ার এক দশকের বেশি সময় পেরিয়ে গেছে। কিন্তু বাস্তবে এই আইনে দায়ের হওয়া মামলার সংখ্যা খুবই সীমিত। এর অন্যতম কারণ হলো সামাজিক সংকোচ। অনেক বাবা-মা নিজেদের সন্তানদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে চান না। অনেকেই মনে করেন, মামলা করলে পারিবারিক সম্পর্ক আরও খারাপ হবে। আবার অনেকে আইন সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণাও রাখেন না। ফলে আইন থাকলেও বহু বৃদ্ধ মানুষ অবহেলা, একাকীত্ব ও অনিশ্চয়তার মধ্যে জীবনযাপন করেন।



  বিষয়:   মায়ের মৃত্যু  ভরণপোষণ আইন  পিতা-মাতা 


Loading...
Loading...
আইন-আদালত- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: