টানা ২৪ বছর ধরে বিশ্বমঞ্চে সোনালি ট্রফিটার দেখা নেই। ছটে ছটে গিয়েও বারবার ট্রফিটা হাতছাড়া হওয়ার আক্ষেপ এবার যেন যেকোনো মূল্যে ঘোচাতে চায় পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল। ২০২৬ বিশ্বকাপে ‘হেক্সা’ বা ষষ্ঠ শিরোপা জয়ের মিশনকে সামনে রেখে তাই এবার মাঠের ফুটবলের পাশাপাশি মাঠের বাইরের শৃঙ্খলাকেও সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে সেলেসাওরা। ফুটবলাররা যাতে কোনোভাবেই মাঠের বাইরের কোনো কিছুতে মনোযোগ না হারান, সে জন্য দলটির জন্য তৈরি করা হয়েছে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রিত, কঠোর এবং সুশৃঙ্খল এক পরিবেশ।
ফুটবলারদের দৈনন্দিন আচরণ, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, পরিবারের সান্নিধ্য, ম্যাচ-পরবর্তী ক্লান্তি দূর করা (রিকভারি) এবং ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষা করার মতো স্পর্শকাতর বিষয়গুলোকে এক সুতোয় গেঁথে এবার এক নজিরবিহীন মহাপরিকল্পনা সাজিয়েছে ব্রাজিলিয়ান ফুটবল কনফেডারেশন (সিবিএফ)। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর মাটিতে ৪৮ দলের দীর্ঘ ও ক্লান্তিকর এই ফুটবল মহাযজ্ঞে খেলোয়াড়রা যেন শতভাগ চাপমুক্ত থেকে মাঠের পারফরম্যান্সে মনোনিবেশ করতে পারেন, মূলত সেই চিন্তাভাবনা থেকেই এই বিশেষ ব্যবস্থা।
গত ১৮ মে বিশ্বকাপের জন্য ২৬ সদস্যের চূড়ান্ত তারকাবহুল দল ঘোষণা করেছেন মাস্টারমাইন্ড কোচ কার্লো আনচেলত্তি। স্কোয়াড ঘোষণার পর থেকেই শুরু হয়ে গেছে সিবিএফের কঠোর মনিটরিং। টুর্নামেন্ট চলাকালীন ম্যাচের বাইরে খেলোয়াড়দের ২৪ ঘণ্টার রুটিন সামলাতে এবার একটি সুনির্দিষ্ট ‘আচরণ বিধিমালা’ বা গাইডলাইন তৈরি করা হয়েছে।
এই নিয়মের বড় একটা অংশজুড়ে থাকছে মোবাইল ফোন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম (সোশ্যাল মিডিয়া) ব্যবহারের ওপর কড়া নিষেধাজ্ঞা। ম্যাচের আগে বা ক্যাম্পের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে ফুটবলাররা চাইলেই ইন্টারনেটের দুনিয়ায় ডুব দিতে পারবেন না। বাইরের সমালোচনা বা আলোচনা যাতে দলের ভেতর মানসিক চাপ তৈরি করতে না পারে, সেদিকেই সবচেয়ে বেশি নজর রাখছে বোর্ড।
বিগত বিশ্বকাপগুলোতে দেখা গেছে খেলোয়াড়দের স্ত্রী, সন্তান বা পরিবারের সদস্যরা একই হোটেলে থাকছেন, যা অনেক সময় খেলোয়াড়দের মনোসংযোগে ব্যাঘাত ঘটায়। এবার সেই সুযোগ একদমই থাকছে না। নতুন নিয়ম অনুযায়ী ফুটবলারদের পরিবারের সদস্যরা কোনোভাবেই দলের মূল হোটেলে অবস্থান করতে পারবেন না। তাদের জন্য সম্পূর্ণ আলাদা হোটেলের ব্যবস্থা করেছে সিবিএফ। এমনকি পরিবারের সদস্যরা চাইলেই ইচ্ছামতো ম্যাচের টিকেট পাবেন না, তাদের জন্য একটা নির্দিষ্ট কোটায় টিকেট বরাদ্দ দেওয়া হবে।
দল মাঠের লড়াইয়ের সময় যে হোটেলে উঠবে, সেখানে ফুটবলার ও অফিসিয়ালদের প্রতিনিধি দল ছাড়া বাইরের কারও প্রবেশের বিন্দুমাত্র অনুমতি থাকবে না। পুরো দল যাতে একবারে নিরিবিলি ও নিখাদ এক ব্যক্তিগত পরিবেশ পায়, তা নিশ্চিত করতে হোটেল বুকিংয়ে কঠোর নিয়ম মানা হচ্ছে।
নিজেদের কৌশল প্রতিপক্ষের চোখ থেকে আড়াল করতে এবার অনুশীলনেও কঠোর গোপনীয়তা বজায় রাখছে ব্রাজিল। ট্রেনিং সেন্টারের বেশিরভাগ অনুশীলন সেশনই হবে রুদ্ধদ্বার বা ‘ক্লোজড ডোর’। সেখানে সাধারণ দর্শক তো দূরের কথা, মিডিয়ার প্রবেশাধিকারও থাকবে সীমিত। দল যখন অনুশীলনে ব্যস্ত থাকবে, তখন মাঠের চারপাশে স্থানীয় পুলিশের কড়া পাহারা থাকবে, যাতে কোনো স্পাই বা বাইরের কেউ দলের রণকৌশল দেখে নিতে না পারে।
কঠোর নিয়মের বেড়াজাল থাকলেও ফুটবলারদের স্বস্তি ও ফিটনেসের বিষয়টি বেশ আধুনিক উপায়ে সামলাচ্ছে সিবিএফ। প্রতিটি ম্যাচের পরদিন খেলোয়াড়দের শরীরকে চাঙ্গা করতে বাধ্যতামূলক বিশ্রামের সময় নির্ধারিত থাকবে। এবারের বিশ্বকাপে ব্রাজিলের এই মহাপরিকল্পনার বড় একটা অংশজুড়ে থাকছে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার।
খেলোয়াড়দের পেশির ক্লান্তি, হার্ট রেট ও সার্বিক ফিটনেস প্রতিনিয়ত নিখুঁতভাবে পর্যবেক্ষণ করতে মাঠে ও ল্যাবে ব্যবহার করা হবে অত্যাধুনিক স্ক্যানার, সেন্সর এবং হাই-পারফরম্যান্স ইকুইপমেন্ট। এই পুরো বিষয়টি দেখভালের জন্য থাকছে আন্তর্জাতিক মানের এক বিশেষজ্ঞ প্যানেল। এ ছাড়া টুর্নামেন্ট চলাকালীন ফুটবলারদের ডায়েট ও পুষ্টির মান ঠিক রাখতে দলের সঙ্গে ভ্রমণ করছেন একজন বিশেষ রাঁধুনি (শেফ)। পাশাপাশি পারফরম্যান্সের ধারা ধরে রাখতে বিশ্বমানের ক্রীড়াসামগ্রীর ব্যবস্থাও রাখা হচ্ছে।
বিশ্বকাপের দীর্ঘ পথচলার জন্য ইতিমধ্যেই ব্রাজিলের বেসক্যাম্প চূড়ান্ত করা হয়েছে। টুর্নামেন্ট চলাকালীন সেলেসাওরা নিউজার্সির অপরূপ সুন্দর বাস্কিং রিজের ‘দ্য রিজ হোটেল’-এ অবস্থান করবে। আর নিজেদের ধারালো ফুটবল কৌশল ঝালিয়ে নিতে তারা মরিস্টাউনের ‘কলাম্বিয়া পার্ক ট্রেনিং সেন্টার’-এ নিয়মিত অনুশীলন সারবে।
এবারের বিশ্বকাপে গ্রুপ ‘সি’-তে ব্রাজিলের প্রতিপক্ষ মরক্কো, হাইতি এবং স্কটল্যান্ড। আগামী ১৪ জুন নিউজার্সির মাঠে আফ্রিকান পরাশক্তি মরক্কোর বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে হেক্সা মিশন শুরু করবে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। এরপর গ্রুপ পর্বের বাকি ম্যাচগুলোতে হাইতি ও স্কটল্যান্ডের মুখোমুখি হবে আনচেলত্তির শিষ্যরা। ফুটবলপ্রেমীদের নজর এখন এটাই দেখার যে, মাঠের বাইরের এই কঠোর ‘মিলিটারি শাসন’ ব্রাজিলকে তাদের বহুল প্রতিক্ষিত ষষ্ঠ বিশ্বকাপ ট্রফি এনে দিতে পারে কি না।