ইসরায়েল ও লেবানন সরকারের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত যুদ্ধবিরতি এবং এর শর্তাবলি কঠোর ভাষায় প্রত্যাখ্যান করেছে লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ। ইরান-সমর্থিত এই গোষ্ঠীর প্রধান নাইম কাসেম এক বিবৃতিতে চলমান এই আলোচনাকে লেবাননের জন্য ‘ব্যর্থ’ ও ‘লজ্জাজনক’ বলে অভিহিত করেছেন। তিনি দাবি করেন, লেবাননের একটি বড় অংশ এই চুক্তিকে সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে।
সম্প্রতি ওয়াশিংটনে যুক্তরাষ্ট্র-মধ্যস্থতাকারী আলোচনার চতুর্থ দফার পর ইসরায়েল ও লেবানন তাদের ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি নবায়নের ঘোষণা দেয়। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী লেবাননের ভেতরে কিছু ‘পাইলট’ নিরাপত্তা অঞ্চল গঠন করার কথা বলা হয়েছে, যেখানে হিজবুল্লাহর কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকবে। এছাড়া হিজবুল্লাহকে ইসরায়েলের ওপর হামলা বন্ধ করা এবং ইসরায়েল সীমান্ত থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার উত্তরে লিতানি নদীর ওপারে তাদের যোদ্ধাদের সরিয়ে নেওয়ার শর্ত দেওয়া হয়। তবে এই আলোচনায় হিজবুল্লাহ কোনো পক্ষ ছিল না।
নাইম কাসেম টেলিভিশনে প্রচারিত এক বার্তায় স্পষ্ট জানিয়ে দেন যে, হামলা ও দখলদারিত্বের মুখে হিজবুল্লাহর যোদ্ধাদের দক্ষিণ লেবানন থেকে সরিয়ে নেওয়ার শর্ত মেনে নেওয়ার অর্থ হলো শত্রুর লক্ষ্যপূরণ এবং নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ। যতক্ষণ পর্যন্ত ইসরায়েলি দখলদারিত্ব বজায় থাকবে এবং লেবাননের গ্রামে গ্রামে বোমাবর্ষণ চলবে, ততক্ষণ তাদের প্রতিরোধ সংগ্রাম জারি থাকবে এবং উত্তর ইসরায়েলের বসতিগুলোও নিরাপদ থাকবে না। তিনি লেবানন সরকারকে এই ‘লজ্জাজনক নাটক’ বন্ধ করার আহ্বান জানান।
এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, তিনি হিজবুল্লাহ এবং ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে কথা বলেছেন এবং শান্তি প্রক্রিয়ায় অগ্রগতি হচ্ছে। ট্রাম্প আশা প্রকাশ করে বলেন, দীর্ঘ বছর ধরে সংকটে থাকা লেবানন যেন অবশেষে কিছুটা শান্তি পায়। তবে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধবিরতির সংজ্ঞা নিয়ে কিছুটা ভিন্ন সুর শোনা গেছে তার কণ্ঠে। তিনি মন্তব্য করেন, ওই অঞ্চলে যুদ্ধবিরতি মানে হলো একটু ‘পরিমিত বা কম মাত্রায়’ একে অপরকে লক্ষ্য করে গুলি চালানো।
হিজবুল্লাহর এই আপসহীন অবস্থানের প্রতিফলন দেখা গেছে বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চলীয় শহরতলি— যা দাহিয়াহ নামে পরিচিত এবং হিজবুল্লাহর শক্তিশালী ঘাঁটি হিসেবে বিবেচিত— সেখানকার সাধারণ মানুষের মাঝেও। দীর্ঘ ২৫ বছর ধরে সেখানে ব্যবসা করা সামি নামের এক দোকানদার জানান, যুদ্ধবিরতি কখনো একতরফা হতে পারে না, এটি হতে হবে সব পক্ষের সম্মতিতে। অন্যথায় এটি শান্তি চুক্তি নয়, বরং আত্মসমর্পণের শামিল।
লেবানন সরকারের আশা ছিল, ইসরায়েলের সাথে বিরল এই আলোচনার মাধ্যমে হয়তো হিজবুল্লাহকেও শান্তির পথে টেনে আনা সম্ভব হবে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র চাচ্ছিল এই চুক্তির মাধ্যমে ইরানের সঙ্গে তাদের একটি বৃহত্তর শান্তি চুক্তির পথ সুগম করতে। কিন্তু লেবাননের সাধারণ মানুষের বড় অংশ হিজবুল্লাহর সমর্থক না হলেও, তারা ইসরায়েলি আগ্রাসনকেও সহজভাবে নিতে পারছে না। এই সুযোগে হিজবুল্লাহ নিজেদের ইসরায়েল-প্রতিরোধী একমাত্র শক্তি হিসেবে জাহির করার রাজনৈতিক সুবিধা লুফে নিচ্ছে।
চুক্তি নিয়ে এই টানাপোড়েনের মধ্যেই লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউন জানিয়েছেন, সব পক্ষ চূড়ান্ত অনুমোদন দিলে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে যুদ্ধবিরতি কার্যকর করা সম্ভব। তবে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ স্পষ্ট করে দিয়েছেন, সন্ত্রাসী অবকাঠামো ধ্বংস না হওয়া পর্যন্ত তাদের স্থল অভিযান ও বিমান হামলা অব্যাহত থাকবে।
বাস্তবেও গত বৃহস্পতিবার দক্ষিণ লেবাননজুড়ে ব্যাপক ইসরায়েলি বিমান হামলা চলেছে, যার ফলে বকা উপত্যকার সোহমোরসহ বিভিন্ন এলাকায় বেশ কয়েকজন নিহত হয়েছেন। এছাড়া লেবাননে নিয়োজিত জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী বাহিনী (আনিফিল) জানিয়েছে, দক্ষিণ লেবাননের মারজায়াউনে একটি মর্টার হামলায় মিলোভান জোভানোভিচ নামের এক সার্বিয়ান শান্তিরক্ষী নিহত হয়েছেন। ইসরায়েলি বাহিনী এই হামলার জন্য হিজবুল্লাহকে দায়ী করলেও হিজবুল্লাহর পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। একই দিনে দক্ষিণ লেবাননে হিজবুল্লাহর ড্রোন ও রকেট হামলায় এক ইসরায়েলি সেনা নিহত হওয়ার খবর নিশ্চিত করেছে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী।
চলতি বছরের মার্চ মাস থেকে শুরু হওয়া এই রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পর থেকে এখন পর্যন্ত লেবাননে ৩,৫০০-এরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন এবং বাস্তুচ্যুত হয়েছেন প্রায় ১০ লাখেরও বেশি বাসিন্দা।
/কহু