অস্তিত্বের প্রতিটি স্পন্দন এবং জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত এক অদৃশ্য কালিতে লিপিবদ্ধ হচ্ছে মহাকালের পাতায়। আমরা যা কিছু করছি নিভৃত অন্ধকারে কিংবা প্রকাশ্য দিবালোকে, তার কিছুই হারিয়ে যাচ্ছে না। পার্থিব চোখ যা দেখতে অক্ষম, মহান রবের নিপুণ কুদরতে তা সংরক্ষিত হচ্ছে এক পাণ্ডুলিপিতে; যার নাম ‘আমলনামা’। পরকালে সবচেয়ে বড় দলিল হবে আমাদেরই জীবনলিপি। এটাই হবে একজন মানুষের জীবনের পূর্ণাঙ্গ ও নির্ভুল ইতিহাস, যা কেয়ামতের দিন আমাদের সামনে খুলে দেওয়া হবে। আমাদের যাপিত জীবনের প্রতিটি ভালো-মন্দের দায়ভার মহান রাব্বুল আলামিন আমাদের সত্তার সঙ্গেই গেঁথে দিয়েছেন।
আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেন, ‘প্রত্যেক ব্যক্তির কৃতকর্মকে আমি তার গ্রীবালগ্ন করে দিয়েছি এবং কেয়ামতের দিন আমি তার জন্য বের করব এক কিতাব, যা সে পাবে উন্মুক্ত’ (সুরা বনি ইসরাইল : ১৩)। এই আয়াত মানুষের দায়িত্ববোধকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। এখানে ‘গ্রীবালগ্ন’ বা ঘাড়ের সঙ্গে লেগে থাকার রূপকটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এর অর্থ হলো, আমাদের কর্ম আমাদের থেকে কখনো বিচ্ছিন্ন হওয়ার নয়। এটি কোনো বাহ্যিক বোঝা নয়, বরং আমাদের অস্তিত্বের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। কেয়ামতের ময়দানে যখন এই কিতাবটি উন্মুক্ত করা হবে, তখন প্রতিটি মানুষ বিস্ময় এবং আতঙ্কের সঙ্গে দেখবে তার দুনিয়ার জীবনের প্রতিটি কর্মকাণ্ড। সেদিন নিজের কৃতকর্মই হবে সবচেয়ে বড় সাক্ষী, কারও পক্ষে মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়া বা সত্যকে আড়াল করা সম্ভব হবে না।
আরও পড়ুন
অন্য আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আমলনামা সামনে রাখা হবে; তখন তুমি অপরাধীদের দেখবে এতে যা আছে তা নিয়ে আতঙ্কিত হয়ে বলবে, হায় দুর্ভাগ্য! এ কেমন কিতাব, যা ছোট-বড় কিছুই বাদ দেয়নি, সবই লিপিবদ্ধ রেখেছে’ (সুরা কাহাফ : ৪৯)। এই দৃশ্য মানবচেতনায় এক গভীর শিহরণ জাগায়। মানুষ তখন বুঝতে পারবে, যে কাজগুলো সে তুচ্ছ ভেবে অবহেলায় করেছে, কিংবা যে কথাগুলো গুরুত্বহীন মনে করে উচ্চারণ করেছে- সবই সেখানে হুবহু বিদ্যমান। নির্জনে করা কোনো গোপন গুনাহ বা চোখের একটি পলকের ইশারাও সেখানে নথিবদ্ধ। কোনো কিছুই উপেক্ষিত বা বিস্মৃত হয়নি। আমলনামা হবে এমন এক নিখুঁত দলিল, যেখানে গোপন ও প্রকাশ্য সবকিছু সমান গুরুত্বের সঙ্গে সংরক্ষিত।
পাপ-পুণ্যের হিসাব-নিকাশের এই নিখুঁত ও কঠোর চিত্র দেখে শঙ্কিত হওয়া স্বাভাবিক। তবে মহান আল্লাহ সুরা ইয়াসিনের ৫৪ নম্বর আয়াতে মুমিনদের হৃদয়ে শীতল প্রশান্তি ঢেলে দিয়ে বলেছেন, ‘আজ কারও প্রতি কোনো জুলুম করা হবে না এবং তোমাদের শুধু তোমাদের কাজেরই প্রতিদান দেওয়া হবে।’ এই আয়াতে আল্লাহ স্পষ্ট করেছেন যে, মহান রবের দরবারে কোনো ব্যক্তি অবিচারের শিকার হবে না। কারও পুণ্যকে অবমূল্যায়ন করা হবে না, আবার কারও ওপর অন্যের পাপের দায়ভারও চাপিয়ে দেওয়া হবে না। আমরা ইহকালে যা বপন করেছি, পরকালে কেবল তারই ফসল ঘরে তুলব। আল্লাহর বিচারব্যবস্থা কেবল শাস্তির বিধান নয়, বরং এটি পরম ইনসাফের বাস্তবায়ন। অর্থাৎ এই দলিল কেবল তথ্য সংরক্ষণই করবে না, বরং এর ভিত্তিতেই চূড়ান্ত ফয়সালা হবে। তাই এটা কেবল একটি রেকর্ড নয়, এটি মানুষের মৃত্যু-পরবর্তী জীবনের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের দলিল।
এএডি/