কূটনৈতিক টেবিলে বসে বিশ্বনেতারা যখন যুদ্ধবিরতির চুক্তি সই করেন, তখনও মায়ের কোলে নিথর হয়ে যায় কোনো না কোনো নিষ্পাপ শিশু। রাজনীতির মারপ্যাঁচে কেবল কাগজের দলিলেই বারবার মুখ থুবড়ে পড়ছে শান্তি।
সম্প্রতি বুধবার ইসরায়েল ও লেবাননের মধ্যে আরও একটি নতুন যুদ্ধবিরতি ঘোষিত হয়েছে, যা আসলে গত ১৬ এপ্রিল হওয়া এক ব্যর্থ সমঝোতারই পুনরাবৃত্তি। অন্যদিকে, গত এপ্রিল থেকে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে এবং দীর্ঘ সময় ধরে গাজায় ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যেও কাগজে-কলমে যুদ্ধবিরতি বলবৎ রয়েছে। কিন্তু এই শান্তিকালীন সময়েও শুক্রবার (৫ জুন) দক্ষিণ লেবাননের নাকুরা ও নাবাতিয়া জেলায় ইসরায়েলি হামলায় এক সাধারণ মানুষকে জীবন দিতে হয়েছে।
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের পারস্পরিক হামলা দিন দিন আরও তীব্র রূপ নিচ্ছে। এমনকি গাজার একটি আবাসিক ভবনে এই সপ্তাহেও ইসরায়েলি বোমাবর্ষণে ৯ জন সাধারণ বেসামরিক নাগরিক প্রাণ হারিয়েছেন। যখন যুদ্ধবিরতি চলাই মানে মানুষের জীবন বাঁচা, তখন প্রশ্ন ওঠে— কাগজের এই চুক্তিগুলো আসলে কার স্বার্থ রক্ষা করছে? আন্তর্জাতিক আইন ও মানবতা নিয়ে কাজ করা বিশেষজ্ঞরা এই নির্মম সংকটের কিছু গভীর কারণ তুলে ধরেছেন।
যুদ্ধবিরতি কেন এত ভঙ্গুর?
ফ্রেজার ভ্যালি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মার্ক কার্স্টেন এবং কানাডার ওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির ইমেরিটাস অধ্যাপক মাইকেল লিঙ্ক বিষয়টি অত্যন্ত বেদনাদায়কভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। তাদের মতে, যুদ্ধবিরতি কোনো স্থায়ী শান্তি চুক্তি নয়; এটি আসলে আলোচনার জন্য সাময়িকভাবে লড়াইয়ে একটু বিরতি দেওয়া মাত্র। মাইকেল লিঙ্কের ভাষায়, এটি কোনো শক্তিশালী আইনি বাধ্যবাধকতা নয়, বরং একটি ভঙ্গুর ‘রাজনৈতিক চুক্তি’। শান্তি চুক্তিতে যেমন কোনো জামিনদার বা তদারককারী থাকে, যুদ্ধবিরতিতে তা থাকে না। ফলে এটি কেউ ভেঙে ফেললেও তাকে তাৎক্ষণিক কোনো শাস্তি বা জবাবদিহিতার মুখোমুখি হতে হয় না।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনজীবী টোবি ক্যাডম্যানও একই মত পোষণ করে বলেন, যুদ্ধবিরতি সশস্ত্র সংঘাতের আইনি অবসান ঘটায় না, কেবল কিছুক্ষণের জন্য বন্দুকের গর্জন থামিয়ে রাখে। তাত্ত্বিকভাবে গাজা যুদ্ধবিরতি চুক্তিটি জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের বিশেষ প্রস্তাবের মাধ্যমে অনুমোদিত হয়েছিল, যেখানে বলা হয়েছিল সদিচ্ছার সাথে এটি অবিলম্বে বাস্তবায়ন করতে হবে। কিন্তু বাস্তবে, জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে যুক্তরাষ্ট্রের ‘ভেটো’ ক্ষমতার কারণে ইসরায়েল বা স্বয়ং যুক্তরাষ্ট্রকে কোনো ধরনের আইনি বা মানবিক জবাবদিহিতার আওতায় আনা কোনো দিনই সম্ভব হয় না।
লঙ্ঘনকারী কে, তা নির্ধারণের নিরপেক্ষ জায়গা কোথায়?
আজ প্রতিটি পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে যুদ্ধবিরতি ভাঙার অভিযোগ তুলছে। ফিলিস্তিনিরা ইসরায়েলের বিরুদ্ধে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান পরস্পরের বিরুদ্ধে আর লেবানন-ইসরায়েল একে অপরের দিকে আঙুল তুলছে। কিন্তু টোবি ক্যাডম্যান দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, সবচেয়ে বড় সংকট হলো, এই চুক্তি কে লঙ্ঘন করেছে তা নিরপেক্ষভাবে বিচার করার মতো কোনো স্বাধীন সালিশকারী বা আন্তর্জাতিক আদালত এখানে নেই।
বর্তমানে যে পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা রয়েছে, তা মূলত রাজনৈতিক এবং এর নিয়ন্ত্রণ সেই ক্ষমতাশালী রাষ্ট্রগুলোর হাতেই থাকে যারা মধ্যস্থতাকারী ছিল। গাজা ও লেবাননের ক্ষেত্রে সেই মূল মধ্যস্থতাকারী রাষ্ট্রটি হলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু ওয়াশিংটন এখানে একই সাথে মধ্যস্থতাকারী এবং ইসরায়েলের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ সামরিক ও কূটনৈতিক মিত্র। ফলে স্বাধীন কোনো আইনি মূল্যায়নের পরিবর্তে শত শত মানুষের জীবনের মূল্য গিয়ে ঠেকে রাজনীতির কুৎসিত হিসাব-নিকাশে।
আইন বনাম মাঠের বাস্তবতা : যেখানে অসহায় মানবতা
অধ্যাপক মার্ক কার্স্টেন আন্তর্জাতিক আইনি ব্যবস্থার একটি চরম ও নির্মম স্ববিরোধিতা আমাদের সামনে নিয়ে এসেছেন। তিনি বলেন, আজ আন্তর্জাতিক আইনের কল্যাণে পৃথিবীর প্রতিটি বিবেকবান মানুষ একমত যে গাজা ও লেবাননে যা ঘটছে তা কেবল অন্যায়ই নয়, বরং সম্পূর্ণ বেআইনি ও মানবতাবিরোধী অপরাধ। কিন্তু ট্র্যাজেডি হলো, এই বিশ্বজনীন স্বীকৃতি কোনো একটি মানুষের জীবন বাঁচাতে বা একটি শিশুর ওপর থেকে বোমা আটকাতে পারছে না।
আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত ও আন্তর্জাতিক বিচার আদালত তদন্ত করতে পারে, প্রমাণ সংগ্রহ করতে পারে, এমনকি গ্রেপ্তারি পরোয়ানা বা বড় বড় রায়ও জারি করতে পারে; কিন্তু তাদের এই আইনি কাগজের ক্ষমতা নেই আকাশ থেকে ধেয়ে আসা বোমাবর্ষণ থামানোর। অথচ আইন বিশেষজ্ঞরা স্পষ্ট করে বলেছেন, যুদ্ধবিরতি চলাকালেও আন্তর্জাতিক মানবিক ও মানবাধিকার আইন পুরোপুরি কার্যকর থাকে। কোনো যুদ্ধবিরতিই সাধারণ বেসামরিক মানুষের ওপর নৃশংসতা চালানো বা রক্তপাতের কোনো আইনি ছাড়পত্র কাউকে দেয় না।
যুদ্ধবিরতির মধ্যেও হামলা জারি রাখার পক্ষে শক্তিশালী দেশগুলো সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করে জাতিসংঘ সনদের ৫১ নং অনুচ্ছেদ বা ‘আত্মরক্ষা’র যুক্তি। তবে আইনজীবী ক্যাডম্যানের মতে, অনুচ্ছেদ ৫১ কেবল তখনই একতরফা সামরিক পদক্ষেপের অধিকার দেয়, যখন কোনো সশস্ত্র আক্রমণ ঘটে গেছে বা প্রকৃতপক্ষে আসন্ন; এটি যেকোনো সময় প্রতিরোধমূলক হামলা চালিয়ে মানুষ মারার কোনো স্থায়ী লাইসেন্স নয়।
তাহলে প্রভাবশালী দেশগুলো কীভাবে পার পেয়ে যাচ্ছে? সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার হামলা নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ড ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছিলেন,‘যুদ্ধবিরতির অংশটি হলো যখন আপনি আরও সংযতভাবে বা কম সংখ্যায় গুলি চালান।’ এই একটি মন্তব্যই প্রমাণ করে যে বিশ্বনেতারা সাধারণ মানুষের জীবন ও যুদ্ধবিরতিকে কতটা হালকাভাবে দেখেন।
টোবি ক্যাডম্যানের মতে, মূল সমস্যা আন্তর্জাতিক আইনে নিয়মের অভাব নয়, বরং নিয়মের ‘বৈষম্যমূলক প্রয়োগ’। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ ভেটো দিয়ে পঙ্গু হয়ে আছে, আন্তর্জাতিক আদালতের রায় থাকলেও তা কার্যকর করার ক্ষমতা নেই, আর আইসিসি গ্রেপ্তারি পরোয়ানা দিলেও তা বাস্তবায়নের জন্য রাষ্ট্রগুলোর রাজনৈতিক মর্জির ওপর চেয়ে থাকতে হয়। এই শক্তিশালী প্রয়োগ ব্যবস্থার অভাবেই কাগজের যুদ্ধবিরতি মাঠের সাধারণ মানুষের জীবন রক্ষা করতে পারছে না, আর প্রতিদিন ভারী হচ্ছে লাশের মিছিল।
সময়ের আলো/জেডি