হজ-পরবর্তী জীবনের পথরেখা

মাওলানা তোফায়েল আহমাদ

ইসলাম

হজ ইসলামের এমন এক অনন্য ইবাদত, যা কেবল কিছু সুনির্দিষ্ট কার্যাবলির সমষ্টি নয়, বরং এটি একজন মুমিনের জীবনের মোড় ঘুরিয়ে

2026-06-06T18:09:44+00:00
2026-06-06T18:09:44+00:00
 
  শনিবার, ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
২১ ভাদ্র ১৪৩৩
শনিবার, ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ইসলাম
হজ-পরবর্তী জীবনের পথরেখা
মাওলানা তোফায়েল আহমাদ
প্রকাশ: শনিবার, ৬ জুন, ২০২৬, ৬:০৯ পিএম 
হজ-পরবর্তী জীবনের পথরেখা। ছবি : সংগৃহীত
হজ ইসলামের এমন এক অনন্য ইবাদত, যা কেবল কিছু সুনির্দিষ্ট কার্যাবলির সমষ্টি নয়, বরং এটি একজন মুমিনের জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার মতো এক গভীর আত্মিক বিপ্লব। পবিত্র কাবাঘর তওয়াফ থেকে শুরু করে আরাফার ময়দানে অশ্রুসিক্ত প্রার্থনা- প্রতিটি মুহূর্তই মানুষের হৃদয়ে আল্লাহর মহিমা এবং নিজের দাসত্বকে নতুন করে উপলব্ধি করানোর এক অনুপম অনুশীলন। তবে হজের সার্থকতা কেবল মক্কা-মদিনার সেই পবিত্র দিনগুলোতে সীমাবদ্ধ নয়। হজের প্রকৃত পরীক্ষা শুরু হয় হজ শেষে নিজ এলাকায় ফিরে আসার পর থেকে। একজন হাজি যখন হজের সফর শেষে বাড়ি ফেরেন, তখন তিনি কি আগের মতোই থাকলেন, নাকি তার চরিত্র ও কর্মে কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন এলো- সেটার ওপরই নির্ভর করে হজের কবুল হওয়ার বিষয়টি। হজের শিক্ষাগুলো সারা জীবন ধারণ করা একজন মুমিনের জন্য শ্রেষ্ঠ অলংকার।

তাওহিদের চেতনায় অবিচল থাকা

Advertisement
ইহরাম বাঁধার পর থেকেই হাজি উচ্চারণ করেন, ‘লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক, লাব্বাইকা লা-শারিকা লাকা লাব্বাইক...।’ এটা কেবল শব্দ নয়, বরং এটা আল্লাহর একত্ববাদের এক সুদৃঢ় অঙ্গীকার। এই তালবিয়া আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে কেবল আল্লাহর হুকুমই চূড়ান্ত। হজের সফর শেষে ফিরে এসে যখন মানুষ দৈনন্দিন কর্মব্যস্ততায় লিপ্ত হয়, তখন অনেক সময় পার্থিব মোহ বা মানুষের চাপের কাছে নতি স্বীকার করার সুযোগ তৈরি হয়। কিন্তু একজন হাজি, যিনি আরাফার ময়দানে এক আল্লাহর সামনে মাথা নত করার স্বাদ পেয়েছেন, তিনি কি পারেন অন্য কারও সামনে বা অন্য কোনো মতাদর্শের কাছে নিজের বিবেক বিক্রি করতে? আল্লাহ তায়ালা কুরআনে ইরশাদ করেন, ‘নিশ্চয়ই আমার সালাত, আমার কুরবানি, আমার জীবন এবং আমার মরণ বিশ্বজগতের প্রতিপালক আল্লাহরই জন্য’ (সুরা আনআম, আয়াত : ১৬২)। হজের শিক্ষা হলো, তাওহিদের এই দীপ্ত চেতনাকে জীবনের প্রতিটি কাজে, ব্যবসায়িক লেনদেনে এবং সামাজিক সিদ্ধান্তে প্রতিফলিত করা। যখন কোনো মুমিন নিজের কর্মে আল্লাহকে সাক্ষী রেখে সত্যের পথে অটল থাকেন, তখনই বোঝা যায় হজের শিক্ষা তার হৃদয়ে প্রোথিত হয়েছে।

আত্মত্যাগ ও ইবরাহিমি আদর্শের প্রতিফলন

হজ হলো ইবরাহিম (আ.), বিবি হাজেরা (রা.) এবং ইসমাইল (আ.)-এর মহিমান্বিত আত্মত্যাগের স্মৃতিবিজড়িত একটি ইবাদত। সাফা-মারওয়া পাহাড়ের মাঝে বিবি হাজেরার সেই ব্যাকুল দৌড়ঝাঁপ আমাদের শেখায়, আল্লাহর ওপর ভরসা থাকলে এবং নিজের চেষ্টার চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছাতে পারলে আল্লাহ রহমতের ঝরনাধারা বইয়ে দেন। আজ আমাদের সমাজে অনেকেই হতাশায় নিমজ্জিত হন চাকরি, ব্যবসা বা পারিবারিক সমস্যায়। হজ থেকে ফিরে আসা একজন মানুষের কাছে এই হতাশা মানায় না। কারণ তিনি স্বচক্ষে দেখে এসেছেন, জনমানবহীন মরুপ্রান্তরের সংকটেও আল্লাহ কীভাবে নিজের বান্দাকে রক্ষা করেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সঙ্গে আছেন’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ১৫৩)। হজের শিক্ষা হলো ধৈর্য। জীবনের চরম প্রতিকূলতায়, অসুস্থতায় বা বিপদে যেন কোনো হাজি ধৈর্য না হারান, বরং আল্লাহর ফয়সালার ওপর সন্তুষ্ট থাকেন। এটিই প্রকৃত মুমিনের বৈশিষ্ট্য।

সাম্য ও মানবতার জয়গান

আরাফার ময়দান হলো সাম্যের এক বিশাল মহড়া। দুনিয়ার পুরো সীমানা, ভাষার ভিন্নতা, ধনী-দরিদ্রের বিভেদ ধুয়েমুছে মানুষ সেখানে একাকার হয়ে যায়। একই ধবধবে সাদা পোশাকে সবাই যখন আল্লাহর দরবারে দাঁড়িয়ে বিনম্র মিনতি করে, তখন অহংকারের আর কোনো অবকাশ থাকে না। সমাজ থেকে বর্ণবাদ ও জাতিবিদ্বেষ দূর করার বড় শিক্ষা পাওয়া যায় এখান থেকে। আমাদের সমাজে এখনও অনেক ক্ষেত্রে বৈষম্য ও দলাদলি বিদ্যমান। রাসুলুল্লাহ (সা.) বিদায় হজের ভাষণে স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছিলেন, ‘হে লোকসব! তোমাদের পালনকর্তা এক এবং তোমাদের পিতাও এক। কোনো আরবের ওপর কোনো অনারবের শ্রেষ্ঠত্ব নেই এবং কোনো অনারবের ওপর কোনো আরবের শ্রেষ্ঠত্ব নেই’ (বায়হাকি)। একজন হাজি তার আচরণের মাধ্যমে সমাজের এই বিভাজনকে দূর করতে ভূমিকা রাখতে পারেন। হজের পর তার জীবনের অন্যতম লক্ষ্য হওয়া উচিত মানুষের সঙ্গে দয়া, মায়া ও সমতার আচরণ করা। মহানবী (সা.)-এর সেই বার্তাটি যেন হাজিদের প্রতিটি পদক্ষেপ ও কথায় ফুটে ওঠে।

হালাল জীবনের দৃঢ় অঙ্গীকার

হজ কবুলের অন্যতম শর্ত হলো হালাল উপার্জন। হারাম অর্থে অর্জিত সম্পদ দিয়ে হজের সফর করা হলে তা কবুল হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ থাকে। রাসুলুল্লাহ (সা.) কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন সেই ব্যক্তির ব্যাপারে, যার খাদ্য ও পোশাক হারাম। হজ থেকে ফিরে আসার পর নতুন করে জীবনের হিসাব মেলানোর সুযোগ তৈরি হয়। যে মানুষটি পবিত্র কাবাঘর ছুঁয়ে এসেছেন, তিনি কীভাবে আবার সুদ, ঘুষ বা মিথ্যার ব্যবসায় লিপ্ত হতে পারেন? হাদিসে এসেছে, ‘হে লোকসব! আল্লাহ পবিত্র, তিনি পবিত্র ছাড়া কিছুই কবুল করেন না’ (সহিহ মুসলিম)। হজের পর হালাল জীবিকা অর্জনের প্রতি কঠোর সতর্কতা অবলম্বন করা একজন হাজির জন্য নৈতিক দায়বদ্ধতা। এই হালাল উপার্জনই পরিবারের ওপর বরকত নিয়ে আসে এবং সন্তানকে সৎ মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে সাহায্য করে।

আধ্যাত্মিক পবিত্রতা ও উন্নত চরিত্র

হজ মানে কেবল বাইরের শুদ্ধি নয়, এটি অন্তরের শুদ্ধিও বটে। যারা হজ পালন করেন, তাদের ভাষার শালীনতা ও আচরণের নমনীয়তা অন্যদের জন্য দৃষ্টান্ত হওয়া উচিত। কুরআন মাজিদে ইরশাদ হয়েছে, হজের সময় অশ্লীল কথা ও ঝগড়া-বিবাদ থেকে দূরে থাকার জন্য। এই অভ্যাসটি যেন হজ পরবর্তী জীবনেও টিকে থাকে। কারও প্রতি হিংসা, ঘৃণা বা গিবত করার প্রবণতা থাকলে তা বিসর্জন দিতে হবে। মানুষের বিপদে এগিয়ে আসা, প্রতিবেশীর খোঁজ নেওয়া এবং পরিবারকে ইসলামি আদর্শে গড়ে তোলা- এসবই হজের প্রশিক্ষণের অংশ। বিশেষ করে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ভালো আচরণ করা এবং তাদের আখেরাতমুখী করে তোলা একজন হাজির প্রধান দায়িত্ব। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তিই উত্তম, যে তার পরিবারের কাছে উত্তম’ (তিরমিজি)। হজের বরকতময় পরিবেশ যেন বাড়ির প্রতিটি কোণে ছড়িয়ে পড়ে। হজ শেষে বাড়ি ফিরে ইবাদতে অলসতা নয়, বরং আরও বেশি একাগ্রতা আসা প্রয়োজন। যদি কারও চরিত্রে হজের পর ইতিবাচক পরিবর্তন আসে, তবেই তা ‘হজে মাবরুর’ বা কবুল হজের লক্ষণ।

আল্লাহর নিদর্শনের প্রতি শ্রদ্ধা

আল্লাহ তায়ালা হজ সম্পর্কিত স্থানগুলোকে তাঁর ‘নিদর্শন’ বা ‘শাআয়ের’ হিসেবে ঘোষণা করেছেন। কুরআনুল কারিমে ইরশাদ হয়েছে, ‘কেউ আল্লাহর নিদর্শনাবলির প্রতি সম্মান প্রদর্শন করলে তা তো তার অন্তরের তাকওয়া থেকেই উদ্ভূত’ (সুরা হজ, আয়াত : ৩২)। হজ করে আসা ব্যক্তি ইসলাম ও ইসলামের প্রতীকগুলোর প্রতি অন্য সাধারণ মানুষের তুলনায় বেশি শ্রদ্ধাশীল হবেন এটাই স্বাভাবিক। নামাজের গুরুত্ব, মসজিদের আদব এবং কুরআনের প্রতি ভালোবাসা যেন তার জীবনে নতুন মাত্রায় যুক্ত হয়।


পরিশেষে বলা যায়, হজের সফর শেষ হয়ে গেলেও হজের ইবাদত শেষ হয় না, বরং এটা সারা জীবনের এক নিরন্তর চর্চা। হজ একটি নতুন শুরুর নাম। যে হাজি হজ থেকে ফেরার পর নিজের জীবনের ভুলত্রুটিগুলো সংশোধন করে আল্লাহর পথে অটল থাকেন, তার জীবন হয়ে ওঠে ধন্য। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য হজ করল এবং তাতে অশ্লীল কথা বা গুনাহের কাজে লিপ্ত হলো না, সে ওই দিনের মতো নিষ্পাপ হয়ে ফিরে আসে, যেদিন তার মা তাকে প্রসব করেছিলেন’ (বুখারি)। সুতরাং এই অনন্য সম্মান ধরে রাখা এবং আল্লাহর প্রতি আনুগত্য বজায় রাখাই একজন হাজির আসল সাফল্য। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে ‘হজে মাবরুর’ বা কবুল হজের সৌভাগ্য দান করুন এবং সেই হজের শিক্ষা সারাজীবন আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকার তওফিক দান করুন।  

সময়ের আলো/জেডআই
  বিষয়:   হজ 


Loading...
Loading...
ইসলাম- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: