তাপপ্রবাহে মুমিনের প্রশান্তির আমল

তোয়াহা হুসাইন

ইসলাম

প্রকৃতির স্বাভাবিক চক্রেই ঋতুর পরিবর্তন ঘটে। গ্রীষ্মের প্রচণ্ড তাপপ্রবাহে যখন জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে, তখন মানুষের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যাওয়ার

2026-06-06T20:00:12+00:00
2026-06-06T20:00:12+00:00
 
  শনিবার, ৬ জুন ২০২৬,
২৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
শনিবার, ৬ জুন ২০২৬
ইসলাম
তাপপ্রবাহে মুমিনের প্রশান্তির আমল
তোয়াহা হুসাইন
প্রকাশ: শনিবার, ৬ জুন, ২০২৬, ৮:০০ পিএম   (ভিজিট : ১০)
তাপপ্রবাহে মুমিনের প্রশান্তির আমল। ছবি : সংগৃহীত
প্রকৃতির স্বাভাবিক চক্রেই ঋতুর পরিবর্তন ঘটে। গ্রীষ্মের প্রচণ্ড তাপপ্রবাহে যখন জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে, তখন মানুষের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যাওয়ার উপক্রম হয়। তপ্ত সূর্যরশ্মি আর লু হাওয়ায় চারপাশ যেন উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। একজন মুমিনের কাছে পৃথিবীর এই অসহনীয় গরম কেবল একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, বরং এটি আখেরাতের ভয়াবহতার কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়ার একটি উপলক্ষ এবং মহান রবের পক্ষ থেকে আসা একটি পরীক্ষা। এই কঠিন মুহূর্তে ঈমানদার ব্যক্তি বিচলিত না হয়ে নবী করিম (সা.)-এর সুন্নাহ ও দিকনির্দেশনা অনুসরণ করে প্রশান্তি খুঁজে নিতে পারেন।

তাপপ্রবাহের অন্তর্নিহিত বার্তা : প্রচণ্ড গরমের সময় রাসুল (সা.)-এর একটি হাদিস আমাদের গরমে ধৈর্যধারণ করতে শেখায়। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘জাহান্নাম তার রবের কাছে অভিযোগ করে বলে, হে রব, আমার এক অংশ অন্য অংশকে খেয়ে ফেলেছে। মহান আল্লাহ তখন তাকে দুটি নিশ্বাস ফেলার অনুমতি দেন। একটি নিশ্বাস শীতকালে, আরেকটি গ্রীষ্মকালে। কাজেই তোমরা গরমের তীব্রতা এবং শীতের তীব্রতা পেয়ে থাকো’ (বুখারি, হাদিস : ৩২৬০)। এই হাদিসটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, দুনিয়ার এই সামান্য তাপ জাহান্নামের ভয়াবহতার তুলনায় নগণ্য। এই চিন্তা একজন মুমিনকে গুনাহ থেকে বিরত রাখতে এবং মহান রবের আজাব থেকে বাঁচতে উদ্বুদ্ধ করে।

প্রচণ্ড গরমে মুমিনের করণীয় : প্রখর তাপপ্রবাহে টিকে থাকা এবং সুস্থ থাকার জন্য ইসলামে সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা রয়েছে। এই সময়গুলো সাহসিকতার সঙ্গে মোকাবিলা করার কিছু উপায় নিচে আলোচনা করা হলো।

ইবাদতে নমনীয়তা ও সহমর্মিতা : ইসলাম একটি সহজ-সুন্দর জীবনব্যবস্থা। প্রচণ্ড গরমে কষ্টকর পরিস্থিতির কারণে নামাজের সময় কিছুটা শিথিল করার নির্দেশ দিয়েছেন নবীজি (সা.)। তিনি বলেছেন, ‘যখন গরম প্রচণ্ড হয় তখন তোমরা জোহরের নামাজ ঠান্ডা সময়ে পড়ো’ (বুখারি, হাদিস : ৫৩৮)। এর দ্বারা বোঝা যায়, তীব্র তাপপ্রবাহে কষ্ট স্বীকার করে ইবাদত করার চেয়ে সময়ের কিছুটা পরিবর্তন করে স্বাচ্ছন্দ্যে ইবাদত করা অধিক শ্রেয়। এটি কেবল নামাজের ক্ষেত্রে নয়, কর্মক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। যারা শ্রমজীবী মানুষ বা অধীনস্থ কর্মচারী, তাদের প্রতি মালিকপক্ষের সহমর্মী হওয়া ঈমানি দায়িত্ব।

পরিচ্ছন্নতা ও গোসলের গুরুত্ব : প্রচণ্ড গরমে শরীরে ঘাম ও ধুলোবালি জমে দুর্গন্ধের সৃষ্টি হয়, যা অস্বস্তির কারণ। নবীজি (সা.) পরিচ্ছন্নতার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছেন। জুমার নামাজের দিন মানুষের সমাগম ও গরমে ঘামের কষ্ট দেখে তিনি বলেছিলেন, ‘তোমাদের ওপর কোনো দোষ নেই, যদি তোমরা এই দিনে গোসল করে নাও’ (বুখারি, হাদিস : ৯০২)। তাই গরমের সময় নিয়মিত গোসল করা শরীর ও মনকে সতেজ রাখার অন্যতম উপায়।

শরীর ও মন শীতল রাখা : তীব্র গরমে শরীর ঠান্ডা রাখতে মাথায় পানি দেওয়ার অভ্যাসটি সুন্নাহসম্মত। হাদিস থেকে জানা যায়, নবীজি (সা.) রোজা থাকা অবস্থায়ও প্রচণ্ড গরমে মাথায় পানি ঢালতেন (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস : ২৩৬৯৯)। এটি তাৎক্ষণিকভাবে শরীরকে শীতল করতে সাহায্য করে। এই কাজের মাধ্যমে সুন্নাহ পালনের সওয়াবও পাওয়া যায়।

জাহান্নাম থেকে পানাহ চাওয়া : গরমের তীব্রতা অনুভূত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এটি মুমিনের হৃদয়ে আখেরাতের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। যখনই অসহনীয় গরম লাগে, তখন মুমিন বান্দা আল্লাহুম্মা আজিরনি মিন হাররি জাহান্নাম (হে আল্লাহ, আমাকে জাহান্নামের তীব্র তাপ থেকে বাঁচান) বলে দোয়া করতে পারেন। হাদিস অনুযায়ী, যে ব্যক্তি এভাবে আল্লাহর কাছে দোয়া করে, আল্লাহ তাকে জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্তি দেওয়ার ওয়াদা করেন। (বাইহাকি)

বৃষ্টি কামনায় প্রার্থনা ও ইসতিগফার : গ্রীষ্মের তাপপ্রবাহ থেকে মুক্তি পেতে বৃষ্টির বিকল্প নেই। নবীজি (সা.) গরমের তীব্রতায় বৃষ্টির জন্য দোয়া করতেন। তিনি বলতেন, ‘আল্লাহুম্মা আগিছনা (হে আল্লাহ, আমাদের ওপর বৃষ্টি বর্ষণ করুন)’ (বুখারি : ১০১৪)। এ ছাড়া অধিক পরিমাণে ইসতিগফার বা তওবা করা বৃষ্টির রহমত পাওয়ার অন্যতম মাধ্যম। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেন, ‘তোমরা তোমাদের রবের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো, নিশ্চয়ই তিনি অত্যন্ত ক্ষমাশীল। তিনি তোমাদের ওপর অজস্র ধারায় বৃষ্টি বর্ষণ করবেন।’ (সুরা নুহ, আয়াত : ১০-১১)


পরিবেশ রক্ষা ও বৃক্ষরোপণ : তাৎক্ষণিক উপায়ের পাশাপাশি স্থায়িত্বশীল সমাধানের জন্য রাসুল (সা.) বৃক্ষরোপণের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করতে গাছ অপরিহার্য। তিনি উৎসাহিত করেছেন, ‘যদি কেয়ামত শুরু হয়ে যায় আর এমতাবস্থায় তোমাদের হাতে একটি চারা থাকে, তবে সে যদি দণ্ডায়মান হওয়ার আগেই তা রোপণ করতে পারে, তবে সে যেন তা রোপণ করে’ (সহিহুল জামে : ১৪২৪)। আমাদের চারপাশ সবুজায়ন করলে এবং যত্রতত্র গাছ কাটা বন্ধ করলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য পৃথিবীকে বাসযোগ্য রাখা সম্ভব হবে।

পরিশেষে বলা যায়, প্রচণ্ড গরম মুমিনের জন্য কেবল একটি কষ্টকর সময় নয়, বরং মহান রবের নৈকট্য অর্জনের একটি সুযোগ। ধৈর্যধারণ করা, অপরের প্রতি দয়া প্রদর্শন করা এবং আল্লাহর স্মরণে মগ্ন থাকা এই সময়ের শ্রেষ্ঠ পাথেয়। প্রতিকূল আবহাওয়ার মধ্যেও আমরা যদি রাসুল (সা.)-এর শিক্ষাগুলো মেনে চলি, তবে দুনিয়ার জীবনে শান্তি বজায় থাকবে এবং আখেরাতের সেই ভয়াবহ তাপপ্রবাহ থেকে মুক্তির পথ সুগম হবে। আল্লাহ আমাদের সবাইকে সব ধরনের বিপদাপদ ও জাহান্নামের আগুন থেকে হেফাজত করুন।

সময়ের আলো/জেডআই


  বিষয়:   তাপপ্রবাহ 


Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: