“হাজার বছর ধ’রে আমি পথ হাঁটিতেছি পৃথিবীর পথে” জীবনানন্দের এ লাইন আমাদের এক ফিলোসফিকেল যাত্রার দিকে নির্দেশ করে। মানুষের এ অনন্ত হেঁটে চলায় থাকে শত শত বিষাদের ক্ষত, রক্তগন্ধ মাখা ইতিহাস। হতে পারে, গণহত্যা কিংবা প্রকৃতির নিঠুর খেলায় ধ্বংস হয়ে যাওয়া কোনো সভ্যতা। সবচেয়ে বিস্ময়ের বিষয়, সামনে পথ চলা সেই মানুষই আবার কৌতূহল নিয়ে ফিরে যেতে চায় শত-সহস্র বছরের পুরনো ধ্বংসস্তূপের পাতায়। এই যে একদল মানুষ দুর্যোগ, যুদ্ধ কিংবা ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের স্মৃতিবিজড়িত স্থানগুলো দেখতে ভ্রমণে বের হন, সেই ভ্রমণই পরিচয় পেয়েছে ‘ডার্ক ট্যুরিজম’ নামে। তখনও সামনে আসে জীবনানন্দের কবিতা ‘আরও এক বিপন্ন বিস্ময় আমাদের অন্তর্গত রক্তের ভেতর খেলা করে।’ মানুষের এই কৌতূহল ও বিস্ময় ডার্ক ট্যুরিজমের অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচিত।
বর্তমানে ডার্ক ট্যুরিজম বিশ্বজুড়ে দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। প্রতি বছর লাখো মানুষ এমন সব স্থানে ভ্রমণ করেন, যেগুলো মানব ইতিহাসের সবচেয়ে বেদনাদায়ক অধ্যায়ের সাক্ষী। ১৯৯৬ সালে ডার্ক ট্যুরিজমের এ ধারণা প্রবর্তন করেন গ্লাসগো ক্যালেডোনিয়ান ইউনিভার্সিটির দুই ফ্যাকাল্টি সদস্য জন লেনন এবং ম্যালকম ফোলি। তাদের সংজ্ঞানুসারে, দুর্যোগ এবং ট্র্যাজেডির সঙ্গে সম্পর্কিত স্থানে ভ্রমণ করাকে ডার্ক ট্যুরিজম বলে।
গবেষকদের মতে, মানুষ শুধু আনন্দের জন্য নয়, ইতিহাস সম্পর্কে জানার তীব্র আগ্রহ থেকেও অনেক স্থান ভ্রমণ করেন। যেসব ঘটনা আমরা বইয়ে বা পত্রিকায় পড়ি, পর্দায় দেখি, সেগুলো সামনে থেকে দেখার অভিজ্ঞতা অনেক আলাদা।
আউশভিৎস-বিরকেনাউ স্মৃতিসৌধ এবং জাদুঘর
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নাৎসি জার্মানির সবচেয়ে কুখ্যাত কনসেনট্রেশন ক্যাম্পগুলোর একটি ছিল পোল্যান্ডের আউশভিৎস। এখানে প্রায় ১১ লাখ মানুষ নিহত হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়। বর্তমানে এটি একটি জাদুঘর ও স্মৃতিসৌধ। মানব ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ গণহত্যার বাস্তবতা উপলব্ধি করতে প্রতি বছর বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে লাখো দর্শনার্থী এখানে আসেন।
চেরনোবিল বর্জন অঞ্চল
১৯৮৬ সালে বিশ্বের অন্যতম ভয়াবহ পারমাণবিক দুর্ঘটনা ঘটে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন, বর্তমান ইউক্রেনের চেরনোবিলে। দুর্ঘটনার পর সেখান থেকে ৩ লাখ ৩৫ হাজার মানুষকে সরিয়ে নেওয়া হয় এবং চুল্লির চারপাশে প্রায় ১৯ মাইল ব্যাসার্ধ এলাকাকে ‘প্রবেশ নিষিদ্ধ অঞ্চল’ ঘোষণা করা হয়। এ দুর্ঘটনায় তাৎক্ষণিকভাবে অন্তত ২৮ জন প্রাণ হারান এবং ১০০ জনের বেশি মানুষ আহত হন। তবে, পরবর্তীতে এর প্রভাবে হাজার হাজার মানুষ ক্যান্সারে আক্রান্ত হন। অনেক বছর পর ২০১১ সালে ইউক্রেন সরকার প্রবেশ নিষিদ্ধ এলাকাটিকে ১৮ বছরের বেশি বয়সি পর্যটকদের জন্য খুলে দেয়। তখন থেকে প্রতিবছর প্রায় ১ লাখ পর্যটক জায়গাটি দেখতে যেতেন। তবে, রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে ২০২২ সালে সেই সুযোগ বন্ধ হয়ে যায়।
গ্রাউন্ড জিরো
২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের সন্ত্রাসী হামলায় ধ্বংস হয়ে যায় নিউইয়র্কের টুইন টাওয়ার। সেখানকার বিধ্বস্ত ভবনগুলোর সেই ধ্বংসস্তূপ বা ঘটনাস্থলকে 'গ্রাউন্ড জিরো' বলা হয়। টুইন টাওয়ারের ঠিক মূল ভিত্তির ওপর দুটি জলপ্রপাত তৈরি করা হয়েছে। এখানে হামলায় নিহত ২,৯৮৩ জনের নাম ব্রোঞ্জ প্যানেলে খোদাই করা আছে। হামলার শিকার ব্যক্তিদের স্মরণে এবং ঘটনাটির ইতিহাস তুলে ধরতে ভূগর্ভস্থ মিউজিয়ামও তৈরি করা হয়েছে। এ ছাড়া একটি সারভাইভার ট্রিও আছে। ধ্বংসস্তূপের নিচে ক্ষতিগ্রস্ত সেই পিয়ার গাছটি টিকে থাকার এবং ঘুরে দাঁড়ানোর প্রতীক হিসেবে সংরক্ষিত আছে। প্রতি বছর অনেক পর্যটক এ স্থানটি দেখতে আসেন।
হিরোশিমা শান্তি স্মৃতিসৌধ
১৯৪৫ সালে পারমাণবিক বোমা হামলার ধ্বংসযজ্ঞের সাক্ষী জাপানের হিরোশিমা আজ শান্তির প্রতীক। বোমা বিস্ফোরণের পরও আংশিকভাবে দাঁড়িয়ে থাকা ভবনটি ‘অ্যাটমিক বম্ব ডোম’ নামে পরিচিত। মানব ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতিচিহ্নগুলোর একটি এই হিরোশিমা শান্তি স্মৃতিসৌধ, যা ইউনেস্কো ঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান।
কিলিং ফিল্ডস
১৯৭০-এর দশকে কম্বোডিয়ায় খেমার রুজ শাসনামলে মাত্র চার বছরে ২৫ থেকে ৩০ লাখ মানুষকে হত্যা করা হয়। সেই হত্যার স্মৃতি বহন করছে কিলিং ফিল্ডস। এখানে সংরক্ষিত গণকবর, স্মৃতিস্তম্ভ এবং প্রদর্শনী দর্শকদের সেই বিভীষিকাময় সময়ের মুখোমুখি দাঁড় করায়।
বাংলাদেশেও ডার্ক ট্যুরিজম গন্তব্য রয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত বিভিন্ন স্থান, বধ্যভূমি, গণকবর এবং যুদ্ধস্মারকগুলো কৌতূহলী মানুষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
অনেকের প্রশ্ন, মানুষের মৃত্যু বা ট্র্যাজেডিকে কী পর্যটন পণ্যে পরিণত করা উচিত? সমালোচকরা মনে করেন, কিছু ক্ষেত্রে এসব স্থানকে অতিরিক্ত বাণিজ্যিক করে তোলা হয়, যা ট্র্যাজেডির প্রতি অসম্মানজনক হতে পারে। সমর্থকদের মতে, এসব স্থান মানুষকে ইতিহাসের কঠিন সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করায়। যুদ্ধ, গণহত্যা বা পারমাণবিক বিপর্যয়ের ভয়াবহতা সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে একই ভুল পুনরাবৃত্তি না করার শিক্ষা দেয়।
ডার্ক ট্যুরিজম মূলত মৃত্যু বা বিপর্যয়কে উদ্যাপন করার বিষয় নয়; বরং ইতিহাসের বেদনাদায়ক অধ্যায়গুলোর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সেখান থেকে শিক্ষা নেওয়ার উপায়। মানব সভ্যতার সাফল্য, ব্যর্থতা, নিষ্ঠুরতা এবং টিকে থাকার গল্প সম্পর্কে জেনে ও দেখে সচেতন হওয়াটা ডার্ক ট্যুরিজমের অন্যতম শিক্ষা। এসব স্থানে ভ্রমণের সময় সম্মান, সংবেদনশীলতা এবং ইতিহাসের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
/মহু