ইসলাম ধর্মের অন্যতম স্তম্ভ পবিত্র হজের স্মৃতিবিজড়িত এক পুণ্যভূমির নাম মিনা। ভৌগোলিক অবস্থান, গভীর ঐতিহাসিক তাৎপর্য এবং হজের প্রধান প্রধান বিধিবিধান পালনের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে মিনা মুসলিম উম্মাহর হৃদয়ে এক আবেগের নাম। মক্কা নগরীর অদূরে অবস্থিত এই উপত্যকা কেবল একটি ভৌগোলিক স্থান নয়, বরং এটি আত্মত্যাগ, আনুগত্য এবং ইসলামের ইতিহাসের এক অনন্য সাক্ষী।
মিনা নামের উৎপত্তি ও রহস্য
‘মিনা’ শব্দটির নামকরণ নিয়ে ভাষাবিদ ও ইতিহাসবিদদের মাঝে কয়েকটি প্রচলিত ও প্রসিদ্ধ মত রয়েছে। উল্লেখযোগ্য কয়েকটি মত এখানে তুলে ধরছিÑ ১. অধিক রক্ত প্রবাহিত করা (ইমনা) : আরবি ‘মুনা’ বা ‘ইমনা’ শব্দ থেকে ‘মিনা’ এসেছে বলে অধিকাংশ ঐতিহাসিক মনে করেন। এর অর্থ হলো প্রবাহিত করা বা ঝরানো। হজের সময় এখানে লাখ লাখ কুরবানির পশুর রক্ত প্রবাহিত হয়, যা আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার এক অনন্য প্রক্রিয়া। এই ঐতিহাসিক কুরবানির ঐতিহ্যের কারণেই স্থানটির নাম মিনা। ২. আকাক্সক্ষা বা প্রত্যাশা (তামান্নি) : অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, মিনা শব্দের মূলে রয়েছে ‘তামান্নি’ বা আকাক্সক্ষা। প্রচলিত আছে, হজরত জিবরাইল (আ.) যখন হজরত আদম (আ.)-কে বিদায় জানাচ্ছিলেন, তখন তিনি জানতে চেয়েছিলেন আদম (আ.)-এর কোনো বিশেষ আকাক্সক্ষা আছে কি না। উত্তরে আদম (আ.) জান্নাত লাভের ইচ্ছা প্রকাশ করেন। সেই ‘তামান্নি’ থেকেই এই স্থানের নাম হয়েছে মিনা। ৩. জনসমাবেশ বা মানুষের ভিড় : প্রাচীন আরবদের ভাষ্যমতে, কোনো নির্দিষ্ট স্থানে যখন অগণিত মানুষের সমাগম হতো, তখন তাকে ‘মিনা’ বলা হতো। হজের মৌসুমে এখানে সারা বিশ্ব থেকে আসা লাখ লাখ মানুষের যে মহাসমাবেশ ঘটে, তার সঙ্গে এই নামকরণটি অত্যন্ত সামঞ্জস্যপূর্ণ।
ভৌগোলিক অবস্থান ও সীমানা
পবিত্র মক্কা নগরীর পূর্বদিকে পাহাড়বেষ্টিত এক শান্ত উপত্যকায় মিনা অবস্থিত। এটি মূলত মক্কা এবং মুজদালিফার মধ্যবর্তী একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থল। মসজিদুল হারাম বা পবিত্র কাবা শরিফ থেকে এর দূরত্ব প্রায় ৬ কিলোমিটার। মিনার ভৌগোলিক সীমানা অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট। এর উত্তর-পূর্বে রয়েছে বিখ্যাত ‘জামরায়ে আকাবা’, যেখানে শয়তানকে পাথর নিক্ষেপ করা হয়। আর দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত ‘ওয়াদিয়ে মাহসার’, যে উপত্যকায় একসময় আবরাহার বিশাল হস্তীবাহিনী আল্লাহর গজবে ধ্বংস হয়েছিল। শরিয়তের পরিভাষায় ও ভৌগোলিক সীমারেখায় মিনা প্রায় ১৬.৮ বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে বিস্তৃত।
আত্মত্যাগের ঐতিহাসিক স্মৃতি
মিনার প্রতিটি ধূলিকণা হজরত ইবরাহিম (আ.) ও তাঁর পরিবারের অসামান্য আত্মত্যাগের সাক্ষী বহন করে। এখানেই আল্লাহ তায়ালা ইবরাহিম (আ.)-কে তাঁর প্রিয় পুত্র ইসমাইল (আ.)-কে কুরবানি করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। পিতা-পুত্রের সেই অবিচল আনুগত্য ও আত্মসমর্পণের মহান দৃশ্য পবিত্র কুরআনে সুরা আস-সাফফাতের ১০২-১০৫ নম্বর আয়াতে অত্যন্ত হৃদয়স্পর্শীভাবে বর্ণিত হয়েছে। শয়তান যখন ইবরাহিম (আ.)-কে আল্লাহর আদেশের পথ থেকে বিচ্যুত করার চেষ্টা করেছিল, তখন তিনি তাকে পাথর ছুড়ে মেরেছিলেন। সেই স্মৃতিকে ধরে রাখতেই হাজিরা আজও জামরাতে প্রতীকী পাথর নিক্ষেপ করেন।
ইসলাম প্রচারের টার্নিং পয়েন্ট
মিনার গুরুত্ব কেবল হজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ইসলামের ইতিহাসে এটি এক গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও ধর্মীয় টার্নিং পয়েন্ট। মদিনায় হিজরতের আগে রাসুলুল্লাহ (সা.) এবং ইয়াসরিবের (মদিনা) আনসারদের মধ্যে অনুষ্ঠিত ঐতিহাসিক ‘আকবার বায়াত’ বা শপথ এই মিনার উপত্যকাতেই হয়েছিল। এই শপথই মুসলমানদের মদিনায় হিজরতের পথ প্রশস্ত করেছিল এবং একটি স্বাধীন ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ভিত্তি স্থাপন করেছিল।
সাদা তাঁবুর নগরীর আধুনিক রূপ
মিনাকে বিশ্বজুড়ে ‘সাদা তাঁবুর নগরী’ বলা হয়। প্রতি বছর বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা লাখ লাখ হাজির দীর্ঘমেয়াদি অবস্থানের জন্য এখানে আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সংবলিত কয়েক লাখ তাঁবু স্থাপন করা হয়েছে।
সৌদি সরকারের তত্ত্বাবধানে এই তাঁবুগুলো অগ্নি-প্রতিরোধক ও শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত করে তৈরি করা হয়েছে। দূর থেকে দেখলে পুরো উপত্যকাটি সাদা রঙের তাঁবুতে ঘেরা এক মহাসমুদ্রের মতো মনে হয়। এই শুভ্রতার চাদরে ঢাকা অপরূপ দৃশ্য যে কাউকে মুগ্ধ করে।
হজের শুরু ও শেষ যেখানে
হজের মূল আনুষ্ঠানিকতার একটি বড় অংশ মিনাকেন্দ্রিক। ৮ জিলহজ হাজিরা মক্কা থেকে ইহরাম বেঁধে মিনায় পৌঁছান এবং সেখানে ৫ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করেন। ১০ জিলহজ আরাফাত ও মুজদালিফার আনুষ্ঠানিকতা শেষে হাজিরা মিনায় ফিরে আসেন। এদিন জামরায় পাথর নিক্ষেপ, কুরবানি, চুল মুণ্ডন এবং তওয়াফে ইফাজা সম্পাদনের মাধ্যমে হজের পূর্ণতা আসে। এরপর ১১, ১২ ও ১৩ জিলহজ (আইয়ামুত তাশরিক) হাজিরা মিনায় অবস্থান করে শয়তানকে পাথর নিক্ষেপের মধ্য দিয়ে তাদের ইবাদত সম্পন্ন করেন। মিনা কেবল একটি উপত্যকা নয়, এটি বিশ্বাসীদের জন্য আত্মশুদ্ধি ও মহান রবের সন্তুষ্টি অর্জনের এক পবিত্রতম মঞ্চ।
সময়ের আলো/জেডআই