উত্তর কোরিয়ার সামরিক কর্মসূচিতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতির প্রেক্ষাপটে সাত বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো পিয়ংইয়ং সফরে যাচ্ছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। সোমবার (৮ জুন) তিনি উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের সঙ্গে বৈঠক করবেন।
এই সফরের তাৎপর্য শুধু দুই নেতার সাক্ষাতে নয়, বরং শি জিনপিংয়ের ব্যক্তিগতভাবে পিয়ংইয়ং সফরে যাওয়াতেই বিষয়টিতে আলাদা গুরুত্ব যোগ করেছে। কারণ, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তিনি বিদেশ সফর উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দিয়েছেন। বর্তমানে অধিকাংশ বিদেশি নেতা— যেমন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কিংবা রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বেইজিংয়ে গিয়ে তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।
আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ক্রাইসিস গ্রুপের উত্তর-পূর্ব এশিয়া বিষয়ক জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক উইলিয়াম ইয়াং বলেন, শি জিনপিং সাধারণত খুব বেশি বিদেশ সফর করেন না। বিদেশি নেতারাই এখন তার সঙ্গে দেখা করতে বেইজিংয়ে যান। তাই তার পিয়ংইয়ং সফরের সিদ্ধান্ত চীনের কাছে আরও গুরুত্ব নিয়ে হাজির হয়েছে।
এশিয়া সোসাইটির তথ্য অনুযায়ী, ২০১৩ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে শি জিনপিং বছরে গড়ে প্রায় ১৪টি বিদেশ সফর করেছিলেন। কিন্তু ২০২২ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে তা কমে বছরে প্রায় ছয়টিতে নেমে আসে। কোভিড-১৯ মহামারির সময় ২০২০ সালে তিনি মাত্র একটি কূটনৈতিক সফর করেন এবং ২০২১ সালে বিদেশে কোনো কূটনৈতিক সফরই করেননি।
রাশিয়া–উত্তর কোরিয়া ঘনিষ্ঠতা নিয়ে চীনের উদ্বেগ
বিশ্লেষকদের মতে, শি জিনপিংয়ের এই সফরের অন্যতম প্রধান কারণ হলো উত্তর কোরিয়া ও রাশিয়ার ক্রমবর্ধমান ঘনিষ্ঠতা।
দীর্ঘদিন ধরে চীন উত্তর কোরিয়ার প্রধান অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক অংশীদার হিসেবে বিবেচিত হয়ে এসেছে। একসময় উত্তর কোরিয়ার মোট বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রায় ৯৫ শতাংশই চীনের সঙ্গে হতো। তবে ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের পর পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে।
উত্তর কোরিয়া রাশিয়াকে অস্ত্র, গোলাবারুদ এবং জনবল সরবরাহ করেছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ার রাষ্ট্র-সমর্থিত গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্ট্র্যাটেজির হিসাব অনুযায়ী, ২০২৩ সাল থেকে রাশিয়া উত্তর কোরিয়াকে প্রায় ১৪.৪ বিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ অর্থ ও অন্যান্য সুবিধা দিয়েছে।
বিশ্লেষকদের ধারণা, এই সহযোগিতার বড় অংশই উন্নত সামরিক প্রযুক্তি ও সামরিক সরঞ্জামের মাধ্যমে হয়েছে, যা উত্তর কোরিয়ার সামরিক সক্ষমতা বাড়াতে সহায়তা করছে।
উত্তর কোরিয়ার সামরিক অগ্রগতি নিয়ে সতর্ক চীন
যদিও চীন ও উত্তর কোরিয়ার মধ্যে পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি রয়েছে, তবুও উত্তর কোরিয়ার দ্রুত সামরিক শক্তি বৃদ্ধি নিয়ে বেইজিং উদ্বিগ্ন।
উইলিয়াম ইয়াং বলেন, চীন কখনোই উত্তর কোরিয়াকে অতিরিক্ত সামরিকভাবে শক্তিশালী দেখতে আগ্রহী ছিল না। কারণ, রাশিয়ার সহায়তায় সামরিকভাবে আরও শক্তিশালী উত্তর কোরিয়া কোরীয় উপদ্বীপের ক্ষমতার ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে।
চলতি বছর উত্তর কোরিয়া ইতোমধ্যে একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা চালিয়েছে। মে মাসে দেশটি একটি নতুন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)–নিয়ন্ত্রিত ট্যাকটিক্যাল ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রও উন্মোচন করেছে। এছাড়া সম্প্রতি কিম জং উন একটি নতুন ‘অস্ত্র-মানের পারমাণবিক উপাদান’ উৎপাদন কেন্দ্র পরিদর্শন করেছেন, যা দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচি আরও সম্প্রসারণে ব্যবহার করা হবে বলে জানানো হয়েছে।
কোরীয় উপদ্বীপের নিরাপত্তা পরিস্থিতি
উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়া প্রযুক্তিগতভাবে এখনও যুদ্ধাবস্থায় রয়েছে। ১৯৫৩ সালের যুদ্ধবিরতি চুক্তির মাধ্যমে কোরীয় যুদ্ধের লড়াই বন্ধ হলেও আনুষ্ঠানিক শান্তিচুক্তি কখনো স্বাক্ষরিত হয়নি।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দুই কোরিয়ার সম্পর্কের অবনতি ঘটেছে। ২০২৪ সালে কিম জং উন কোরীয় একীকরণের দীর্ঘদিনের লক্ষ্য পরিত্যাগ করেন। এরপর থেকে দুই দেশের সম্পর্ক আরও শীতল হয়ে পড়ে।
দক্ষিণ কোরিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আশা প্রকাশ করেছে যে, শি জিনপিংয়ের এই সফর কোরীয় উপদ্বীপ-সংক্রান্ত সমস্যার সমাধানে গঠনমূলক ভূমিকা রাখবে। একই সঙ্গে পর্যবেক্ষকদের ধারণা, সম্ভাব্য কিম–ট্রাম্প বৈঠক এবং পূর্ব এশিয়ার নিরাপত্তা পরিস্থিতিও শি ও কিমের আলোচনায় স্থান পেতে পারে।
এছাড়া জাপানের সামরিক সক্ষমতা বাড়ানো এবং দক্ষিণ কোরিয়া–জাপান নিরাপত্তা সহযোগিতার সম্ভাবনাও চীনের জন্য উদ্বেগের বিষয়। ঐতিহাসিক ও ভূরাজনৈতিক কারণে টোকিওর সঙ্গে বেইজিংয়ের সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরেই উত্তেজনাপূর্ণ।
সব মিলিয়ে, শি জিনপিংয়ের এই সফর শুধু চীন–উত্তর কোরিয়া সম্পর্কের দৃষ্টিকোণ থেকেই নয়, বরং পূর্ব এশিয়ার বৃহত্তর কৌশলগত ও নিরাপত্তা ভারসাম্যের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হচ্ছে।
/ইউএমএইচ